ব্যাংকার কারো কাছে টিউশনি পড়া কি অনুমোদিত ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
কেউ যদি ব্যাংক এ চাকরি করে সেখানে যদি টিউশন করানো হয় তাহলে সেই টাকা কী হালাল হবে আমার জন্য। যেহেতু আমি জানি উনারা ব্যাংকে চাকরি করেন ।
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। আপনি জিজ্ঞেস করছেন, "ব্যাংকে চাকরি করা কেউ যদি টিউশন করায়, তাহলে সেই টিউশনের টাকা আমার জন্য হালাল হবে কি না?" অর্থাৎ, আপনি হয়তো একজন ছাত্রী/ছাত্র, এবং আপনার শিক্ষক/শিক্ষিকা ব্যাংকে চাকরি করেন। তিনি আপনাকে টিউশন পড়ান। আপনি জানতে চাচ্ছেন, তাঁর উপার্জিত টিউশনের টাকা (যা আপনি তাঁকে ফি হিসেবে দিচ্ছেন) আপনার জন্য হালাল হবে কি না, কারণ তিনি ব্যাংকে চাকরি করেন।
উত্তর:
আপনার জন্য সেই টিউশনের টাকা হালাল হবে। এর কারণ হলো:
১. টিউশন ফি বনাম ব্যাংক বেতন: আপনি তাঁকে যে টিউশন ফি দিচ্ছেন, তা তাঁর ব্যাংকের বেতন নয়। এটি একটি পৃথক চুক্তি (আজর) — আপনি তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করছেন, এর বিনিময়ে আপনি তাঁকে অর্থ দিচ্ছেন। এই লেনদেনটি সম্পূর্ণ বৈধ এবং হালাল। আপনার দায়িত্ব হলো আপনার লেনদেনটি হালাল উপায়ে করা, যা আপনি করছেন।
২. অপরের পাপের দায়িত্ব আপনার উপর নেই: ইসলামের মূলনীতি হলো, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের কর্মের জন্য দায়ী। কেউ যদি অন্যায় বা হারাম কাজে লিপ্ত থাকে (যেমন ব্যাংকে সুদভিত্তিক লেনদেনে সহায়তা করা), তবে তার সেই পাপের বোঝা অন্যদের উপর বর্তাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ "আর কেউ অপরের পাপের বোঝা বহন করবে না।" (সূরা আল-আনআম: ১৬৪)
সুতরাং, আপনার শিক্ষক যদি ব্যাংকে হারাম কাজে জড়িত থাকেন, তবে তাঁর সেই পাপের জন্য আপনি দায়ী হবেন না। আপনি তাঁর কাছ থেকে যে শিক্ষা নিচ্ছেন, তা বৈধ।
৩. টিউশন ফি হিসেবে প্রাপ্ত অর্থের বিধান: ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী, একজন মুসলিম যদি হারাম উপার্জন করে, তবে তার সেই অর্থ তার নিজের জন্য অপবিত্র (নাজিস) হলেও, সে যদি সেই অর্থ দিয়ে অন্যকে কিছু উপহার দেয় বা ফি বাবদ দেয়, তবে গ্রহীতার জন্য তা হালাল। কারণ, গ্রহীতা জানে না বা নিশ্চিত নয় যে, এই নির্দিষ্ট অর্থটি হারাম উপার্জন থেকে এসেছে। তবে যদি কেউ নিশ্চিতভাবে জানে যে, এই নির্দিষ্ট অর্থটি হারাম (যেমন: চুরি করা টাকা বা সুদের টাকা) এবং তা তাকে দেওয়া হচ্ছে, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয নয়।
এখানে, আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন না যে, আপনার দেওয়া টিউশন ফির টাকাটি সরাসরি তাঁর ব্যাংকের হারাম বেতন থেকে আসছে। এমনকি যদি আসেও, তবুও যেহেতু এটি একটি বৈধ সেবার (শিক্ষাদান) বিনিময়, তাই আপনার জন্য তা গ্রহণ করা এবং ভোগ করা হালাল।
হানাফি ফিকহের দলিল:
হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী)-এ উল্লেখ আছে:
"যদি কোনো ব্যক্তি হারাম মাল দ্বারা ক্রয়-বিক্রয় করে, তবে বিক্রেতার জন্য তা হালাল, কারণ হারাম মালের পাপ ক্রেতার উপর বর্তাবে না, বরং তা দাতা/বিক্রেতার উপর বর্তাবে।"
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, গ্রহীতা যেন নিশ্চিত না হয় যে, প্রদত্ত অর্থটি নির্দিষ্টভাবে হারাম লেনদেন থেকে এসেছে। আপনার ক্ষেত্রে, আপনি নিশ্চিত নন যে, আপনার টিউশন ফি সরাসরি সুদের টাকা থেকে দেওয়া হচ্ছে। তাই এটি আপনার জন্য হালাল।
আপনার করণীয়:
আপনার উচিত হবে আপনার শিক্ষককে ভালোবেসে এবং সম্মানের সাথে এই বিষয়ে জানানো যে, ব্যাংকে চাকরি করা (বিশেষত সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়িত থাকা) ইসলামী দৃষ্টিতে হারাম। আপনি তাঁকে হালাল উপার্জনের পরামর্শ দিতে পারেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি তাঁর কাছ থেকে পড়া বন্ধ করে দেবেন বা তাঁর টিউশন ফি পরিশোধ করবেন না।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার জন্য সেই টিউশনের টাকা হালাল। আপনি নিশ্চিন্তে পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং টিউশন ফি পরিশোধ করুন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।