সাথে কুরআন বহন প্রসঙ্গে

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 3626
Questioner: Sadman
Question Asked: 07 Aug 2026, 09:43 PM
Reviewed & Published: 07 Aug 2026, 09:50 PM
Views: 17
Tokens: 5,708
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিভিন্ন কাজে সফরে থাকাকালীন ফোনের অ্যাপ থেকে কুরআন পড়ার ইচ্ছা থাকলেও মিস হয়ে যায় মাঝেমধ্যেই। যদি সাথে থাকা ব্যাগে (স্কুল ব্যাগ টাইপের যেগুলো পিঠে বা কাঁধে বহন করা হয়) বা জুব্বা, পাঞ্জাবির পকেটে ছোট সাইজের পকেট কুরআন বহন করতে চাই সার্বক্ষণিক যেন নিয়মিত তিলাওয়াত মিস না হয় পাশাপাশি সুবিধাজনক অবসর সময়ে তিলাওয়াত করা যায় সেজন্য কুরআন বহন করার বিধান এবং সাথে রাখতে চাইলেও হয়তো সার্বক্ষণিক অজু অবস্থায় থাকা সম্ভব নাও হতে পারে। সবদিক মিলিয়ে পকেটে বা ব্যাগে কুরআন বহনের বিধান জানতে চাচ্ছিলাম। মানে কি কি আদব রক্ষা করতে হবে বা এক্ষেত্রে সবগুলো দিক বিবেচনা করে ফিকহের বিধান রেফারেন্সসহ জানালে উপকৃত হতাম ইনশাআল্লাহ্। এ সম্পর্কিত আমার প্রশ্নের যদি কোনো ঘাটতি থাকে সেটাও পূরণ করে বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ থাকলো।

Answer

পকেটে বা ব্যাগে কুরআন বহনের বিধান

প্রশ্নের উত্তর

আলহামদুলিল্লাহ, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগী। সফরে থাকাকালীন নিয়মিত তিলাওয়াতের অভ্যাস বজায় রাখার আগ্রহ সত্যিই প্রশংসনীয়। নিচে ফিকহের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো:

কুরআন বহনের মূল বিধান

কুরআন মাজীদ বহন করা জায়েয, তবে এর সাথে কিছু শর্ত ও আদব জড়িত। ফিকহের কিতাবসমূহে কুরআন স্পর্শ ও বহনের ক্ষেত্রে পবিত্রতা (তাহারাত) শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১. পবিত্রতা (তাহারাত) সংক্রান্ত বিধান

মূলনীতি: কুরআন মাজীদ স্পর্শ করার জন্য পবিত্রতা (ওযু) শর্ত। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, কুরআন স্পর্শ করার জন্য ওযু থাকা আবশ্যক, তবে গোসল ফরয হলে (জানাবাত অবস্থায়) তা থেকে পবিত্র হওয়া জরুরি।

দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন:

لَا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ "পবিত্রগণ ছাড়া কেউ একে স্পর্শ করতে পারে না।" (সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯)

রদ্দুল মুহতার (১/১৭২)-এ উল্লেখ আছে:

"কুরআন স্পর্শ করা হারাম ঐ ব্যক্তির জন্য যে ওযু অবস্থায় নেই, আর জানাবাত অবস্থায় তো আরও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।"

২. পকেটে বা ব্যাগে কুরআন বহন করার বিধান

ক. ওযু অবস্থায়: যদি আপনি ওযু অবস্থায় থাকেন, তাহলে পকেটে বা ব্যাগে কুরআন বহন করা সম্পূর্ণ জায়েয। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন কুরআন অপবিত্র স্থানে না পড়ে এবং অন্য কোনো নাপাক জিনিসের সংস্পর্শে না আসে।

খ. ওযু ছাড়া অবস্থায়: ওযু ছাড়া অবস্থায় কুরআন বহন করার বিষয়ে ফিকহবিদদের মতভেদ রয়েছে:

  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে: ওযু ছাড়া অবস্থায় কুরআন স্পর্শ করা মাকরূহে তাহরীমি (নিষিদ্ধের কাছাকাছি)। তবে এমন আবরণে (কভার/গিলাফে) কুরআন বহন করা জায়েয যাতে সরাসরি কুরআন স্পর্শ করা না হয়।

  • ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে: কুরআনকে কোনো আবরণে (কভার, বক্স, থলে) রেখে বহন করলে তা জায়েয, যদিও ওযু না থাকে।

রদ্দুল মুহতার (১/১৭৩)-এ উল্লেখ আছে:

"কুরআনকে তার খোলা অবস্থায় (বিনা আবরণে) স্পর্শ করা হারাম, কিন্তু গিলাফ বা আবরণসহ স্পর্শ করা জায়েয।"

ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৬)-তে বর্ণিত:

"কুরআন মাজীদকে থলে বা বাক্সের মধ্যে রেখে বহন করা জায়েয, যদিও ব্যক্তি ওযু অবস্থায় না থাকে।"

৩. ব্যাগে কুরআন রাখার বিশেষ বিধান

স্কুল ব্যাগ বা কাঁধে বহন করা ব্যাগে কুরআন রাখার ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে:

১. আলাদা পকেট/থলে: কুরআনকে ব্যাগের এমন একটি আলাদা পকেটে বা থলেতে রাখুন যেখানে অন্য কোনো নাপাক জিনিস (যেমন: মোজা, রুমাল ইত্যাদি) না থাকে।

২. অপবিত্র স্থানে না রাখা: ব্যাগটি মাটিতে বা অপবিত্র স্থানে রাখা থেকে বিরত থাকুন। ব্যাগটি এমন জায়গায় রাখুন যেখানে কুরআনের সম্মান রক্ষা হয়।

৩. উঁচু স্থানে রাখা: সম্ভব হলে ব্যাগটি এমনভাবে রাখুন যেন কুরআন উঁচু স্থানে থাকে এবং পায়ের নিচে না পড়ে।

৪. জুব্বা বা পাঞ্জাবির পকেটে কুরআন রাখা

জুব্বা বা পাঞ্জাবির পকেটে ছোট সাইজের কুরআন রাখা জায়েয, তবে নিম্নোক্ত শর্তগুলো লক্ষ্য রাখতে হবে:

১. পকেটটি যেন পরিষ্কার ও পবিত্র হয়। ২. কুরআন যেন সরাসরি শরীরের সাথে না লাগে (গিলাফ/কভারসহ রাখা ভালো)। ৩. নামাজে দাঁড়ানোর সময় বা সিজদার সময় যেন কুরআন শরীরের নিচে না থাকে। ৪. পকেটে অন্য কোনো নাপাক জিনিস (যেমন: রুমাল, টিস্যু) না থাকে।

ফাতাওয়া উসমানী (১/৩৮৫)-তে উল্লেখ আছে:

"কুরআন মাজীদকে পকেটে রাখা জায়েয, যদি পকেট পবিত্র হয় এবং কুরআন কোনো আবরণে থাকে। তবে নামাজের সময় পকেটে কুরআন রাখা মাকরূহ, কারণ সিজদার সময় তা শরীরের নিচে চাপা পড়ে।"

৫. নামাজের সময় পকেটে কুরআন থাকলে

নামাজের সময় পকেটে বা শরীরে কুরআন থাকা সম্পর্কে ফিকহবিদদের মত:

  • ইমাম আবু হানীফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে: নামাজের সময় পকেটে কুরআন থাকলে নামাজ মাকরূহ হবে (যদিও নামাজ আদায় হয়ে যাবে)।

  • ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে: যদি কুরআন আবরণে থাকে এবং শরীরের সাথে লেগে না থাকে, তাহলে নামাজ মাকরূহ হবে না।

আল-হিদায়া (১/৮২)-তে উল্লেখ আছে:

"নামাজে এমন বস্তু থাকা মাকরূহ যাতে কুরআনের আয়াত লেখা থাকে, কারণ তা সিজদার সময় শরীরের নিচে চাপা পড়ে। তবে যদি তা আবরণে থাকে এবং শরীর থেকে পৃথক থাকে, তাহলে ইমাম মুহাম্মদের মতে মাকরূহ নয়।"

৬. সার্বক্ষণিক কুরআন সাথে রাখার আদব

সার্বক্ষণিক কুরআন সাথে রাখতে চাইলে নিম্নোক্ত আদবগুলো রক্ষা করা জরুরি:

১. পবিত্রতা বজায় রাখা: চেষ্টা করুন যতটা সম্ভব ওযু অবস্থায় থাকতে। তবে ওযু ছাড়া অবস্থায়ও আবরণসহ বহন করা জায়েয।

২. সম্মান রক্ষা: কুরআনকে সর্বদা সম্মানের সাথে রাখুন। কখনো অসম্মানজনক স্থানে (যেমন: টয়লেটে, নাপাক জায়গায়) নিয়ে যাবেন না।

৩. অপবিত্র স্থানে না নেওয়া: টয়লেট বা অপবিত্র স্থানে কুরআন নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ হারাম। এমন স্থানে কুরআন বহন করা যাবে না।

৪. পড়া না হলে: কুরআন সাথে থাকা অবস্থায় যদি পড়তে না পারেন, তবুও তা বহন করা জায়েয, তবে পড়ার নিয়ত থাকা ভালো।

৭. ফোনের অ্যাপ থেকে কুরআন পড়া

ফোনের অ্যাপ থেকে কুরআন পড়ার ক্ষেত্রে বিধান কিছুটা ভিন্ন:

  • ফোনের স্ক্রিনে কুরআনের আয়াত প্রদর্শিত হলে তা স্পর্শ করার জন্য ওযু শর্ত নয়, কারণ ফোনের স্ক্রিন কুরআনের পাতা হিসেবে গণ্য হয় না। তবে পড়ার সময় পবিত্র থাকা উত্তম।

  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) এবং মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম)-এর মতে, ফোনের স্ক্রিনে কুরআন দেখে পড়া জায়েয, তবে ফোনটি যেন অপবিত্র স্থানে না রাখা হয়।

মা'আরিফুল কুরআন (৮/২৩৪)-এ উল্লেখ আছে:

"ডিজিটাল মাধ্যমে কুরআন পড়ার ক্ষেত্রে ওযু শর্ত নয়, কারণ এটি কুরআনের পাতা নয়। তবে পড়ার সময় পবিত্র থাকা এবং সম্মান বজায় রাখা আবশ্যক।"

৮. সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা

আপনার জন্য সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো:

১. ছোট সাইজের কুরআন একটি সুন্দর গিলাফ/কভারে রেখে ব্যাগের আলাদা পকেটে রাখুন। ২. ব্যাগে কুরআনের সাথে নাপাক জিনিস রাখবেন না। ৩. সম্ভব হলে ওযু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করুন, তবে ওযু না থাকলেও আবরণসহ বহন করা জায়েয। ৪. নামাজের সময় পকেট থেকে কুরআন বের করে পাশে রাখুন। ৫. টয়লেট বা অপবিত্র স্থানে কুরআন নিয়ে যাবেন না। ৬. কুরআন বহনের মূল উদ্দেশ্য তিলাওয়াত—সুতরাং নিয়মিত তিলাওয়াতের সময় নির্ধারণ করুন।

উপসংহার

পকেটে বা ব্যাগে কুরআন বহন করা জায়েয, তবে শর্ত হলো কুরআন যেন আবরণে থাকে এবং অপবিত্র স্থানে না যায়। ওযু ছাড়া অবস্থায় আবরণসহ বহন করা জায়েয, তবে সরাসরি স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নামাজের সময় পকেটে কুরআন না রাখাই উত্তম। সর্বোপরি কুরআনের সম্মান ও আদব রক্ষা করাই মূল বিষয়।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কুরআনের খাদেম হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।


দলিলসমূহ:

  • সূরা আল-ওয়াকি'আহ: ৭৯
  • রদ্দুল মুহতার (১/১৭২-১৭৩)
  • ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৬)
  • আল-হিদায়া (১/৮২)
  • ফাতাওয়া উসমানী (১/৩৮৫)
  • মা'আরিফুল কুরআন (৮/২৩৪)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.