হিন্দুদের হলি উৎসবের মত রেক ডেতে রং মাখামাখি করা, আলপনা অঙ্কন করলে কি ঈমানে কোনো সমস্যা হবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 348
Questioner: Mou
Question Asked: 19 May 2026, 11:57 AM
Reviewed & Published: 19 May 2026, 12:16 PM
Views: 45
Tokens: 4,173
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।আসসালামু আলাইকুম রেক ডে তে রং নিয়ে খেল্লে কি ছুট বা বড় শিরক বা কুফুরি হবে?হিন্দুদের একটা উতসাব আছে হলি বলে সেখান্ব তারা রং নিয় খেলে এটার সাথে সাদৃশ্য আছে।
২।অনুষ্ঠানে বাড়ি সাজানোর জন্য আলপনা আকা কি জায়েজ?যদি আকে ছুট বা বড় শিরক বা কুফুরি হবে?

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রথম প্রশ্ন: "রেক ডে"-তে রং খেলা ও হোলির সাথে সাদৃশ্য

প্রশ্নে উল্লেখিত "রেক ডে" সম্ভবত কোনো স্থানীয় অনুষ্ঠান, যা হোলির মতো রং খেলার সাথে সম্পর্কিত। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোনো অমুসলিম ধর্মীয় উৎসব বা তৎসদৃশ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা, সেটি হোলি, দীপাবলি, বড়দিন বা অন্য যেকোনো উৎসব হোক, তা জায়েজ নয়। বিশেষ করে যদি সেই অনুষ্ঠানটি শিরকি বিশ্বাস বা রীতির সাথে জড়িত থাকে।

হাদিসে এসেছে:

«مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ»
অর্থ: “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে।” (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১; মুসনাদ আহমাদ, হাদিস: ২/৫০)

হোলি হিন্দুদের একটি ধর্মীয় উৎসব, যা শিরকি বিশ্বাস ও রীতির উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো মুসলিম যদি রং খেলে শুধু বিনোদনের জন্যও তাতে অংশ নেয়, তবে এটি তাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণের শামিল হবে এবং তা নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। যদি কেউ এটিকে হোলি বা অন্য কোনো শিরকি উৎসবের অংশ হিসেবে পালন করে বা সেই বিশ্বাস রাখে যে এটি ধর্মীয় কোনো ফজিলতপূর্ণ কাজ, তাহলে তা শিরক বা কুফরি পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে।

সারকথা:

  • সাধারণ বিনোদন ও অমুসলিমদের সাদৃশ্য ছাড়া শুধু রং খেলা (যেমন: কোনো নির্দিষ্ট উৎসব ছাড়া নিজেদের মধ্যে খেলা) জায়েজ আছে কি না—এটা অন্য বিষয়। কিন্তু “রেক ডে” বা হোলির মতো নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় উৎসবের দিনে বা তার সাদৃশ্যে রং খেলা হারাম এবং তা গুনাহ।
  • যদি কেউ এটিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হিসেবে বিশ্বাস করে বা শিরকি রীতি পালনের নিয়তে করে, তাহলে তা কুফরি হতে পারে।
  • তবে সাধারণ গুনাহ (ছুট) থেকে বড় শিরক বা কুফরির পার্থক্য হলো: শিরক বা কুফর সাব্যস্ত হয় যখন কোনো কাজ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন বা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস অস্বীকারের পর্যায়ে পৌঁছে। অমুসলিমদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলে তাকে তাদের সাদৃশ্যের কারণে গুনাহগার বলা হবে, কিন্তু যতক্ষণ না তা বিশ্বাসগত পর্যায়ে পৌঁছে, ততক্ষণ তাকে কাফির বা মুশরিক বলা যাবে না।

হানাফি কিতাবের উল্লেখ:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণ করাকে মাকরুহ তাহরিমি বা হারাম বলা হয়েছে এবং তা ইমানের পরিপন্থী হতে পারে বলে উল্লেখ রয়েছে। (রদ্দুল মুহতার, ১/৪১৭)
  • ফতোয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): হোলি, দিওয়ালি ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ হারাম এবং ঈমানের জন্য হুমকিস্বরূপ। (ফতোয়া উসমানি, ২/৪৫২)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভি): অমুসলিমদের রীতি-রেওয়াজ ইচ্ছাকৃতভাবে পালন করা নাজায়েজ এবং শিরকের দিকে নিয়ে যেতে পারে। (ইমদাদুল ফতোয়া, ৫/২১৭)

সুতরাং, "রেক ডে" বা হোলির অনুকরণে রং খেলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। যদি কেউ তা করে, তবে তাকে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ জাতীয় কাজ থেকে দূরে থাকতে হবে।


দ্বিতীয় প্রশ্ন: অনুষ্ঠানে বাড়ি সাজানোর জন্য আলপনা আঁকা

আলপনা (আলপোনা) বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা, যা সাধারণত ফুল, লতা-পাতা, জ্যামিতিক নকশা ইত্যাদি দ্বারা মাটি বা দেওয়ালে আঁকা হয়। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এর বিধান নির্ভর করে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর উপর:

১. প্রাণী বা মানুষের ছবি আঁকা:
যদি আলপনায় প্রাণী বা মানুষের আকৃতি আঁকা হয়, তবে তা নাজায়েজ কারণ প্রাণী বা মানুষের ছবি আঁকা হারাম। হাদিসে এসেছে:

«لَا تَدْخُلُ الْمَلَائِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ أَوْ صُورَةٌ»
অর্থ: “যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে, সে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৪৯)

তবে অধিকাংশ আলপনা প্রাণী বা মানুষবিহীন ফুল, লতা ও জ্যামিতিক নকশার হয়ে থাকে, যা জায়েজ।

২. অমুসলিমদের রীতি সাদৃশ্য:
যদি আলপনা শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক বা সাজসজ্জার জন্য হয় এবং কোনো নির্দিষ্ট অমুসলিম ধর্মীয় উৎসবের রীতি হিসেবে না হয়, তবে সেটা জায়েজ। কিন্তু যদি এটি পূজা-পার্বণ বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অনুকরণে আঁকা হয় এবং সেই অনুষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে, তাহলে তা নাজায়েজ হবে। যেমন, হিন্দুদের পূজার সময় আলপনা আঁকা—তা তাদের ধর্মীয় রীতি, সেজন্য মুসলিমদের জন্য তা আঁকা হারাম।

৩. অপচয় ও বাড়াবাড়ি:
আলপনা আঁকার জন্য যদি অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় করা হয়, যা অপচয়ের পর্যায়ে পৌঁছে, তবে তা মাকরুহ হতে পারে।

৪. বিশ্বাস ও নিয়ত:
আলপনা আঁকার সময় যদি কারো মনে কোনো শিরকি বিশ্বাস (যেমন: নকশা সৌভাগ্য বয়ে আনে) থাকে, তাহলে তা শিরকের পর্যায়ে পৌঁছে। কিন্তু সাধারণ নিয়তে সাজসজ্জা করা জায়েজ।

সারকথা:

  • প্রাণী ও মানুষ ছাড়া আলপনা জায়েজ। তবে প্রাণী আঁকা হারাম।
  • অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের জন্য আলপনা আঁকা হারাম।
  • যদি কোনো ধর্মীয় অস্পষ্টতা না থাকে, সাধারণ অনুষ্ঠানে (যেমন: বিয়ে, ঈদ) বাড়ি সাজানোর জন্য আলপনা আঁকা জায়েজ এবং তা শিরক বা কুফর নয়।
  • ছোট গুনাহ (ছুট) হিসেবে গণ্য: যদি কোনো কারণে আলপনা আঁকা নাজায়েজ হয়, তবে তা ছোট গুনাহ হতে পারে, বড় শিরক বা কুফর নয়, যতক্ষণ না তা বিশ্বাসগত পর্যায়ে পৌঁছে।

হানাফি কিতাবের উল্লেখ:

  • রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): দেওয়ালে ফুল-লতার ছবি আঁকা জায়েজ, তবে প্রাণীর ছবি হারাম। (রদ্দুল মুহতার, ১/২৯২)
  • ফতোয়া আলমগিরি (হিন্দিয়া): انسان و حیوان کی صورت کے بغیر نقش و نگار جائز ہے۔ (فتاویٰ ہندیہ، ৫/৩৫۳)
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): অমুসলিমদের রীতি সাদৃশ্য গ্রহণ করা নিষেধ, তবে সাংস্কৃতিক বিষয় যদি ধর্মীয় চিহ্ন না হয় তবে জায়েজ। (মাআরিফুল কুরআন, সূরা আল-হাশরের তাফসির)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভি): আলপনা বা রঙিন নকশা আঁকা যদি অমুসলিমদের পূজা-পদ্ধতির অনুকরণ না হয় তবে জায়েজ। (ইমদাদুল ফতোয়া, ৩/৩৭৯)

সতর্কতা: বর্তমানে অনেক মুসলিম বাড়িতে বাংলা নববর্ষ (পহেলা বৈশাখ)-এর সময় আলপনা আঁকা হয়। এটি যদিও ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠান, তবে এর মধ্যে অমুসলিম রীতির কিছু উপাদান থাকায় সাধারণ মুসলিমদের জন্য এড়িয়ে চলাই উত্তম। তবে এটি কুফরি বা শিরক নয়।


পরিশেষে:

  • প্রথম প্রশ্ন: রেক ডে বা হোলির মতো অনুষ্ঠানে রং খেলা হারাম ও গুনাহ। বিশ্বাসের সাথে করলে শিরক হতে পারে।
  • দ্বিতীয় প্রশ্ন: প্রাণীবিহীন আলপনা সাধারণ অনুষ্ঠানে আঁকা জায়েজ, তবে অমুসলিম ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য নয়। তা শিরক বা কুফর নয়।

আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.