গোপন আমল ও অন্যকে উৎসাহিত করা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি আমার রিজিক, পরীক্ষা পড়াশুনার জন্য খুঁজে খুঁজে কিছু আমল বের করেছি, পাশাপাশি পরীক্ষার হলে কি কি করতে হবে সেইটা। যেমন ইস্তেকফার, দরুদ, ইসমে আজম,দোয়া ইউনুস, কখন কি ভাবে পড়তে হয় এগুলা আমি পালন করি। কিন্তু এগুলো গোপনে করি যেন আল্লাহ আর আমার মধ্যে থাকে। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই আমল গুলো কি আমি আমার স্ত্রী যিনি নিজেও ছাত্রী এবং অন্য কোন ছাত্রদের পড়াশুনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় আমি কি এগুলা তাদেরকে শেয়ার করা উচিৎ হবে? এগুলো থেকে কি আমি সওয়াব পেতেই থাকবো। আমার মন চায় না শেয়ার করতে, আমি চাই আল্লাহ আর আমার মধ্যে গোপন থাক। আমি এখন কি করবো? শেয়ার করলে কি সুফল কমে যাবে? আমার জন্য কি করা উচিত?
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটির জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আপনি যে দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে আছেন, তা অনেক সচেতন মুমিনেরই হয়ে থাকে। নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার জন্য উচিত হবে এই আমলগুলো অন্যদের (স্ত্রী ও ছাত্রছাত্রীদের) সাথে শেয়ার করা। মনে রাখবেন, শেয়ার করলে আপনার সওয়াব কমবে না, বরং এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত সওয়াবের কারণ হবে। গোপনে আমল করা এবং তা প্রচার করার মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই; বরং এটি একটি সুমহান আদর্শ।
বিস্তারিত দলিল ও ব্যাখ্যা
১. গোপন আমলের ফজিলত (আপনার বর্তমান অবস্থা)
আপনি যে গোপনে আমল করেন, এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ইসলামে গোপন আমলের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এর মাধ্যমে রিয়া (লোক দেখানো) থেকে বাঁচা যায় এবং আন্তরিকতা (ইখলাস) রক্ষা পায়।
- হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "সাত শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ তাআলা তার আরশের ছায়ায় স্থান দেবেন... তাদের মধ্যে একজন হলো সেই ব্যক্তি, যে ডান হাত যা খরচ করে, বাম হাত তা জানে না (অর্থাৎ সম্পূর্ণ গোপনে দান করে)।" (সহিহ বুখারি: ১৪২৩, সহিহ মুসলিম: ১০৩১)
- কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন, "তোমরা যদি দান খয়রাত প্রকাশ কর, তবে তা ভালো; আর যদি তা গোপনে কর এবং অভাবগ্রস্তদের দাও, তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭১)
আপনার এই মানসিকতা (আল্লাহ ও আমার মধ্যে গোপন থাকুক) অত্যন্ত সুন্দর এবং এটি ইখলাসের লক্ষণ। এই অবস্থা বজায় রাখা আপনার জন্য অনেক বড় নেয়ামত।
২. আমল শেয়ার করার গুরুত্ব ও সওয়াব
আপনার মনে প্রশ্ন জাগছে যে, শেয়ার করলে সওয়াব কমে যাবে কি না। এর উত্তর হলো—শেয়ার করলে আপনার নিজের আমলের সওয়াব কিছুমাত্র কমবে না, বরং আপনি নতুন করে দাওয়াত ও শিক্ষাদানের সওয়াব পাবেন।
- হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, "যে ব্যক্তি সৎপথের দিকে আহ্বান করল, তার জন্য সেই পথ অনুসরণকারীদের সমান সওয়াব রয়েছে, তবে তাদের সওয়াব থেকে কিছুমাত্র কম করা হবে না।" (সহিহ মুসলিম: ২৬৭৪)
- আরেকটি হাদিসে আছে: "তোমাদের মধ্যে কেউ যদি এমন কোনো ভালো কাজ দেখে, যা আমি (রাসূল) করি, তবে সে যেন তা অন্যদেরকে জানায়।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৬০)
আপনি যখন আপনার স্ত্রী বা অন্য ছাত্রছাত্রীদেরকে এই আমলগুলো শেখাবেন, তখন আপনি তাদেরকে সৎপথের দিকে আহ্বানকারী হিসেবে গণ্য হবেন। ফলে প্রত্যেকটি ছাত্র বা আপনার স্ত্রী যখনই এই আমলগুলো করবে, তখনই আপনিও সওয়াব পেতে থাকবেন। এটি আপনার জন্য বিশাল এক সওয়াবের খনি।
৩. গোপন রাখা এবং শেয়ার করার মধ্যে সমন্বয় (হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি)
আপনি মনে করছেন, শেয়ার করলে "আল্লাহ ও আমার মধ্যে গোপন" থাকবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। গোপন আমল বলতে বোঝায়, আমল করার সময় তা লোক দেখানোর জন্য না করা। কিন্তু আমলটি কী, তা অন্যকে শেখানো বা বলা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
- হানাফি ফিকহের নীতি: ফিকহের কিতাবসমূহে (যেমন: রদ্দুল মুহতার) স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ফরজ ইবাদত প্রকাশ করা এবং নফল ইবাদত গোপন করা উত্তম। তবে এর অর্থ এই নয় যে, নফল ইবাদতের কথা কাউকে বলা যাবে না। বরং ইলম (জ্ঞান) প্রচার করা প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজে জ্ঞান প্রচারে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন।
- ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) তার বিখ্যাত গ্রন্থ রদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেছেন যে, নফল ইবাদত গোপনে করা উত্তম, কারণ এটি রিয়া থেকে মুক্ত রাখে। কিন্তু দ্বীনের জ্ঞান ও উপকারী দোয়া অন্যদের শেখানো একটি স্বতন্ত্র ইবাদত, যা গোপন করা উচিত নয়। বরং তা প্রকাশ করা এবং অন্যদেরকে শেখানো ওয়াজিবের পর্যায়ে পৌঁছে যায় যদি সমাজে এর প্রয়োজন হয়।
৪. আপনার জন্য করণীয় (উপসংহার)
আপনার জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো:
১. নিজে আমল করা: আপনি যেভাবে গোপনে আমল করছেন, তা অব্যাহত রাখুন। এতে আপনার ইখলাস বজায় থাকবে। ২. শেয়ার করা: আপনার স্ত্রী এবং ছাত্রছাত্রীদের সাথে এই আমলগুলো শেয়ার করুন। তবে শেয়ার করার সময় আপনার নিয়ত হবে "আল্লাহর দ্বীন প্রচার করা" এবং "অন্যদের উপকার করা", কোনো প্রশংসা বা স্বীকৃতি লাভের আশা না করা। ৩. নিয়তের সংশোধন: শেয়ার করার সময় মনে রাখবেন, এটি একটি স্বাধীন ইবাদত। আপনি যখন এটি করবেন, তখন আপনার নিজের আমলের সওয়াব যেমন থাকবে, তেমনি অন্যদেরকে শেখানোর কারণে নতুন সওয়াবও যুক্ত হবে। এতে আপনার "গোপন আমল" এর ফজিলতও নষ্ট হবে না, কারণ আপনি তো এখনও গোপনে আমলই করছেন, শুধু অন্যদেরকে সেটা জানিয়ে দিচ্ছেন।
মনে রাখবেন: রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে গোপনে ইবাদত করতেন, কিন্তু অন্যদেরকে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। আপনিও সেই সুন্নাহ অনুসরণ করুন।
দলিলভিত্তিক গ্রন্থসমূহ:
- সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম (হাদিসের জন্য)
- রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন) - নফল ইবাদত গোপন রাখা ও জ্ঞান প্রচারের প্রসঙ্গে
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া (ফাতাওয়া আলমগিরি) - ইখলাস ও আমলের নিয়ত সম্পর্কে
- বেহিশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভী) - দৈনন্দিন আমল ও দোয়া শেখানোর গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা আপনার ইখলাস ও নেক নিয়তকে কবুল করুন এবং আপনার জ্ঞান ও আমলকে সমাজের জন্য কল্যাণকর করুন। আমিন।