বিতর নামাজে ইচ্ছাকৃতভাবে দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে গেলে নামাজের বিধান কী?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
বিতর নামাজে ইচ্ছাকৃতভাবে দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে গেলে এবং সাহু সিজদাহ দিলে নামাজের বিধান
উত্তর
বিতর নামাজে ইচ্ছাকৃতভাবে দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে গেলে এবং শেষে সাহু সিজদাহ দিলে নামাজ আদায় হয়ে যাবে, তবে এতে নামাজ মাকরূহে তাহরিমি হবে এবং গুনাহ হবে।
বিস্তারিত ব্যাখ্যা
১. দোয়ায়ে কুনুতের গুরুত্ব ও বিধান
হানাফি মাযহাব মতে, বিতর নামাজে দোয়ায়ে কুনুত পড়া ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে তা পরিত্যাগ করা গুনাহের কাজ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বিতর নামাজে নিয়মিত দোয়ায়ে কুনুত পড়তেন। হাদিসে এসেছে:
عَنْ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ قَالَ عَلَّمَنِي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَلِمَاتٍ أَقُولُهُنَّ فِي الْوِتْرِ...
"হাসান ইবনে আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাকে কিছু বাক্য শিখিয়েছেন যা আমি বিতর নামাজে পড়ি..." (আবু দাউদ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)
২. দোয়ায়ে কুনুত ভুলে গেলে বা ইচ্ছাকৃতভাবে না পড়লে করণীয়
ক. ভুলে গেলে (সাহু সিজদার বিধান): যদি কেউ ভুলে দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে চলে যায়, তাহলে তার করণীয় হলো রুকু থেকে ফিরে এসে দোয়ায়ে কুনুত পড়া। যদি রুকু থেকে ফিরে এসে কুনুত পড়ে নেয়, তাহলে সাহু সিজদার প্রয়োজন নেই। কিন্তু যদি রুকুতে চলে যাওয়ার পর আর ফিরে না এসে নামাজ চালিয়ে যায়, তাহলে শেষে সাহু সিজদা দিতে হবে।
খ. ইচ্ছাকৃতভাবে না পড়লে: ইচ্ছাকৃতভাবে দোয়ায়ে কুনুত না পড়া কবিরা গুনাহ। তবে নামাজ হয়ে যাবে যদি সাহু সিজদা দেওয়া হয়। কিন্তু এতে নামাজ মাকরূহে তাহরিমি হবে।
৩. হানাফি ফিকহের দলিল
আল-হিদায়াহ ও রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
وَتَرْكُ الْقُنُوتِ عَمْدًا يُسِيءُ وَلَا تَفْسُدُ صَلَاتُهُ عِنْدَ أَبِي حَنِيفَةَ
"ইচ্ছাকৃতভাবে কুনুত পরিত্যাগ করলে গুনাহ হবে, কিন্তু আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে নামাজ ফাসিদ হবে না।"
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে: তাঁদের মতে, ইচ্ছাকৃতভাবে কুনুত পরিত্যাগ করলে নামাজ ফাসিদ হয়ে যাবে এবং পুনরায় পড়তে হবে। তবে ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে নামাজ হয়ে যাবে, কিন্তু গুনাহ হবে।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতই ফতোয়া: হানাফি মাযহাবে ফতোয়া ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতের উপরই দেওয়া হয়।
৪. সাহু সিজদার বিধান
যেহেতু দোয়ায়ে কুনুত ওয়াজিব, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে বা ভুলে তা পরিত্যাগ করলে সাহু সিজদা দিতে হবে। সাহু সিজদা দেওয়ার মাধ্যমে নামাজ শুদ্ধ হয়ে যাবে, তবে ইচ্ছাকৃত পরিত্যাগের কারণে গুনাহ থেকে যাবে।
রদ্দুল মুহতার-এ আছে:
وَلَوْ تَرَكَ الْقُنُوتَ سَهْوًا يَسْجُدُ لِلسَّهْوِ وَإِنْ تَرَكَهُ عَمْدًا فَعَلَيْهِ الْإِعَادَةُ عِنْدَهُمَا وَيُسِيءُ وَلَا إعَادَةَ عِنْدَهُ
"যদি ভুলে কুনুত পরিত্যাগ করে, তাহলে সাহু সিজদা দেবে। আর যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে, তাহলে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদের মতে পুনরায় নামাজ পড়তে হবে, আর ইমাম আবু হানিফার মতে পুনরায় পড়তে হবে না, তবে গুনাহ হবে।"
৫. চূড়ান্ত ফতোয়া
হানাফি মাযহাবের প্রাধান্যপ্রাপ্ত মত (ফতোয়া):
১. ইচ্ছাকৃতভাবে দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে গেলে নামাজ আদায় হয়ে যাবে, তবে এটি গুনাহের কাজ এবং নামাজ মাকরূহে তাহরিমি হবে।
২. শেষে সাহু সিজদা দিলে নামাজের ত্রুটি দূর হয়ে যাবে, তবে ইচ্ছাকৃত পরিত্যাগের কারণে গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না।
৩. উত্তম হলো, ইচ্ছাকৃতভাবে দোয়ায়ে কুনুত পরিত্যাগ না করা এবং ভুলে গেলে রুকু থেকে ফিরে এসে কুনুত পড়ে নেওয়া।
৪. তওবা করা এবং ভবিষ্যতে নিয়মিত দোয়ায়ে কুনুত পড়ার সংকল্প করা উচিত।
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ও মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.)-এর ফতোয়াতেও একই মত প্রকাশিত হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
বিতর নামাজে ইচ্ছাকৃতভাবে দোয়ায়ে কুনুত না পড়ে রুকুতে গেলে এবং শেষে সাহু সিজদাহ দিলে নামাজ আদায় হয়ে যাবে (ইমাম আবু হানিফার মতে), তবে এটি গুনাহ হবে এবং নামাজ মাকরূহে তাহরিমি হবে। সাহু সিজদা দেওয়ার কারণে নামাজ শুদ্ধ হবে, কিন্তু ইচ্ছাকৃত পরিত্যাগের পাপ থেকে মুক্তি পেতে তওবা করা জরুরি।