Book reading workshop এ যে বইগুলো থেকে পড়ানো হয় সেগুলো জন্য কী প্রকাশনীর অনুমতি প্রয়োজন?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্নের উত্তরে প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আপনি যে কাজটি করছেন বা যে ওয়ার্কশপে অংশ নিচ্ছেন, তা যদি কোনো বইয়ের সম্পূর্ণ লেখা বা উল্লেখযোগ্য অংশ হুবহু কপি করে শেয়ার করা হয়, তাহলে তা কপিরাইট আইন ও ইসলামী নীতিমালা উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই সমস্যাযুক্ত হতে পারে। তবে, যদি তা সারসংক্ষেপ, উদ্ধৃতি (Quote), বা বইটি পড়ার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়, তাহলে তা ভিন্ন বিষয়।
আসুন, বিষয়টি ইসলামী ফিকহ ও প্রচলিত আইনের আলোকে বিশ্লেষণ করি:
১. ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি (Hanafi Fiqh)
ইসলামী ফিকহে লেখক ও প্রকাশকের মেধাস্বত্ব (Intellectual Property) কে সম্মান করা হয়েছে। যদিও ক্লাসিকাল ফিকহের কিতাবগুলোতে "কপিরাইট" শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি, তবে এর মূলনীতি বিদ্যমান।
- মালিকানার সুরক্ষা: ইসলামে বৈধ উপার্জন ও সম্পদের মালিকানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লেখক এবং প্রকাশক তাদের পরিশ্রম ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বইটি প্রকাশ করেন। তাদের এই পরিশ্রমের ফলাফলের উপর তাদের ন্যায্য অধিকার রয়েছে। তাই তাদের অনুমতি ছাড়া বইয়ের বড় অংশ হুবহু কপি করে বিতরণ করা জুলুম বা অন্যায়ের শামিল।
- ইমাম আযম আবু হানিফা (রহঃ) এর নীতি থেকে আমরা শিখতে পারি যে, কারো সম্পদ বা পরিশ্রমের ফল অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা হারাম। যদিও এটি সরাসরি কপিরাইট সম্পর্কিত নয়, তবে এর মূলনীতি প্রযোজ্য।
- আধুনিক ফতোয়া: বর্তমান যুগের প্রখ্যাত হানাফি আলেমগণ, যেমন মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম), স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কপিরাইট আইন ইসলামী নীতির সাথে সাংঘর্ষিক নয়। লেখক বা প্রকাশকের অনুমতি ব্যতীত বইয়ের বড় অংশ হুবহু কপি করা, তা থেকে লাভবান হওয়া বা বিতরণ করা জায়েয নয়। (ফতোয়া উসমানি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৩২-এর আলোকে)
২. আপনার প্রশ্নের নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ
আপনি যে "Book Reading Workshop" এর কথা বলেছেন, সেখানে যা করা হয়:
- প্রতিদিন বইয়ের কিছু পৃষ্ঠা দেওয়া হয়।
- পরে সেই অংশের উপর কুইজ বা পরীক্ষা নেওয়া হয়।
এখানে মূল বিষয় হলো "কতটুকু অংশ" শেয়ার করা হচ্ছে:
- যদি শুধুমাত্র ১-২ পৃষ্ঠা বা একটি অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ (যেমন: ৫-১০ পৃষ্ঠা) শেয়ার করা হয় শুধুমাত্র পড়ার আগ্রহ তৈরি করার জন্য এবং পুরো বইটি কেনার জন্য উৎসাহিত করা হয়, তবে অনেক আলেম এবং প্রকাশক একে "ন্যায্য ব্যবহার" (Fair Use) এর মধ্যে গণ্য করেন। এটি সাধারণত সমস্যা নয়, কারণ এটি বইটির প্রচার ও বিক্রি বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
- কিন্তু যদি প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে (যেমন: ২০-৩০ পৃষ্ঠা) হুবহু কপি করে শেয়ার করা হয়, যার ফলে মানুষ বইটি কেনা বন্ধ করে দেয় এবং শুধুমাত্র টেলিগ্রাম চ্যানেল থেকে পড়ে নেয়, তাহলে এটি স্পষ্টতই প্রকাশকের ক্ষতি করবে। এই অবস্থায় প্রকাশনীর অনুমতি নেওয়া ফরজ বা আবশ্যক হয়ে যায়।
৩. প্রচলিত আইন ও করণীয়
বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কপিরাইট আইন রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, প্রকাশকের অনুমতি ছাড়া বইয়ের বড় অংশ পুনরুৎপাদন (Reproduction) ও বিতরণ (Distribution) একটি অপরাধ।
আপনার জন্য পরামর্শ:
- অনুমতি নিন: আপনি যদি কোনো বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ শেয়ার করার পরিকল্পনা করেন, তাহলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীর কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিন। বেশিরভাগ প্রকাশনীই শিক্ষামূলক উদ্যোগের জন্য অনুমতি দিতে আগ্রহী, বিশেষ করে যদি আপনি বইটির প্রচার করেন।
- সারসংক্ষেপ ব্যবহার করুন: বইয়ের হুবহু কপি না দিয়ে, আপনি বইটির মূল বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ বা মূল ধারণা নিজের ভাষায় লিখে দিতে পারেন। এতে করে কপিরাইট সমস্যা হবে না এবং পাঠকদের উপকারও হবে।
- বই কেনার পরামর্শ দিন: ওয়ার্কশপের শুরুতে এবং শেষে সবসময় উল্লেখ করুন যে, "সম্পূর্ণ বইটি পড়ার জন্য অবশ্যই প্রকাশনী থেকে সংগ্রহ করুন"। এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: হ্যাঁ, যদি আপনি বইয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ হুবহু কপি করে শেয়ার করেন, তাহলে প্রকাশনীর অনুমতি অবশ্যই প্রয়োজন। তবে, যদি তা অল্প কিছু পৃষ্ঠা বা সারসংক্ষেপ হয় এবং বইটি কেনার জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়, তাহলে সাধারণত অনুমতির প্রয়োজন হয় না, তবে প্রকাশনীকে অবহিত করা উত্তম।
আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।