দাওয়াতের খাতিরে সংশয়যুক্ত হালাল হারাম এর দাওয়াত কবুল যাবে কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমি তাকে হিদায়াত এর পথ, সিরাতুল মুস্তাকিম এর পথ এর কথা বললে বা আল্লাহর নাফরমানী ছেড়ে দেওয়ার কথা বললে সে মনোযোগ দিয়ে শুনে এবং আস্তে আস্তে চেষ্টা করছে দ্বীন মানার জন্য, গোনাহ ছাড়তেও চেষ্টা করছে। আমিও তাই তার সাথে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করছি, যাতে সে অটল হতে পারে দ্বীনের প্রতি, সে তার মা কেও দাওয়াত দেয়।
সম্প্রতি একটা কিতাবে আমরা সুদ নিয়ে পড়েছি এর আগে সে সুদ যে খারাপ জানতো না। এখন সে তার বাসায় যে ইনকাম করে ( তার ভাইকে বলেছে; বাবা মৃত) তাকে বলেছে কিন্তু সে গায়ে নেয়না হালাল হারাম বিষয়। আর আমার বান্ধবীকেও তার ইঙ্কামের টাকাই খেতে হয়। আর তাদের ব্যকের। লেনদেন এ কিছু সুদ পেয়েছিলো সামনে থেকে আর নিবে না তার মা যখন আমার বান্ধবী তাকে বুঝিয়েছেন।
এখন আমি শিউর না যে তারা আমাকে আগামীকাল যে খাবার খাওয়াবেন সেটা কি হালাল অংশ এর উপর আসবে কিনা? এখন এমতাবস্থায় কি দাওয়াতে যাবো? আমি আগেই দাওয়াত কবুল করেছি বলেছি তখন আমার খেয়াল হয়নি । আমি যদি এখন আগের রাতে তাকে জানাই তাহলে এক এ তো আমি তাকে আসল কারণ বলতে পারবো না যে তাদের খাবার হালাল এর নিশ্চয়তা আমি পাচ্ছিনা তাই তাহলে সে ইসলাম কে কঠিন ভাববে এর নিজেও ভাববে আমি তো খাচ্ছি তাইলে আর দ্বীন কেমনে মানবো তার ঢিলেমি চলে আসবে, আর দ্বিতীয়ত সে আমার উপর মন ক্ষুণ্ন করবে। আমি সেদিন রোজাও রাখতে পারবো না, সে আমাকে দাওয়াত করে খাওয়াতে চেয়েছে আর এমন্দিন দাওয়াত দিয়েছে জেদিন আমি রোজা রাখিনা, আর গিয়ে না খেলেও হবেনা
বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার মাকসাদ ছিলো দ্বীন নিয়ে কথা বলা তার আমলের রুটিন এবং আনুষাঙ্গিক জিনিস যেহেতু সব কিছু অনলাইন কথা বললে বুঝা যায়না। আমার কি গেলে তার বাসার খাবার খেলে গোনাহ হবে? হারাম খবর ভক্ষণের যেসব ভয়াবহতা যেমন নামাজ না কবুল হওয়া এসব কি তখন আমার ক্ষেত্রেও হবে? নাকি আমার দ্বীনের দাওয়াতের জন্য যাওয়া জায়েজ হবে
Answer
দাওয়াতের খাতিরে সন্দেহযুক্ত হালাল-হারামের দাওয়াত কবুল করা প্রসঙ্গে
উত্তর:
আপনার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কয়েকটি মূল বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন:
১. দাওয়াত কবুল করার বিধান
ইসলামে দাওয়াত কবুল করা মুস্তাহাব এবং উত্তম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন অতিথিকে সম্মান করে।" (সহীহ বুখারী: ৬০১৮)
তবে দাওয়াত কবুল করা তখনই জায়েয হবে যখন সেখানে হারাম খাবার পরিবেশন করা হবে বলে নিশ্চিত বা প্রবল ধারণা না থাকে।
২. সন্দেহযুক্ত খাবার সম্পর্কে ইসলামী নীতি
ইসলামের মূল নীতি হলো—যতক্ষণ না হারাম প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ জিনিসটি হালালই থাকবে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, কোনো বস্তু হারাম হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ থাকলে মূলনীতি হলো তা হালাল। তবে যদি প্রবল ধারণা (গালিবুয যান) হয় যে তা হারাম, তাহলে তা পরিহার করা উচিত।
কিতাবের দলিল:
"الأصل في الأشياء الإباحة حتى يدل الدليل على التحريم" "আসল হলো সব বস্তু হালাল, যতক্ষণ না হারাম হওয়ার দলিল পাওয়া যায়।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম)
৩. আপনার বান্ধবীর বাসার খাবার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত
যেহেতু আপনি নিশ্চিত নন যে তাদের খাবার হারাম হবে, এবং তাদের ইনকামের উৎস সম্পর্কে আপনার নিশ্চিত জ্ঞান নেই—শুধু সন্দেহ আছে—তাই:
- যদি আপনি নিশ্চিত হন যে তাদের আয়ের উৎস সম্পূর্ণ হারাম (যেমন সুদ), এবং সেই টাকায় খাবার তৈরি হচ্ছে, তাহলে সেখানে গিয়ে খাওয়া অনুচিত।
- যদি শুধু সন্দেহ থাকে এবং নিশ্চিত না হন, তাহলে দাওয়াতে যাওয়া এবং খাওয়া জায়েয আছে।
ইমাম ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
"যদি কোনো ব্যক্তির অধিকাংশ সম্পদ হারাম হয়, তাহলে তার দাওয়াত কবুল করা মাকরূহ। কিন্তু যদি তার সম্পদের মধ্যে হালালও থাকে এবং হারামও থাকে, তাহলে তার দাওয়াত কবুল করা জায়েয, কারণ মূলনীতি হলো হালাল।" (রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৮৫)
৪. আপনার বিশেষ অবস্থা বিবেচনায়
আপনার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা হলো:
১. আপনার উদ্দেশ্য দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া—এটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। ২. আপনি নিশ্চিত নন যে খাবারটি হারাম হবে। ৩. তাদের আয়ের মধ্যে হালাল অংশও আছে (যেমন বাবার রেখে যাওয়া বৈধ সম্পদ, অন্যান্য বৈধ উপার্জন)। ৪. আপনার অস্বীকৃতি জানালে দ্বীনের প্রতি তার মনোভাব নেতিবাচক হতে পারে।
৫. ফিকহী সিদ্ধান্ত
এই অবস্থায় আপনার করণীয়:
ক. দাওয়াতে যাওয়া: যাওয়া জায়েয আছে, বিশেষত আপনার দ্বীনি উদ্দেশ্য থাকায়। তবে খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
খ. খাওয়ার ব্যাপারে: যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে খাবার হারাম, তাহলে খেতে পারেন। তবে যদি মনে করেন খাবারটি হারাম হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে, তাহলে খাওয়া থেকে বিরত থাকুন এবং কোনো ওজর দেখিয়ে খাওয়া থেকে বিরত থাকুন (যেমন: "আমার পেট খারাপ" বা "আমি ডায়েটে আছি")।
গ. দাওয়াতের উদ্দেশ্য: আপনার মূল উদ্দেশ্য দ্বীনি কথা বলা, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দাওয়াতে যাওয়া এবং দ্বীনি আলোচনা করা জরুরি।
৬. হারাম খাবার খেলে নামাজ কবুল না হওয়ার বিষয়
হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি হারাম মাল খায়, তার নামাজ কবুল হয় না।" (মুসনাদ আহমাদ: ২/২৯৮)
তবে এই হাদিসের অর্থ হলো—হারাম খাবার knowingly (জেনে-বুঝে) খেলে গুনাহ হয় এবং ইবাদতের পূর্ণ সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু আপনি যদি সন্দেহের কারণে খান এবং পরে জানতে পারেন যে তা হারাম ছিল, তাহলে আপনি গুনাহগার হবেন না, ইনশাআল্লাহ। কারণ আল্লাহ বলেন:
"আল্লাহ কাউকে তার সামর্থ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।" (সূরা বাকারা: ২৮৬)
৭. আপনার করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ
১. দাওয়াতে যান—কারণ আপনার উদ্দেশ্য দ্বীনের দাওয়াত, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২. খাওয়ার ব্যাপারে: যদি প্রবল সন্দেহ থাকে, তাহলে সামান্য খান অথবা কোনো ওজর দেখিয়ে খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। ৩. দ্বীনের দাওয়াত দিন—এটাই আপনার মূল লক্ষ্য। ৪. ভবিষ্যতে: তাদেরকে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব বোঝান এবং ধীরে ধীরে হারাম থেকে বেরিয়ে আসতে উৎসাহিত করুন।
৮. গুরুত্বপূর্ণ দলিল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"দ্বীন সহজ।" (সহীহ বুখারী: ৩৯)
আল্লাহ তায়ালা বলেন:
"আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং কঠিন চান না।" (সূরা বাকারা: ১৮৫)
সারসংক্ষেপ
আপনার ক্ষেত্রে দাওয়াতে যাওয়া জায়েয, কারণ: ১. আপনি নিশ্চিত নন যে খাবার হারাম হবে। ২. আপনার উদ্দেশ্য দ্বীনের দাওয়াত। ৩. তাদের আয়ের মধ্যে হালাল অংশও আছে। ৪. দাওয়াত না গেলে দ্বীনের ক্ষতি হতে পারে।
তবে খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। যদি প্রবল সন্দেহ থাকে, তাহলে খাওয়া থেকে বিরত থাকুন এবং কোনো ওজর দেখান। আল্লাহ তায়ালা আপনার নিয়তের বিনিময় দেবেন।
والله أعلم بالصواب (আল্লাহই সর্বাধিক সঠিক জানেন)