ওয়ারিশগন একে অন্যের কাছে সম্পদ দাবী করতে পারবে কিনা?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
বাবার বাড়ী থেকে এভাবে বছরের পর বছর টাকা আনার কারনে উক্ত মহিলার বাবা জীবিত থাকতেই তাকে অন্য বোনদের চেয়ে কম সম্পদ দিয়ে গিয়েছেন। এজন্য উক্ত মহিলা পরবর্তীতে তার স্বামীর কাছে এত বছরের টাকা পয়সা এনে দেয়ার বিনিময়ে তাকে ৩৬ শতাংশের একটি জমি দেয়ার দাবী করেন। কিন্তু তার স্বামী তাকে পুরো ৩৬ শাতাংশ না দিয়ে এর অর্ধেক ১৮ শতাংশ জমি দেন। কিন্তু উক্ত মহিলা তা মানেন নি। এটা নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক মনোমালিন্য হয়। পরবর্তীতে প্রায় সময় এই বিষয়টা সামনে আসলে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য হতো।
১২ বছর আগে উক্ত মহিলার স্বামী মারা যান। এত বছরেও স্বামীর ওয়ারিশদের মধ্যে মিরাছ বন্টন হয় নি। স্বামীর মৃত্যুর পরেও স্বামীর ওয়ারিশদের কাছে অর্থাৎ উক্ত মহিলার সন্তানদের কাছেও তার বাবার বাড়ী থেকে অর্থ আনার বিনিময়ে সম্পদ দাবী করেন। এতদিনে মীরাছ বন্টন না হওয়ায় ওয়ারিশগন ও এতে কর্ণপাত করেন নি।
কিছুদিনের মধ্যে স্বামীর মিরাছ ওয়ারিশগনের মাঝে বন্টনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। উক্ত মহিলা সত্তরের ওপরে বয়স এবং অনেক অসুস্থ। প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা চিকিৎসার খরচই লাগে। এজন্য উক্ত মহিলা এখন ঐ সম্পদের আরও বেশি জোর দাবী করছেন, যা দিয়ে তিনি চিকিৎসা সহ অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করবেন।
তিনি দাবী করছেন, "তোমাদের সংসারে আমার বাবার বাড়ী থেকে অনেক টাকা পয়সা এনে সাহায্য করেছি। তোমার বাবার কাছে উক্ত জমিটা চেয়েছিলাম, উনি আমাকে অর্ধেক দিয়ে বাকীটা দেন নি। তোমরা তো জানো এবং দেখেছো, আমি যে এনেছি। এজন্য আমার বাবার বাড়ি থেকেও সম্পদ কম পেয়েছি। এখন আমার চিকিৎসায় অনেক টাকা পয়সা খরচ হচ্ছে। তোমার বাবা দেন নি, এখন তোমরা বিবেক খাটিয়ে আমাকে তোমার বাবার সম্পদ থেকে দাও, যা দিয়ে আমি প্রায়োজন পূরণ করবো।" অবশ্য উনি যা দাবী করছেন তা ওয়ারিশের ইনসাফের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, উক্ত জমি ছাড়াও উনার স্বামীর আরো সম্পদ আছে।
এখন প্রশ্ন হলোঃ
(এক) উক্ত মহিলা স্বামীর ওয়ারিশের কাছে অর্থাৎ মহিলার সন্তানদের কাছে উনার স্বামীর সংসারে যে টাকা পয়সা ব্যয় করেছে, এর বিনিময়ে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে যে অর্থের দাবী করছেন, তা কুরআন ও সুন্নাহ সম্মত কিনা অর্থাৎ বৈধ কিনা?
(দুই) উক্ত মহিলার দাবীর ফলে স্বামীর ওয়ারিশগন অর্থাৎ উক্ত মহিলার সন্তানগণ স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে উক্ত মহিলার মিরাছ হিসেবে প্রাপ্ত সম্পদের বাইরে অতিরিক্ত দিতে বাধ্য কিনা?
(তিন) ওয়ারিশগন চাইলে বিবেক ও ইনসাফের তাগিদে মিরাছ বন্টনের আগে উক্ত মহিলার স্বামীর সম্পদ থেকে কিছু সম্পদ উক্ত মহিলা মানে তাদের মাকে দিতে পারবে কিনা?
উত্তরগুলো প্রদান করলে কৃতজ্ঞ থাকবো, ইনশাআল্লাহ।
Answer
উত্তর
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الأمين وعلى آله وأصحابه أجمعين أما بعد
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
একজন মহিলা তার স্বামীর সংসারে নিজের পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় করেছেন। এখন স্বামী মৃত্যুবরণ করার পর তিনি তার সন্তানদের (ওয়ারিশদের) কাছে দাবি করছেন যে, তিনি যে অর্থ স্বামীর সংসারে ব্যয় করেছেন তার বিনিময়ে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে অতিরিক্ত অংশ দেওয়া হোক। অথচ ইসলামী আইনে স্ত্রী হিসেবে তিনি ইতিমধ্যে মিরাছ (উত্তরাধিকার) প্রাপ্য।
(এক) উক্ত মহিলার দাবি কি বৈধ?
উত্তর: ইসলামী আইন অনুযায়ী, স্ত্রী তার নিজস্ব অর্থ স্বামীর সংসারে খরচ করলে তা যদি দান (تبرع) হিসেবে হয়, তবে তিনি এর বিনিময়ে কোনো দাবি করতে পারবেন না। কিন্তু যদি তা ঋণ (قرض) হিসেবে হয়, তবে তিনি তা ফেরত দাবি করতে পারবেন।
এখানে মূল বিষয় হলো মহিলার নিয়্যত (উদ্দেশ্য) কী ছিল:
-
যদি তিনি দান হিসেবে দিয়ে থাকেন: তাহলে তিনি এখন আর এর বিনিময়ে দাবি করতে পারবেন না। কেননা দান ফেরত নেওয়া জায়েয নয়।
-
যদি তিনি ঋণ হিসেবে দিয়ে থাকেন: তাহলে তিনি স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে তার প্রাপ্য আদায় করতে পারবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তার কাছে প্রমাণ থাকতে হবে যে তা ঋণ ছিল।
রদ্দুল মুহতার (শামী) এ উল্লেখ আছে:
"الْأَصْلُ أَنَّ مَالَ الْمَرْأَةِ لَا يَدْخُلُ فِي مِلْكِ الزَّوْجِ إلَّا بِعِوَضٍ أَوْ تَبَرُّعٍ" "মূল নীতি হলো, স্ত্রীর সম্পদ স্বামীর মালিকানায় প্রবেশ করে না, তবে বিনিময় বা দানের মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে।"
(রদ্দুল মুহতার, ৫/৭৮৫)
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মহিলা নিজেই বলেছেন যে তিনি "সাহায্য" করেছেন। সাহায্য শব্দটি সাধারণত দান বুঝায়। তাই যদি তিনি দান হিসেবে দিয়ে থাকেন, তাহলে তা ফেরত দাবি করা জায়েয হবে না।
কিন্তু যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে, তিনি ঋণ হিসেবে দিয়েছিলেন এবং স্বামী তা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাহলে তিনি স্বামীর সম্পত্তি থেকে তা আদায় করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে তার কাছে স্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে।
(দুই) ওয়ারিশগণ কি অতিরিক্ত দিতে বাধ্য?
উত্তর: না, ওয়ারিশগণ মিরাছের বাইরে অতিরিক্ত দিতে বাধ্য নয়। ইসলামী আইনে মিরাছের হিসাব নির্ধারিত। স্ত্রী মিরাছ হিসেবে স্বামীর সম্পত্তির ১/৮ অংশ পাবেন (যদি সন্তান থাকে)।
মহিলা যদি প্রমাণ করতে পারেন যে তার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তাহলে তা মিরাছ বন্টনের আগে আদায় করা হবে। কেননা ঋণ পরিশোধ করা মিরাছ বন্টনের পূর্বশর্ত।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
"مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ" "ওসিয়্যাত বা ঋণ পরিশোধের পর।"
(সূরা আন-নিসা: ১১-১২)
তাই যদি ঋণ প্রমাণিত হয়, তাহলে তা সম্পত্তি থেকে আদায় করা হবে। কিন্তু যদি তা দান হয়, তাহলে ওয়ারিশগণ অতিরিক্ত দিতে বাধ্য নয়।
(তিন) ওয়ারিশগণ বিবেক ও ইনসাফের তাগিদে মাকে দিতে পারবে কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, ওয়ারিশগণ চাইলে নিজেদের ইচ্ছায় মিরাছ বন্টনের আগে বা পরে তাদের মাকে কিছু সম্পদ দিতে পারবেন। এটি তাদের পক্ষ থেকে হিবা (দান) হিসেবে গণ্য হবে। ইসলামে সন্তানদের জন্য মা-বাবাকে উপহার দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
তবে এখানে কয়েকটি শর্ত রয়েছে:
-
সকল ওয়ারিশের সম্মতি: যদি সব ওয়ারিশ (সন্তান) সম্মত হন, তাহলে তারা মাকে অতিরিক্ত সম্পদ দিতে পারবেন।
-
ন্যায্যতা: ইসলামী আইনে মিরাছ বন্টনের সময় সবার প্রাপ্য সঠিকভাবে দেওয়া উচিত। তবে সন্তানরা যদি নিজেদের অংশ থেকে মাকে দিতে চান, তা জায়েয।
-
পক্ষপাতিত্ব না করা: যদি কোনো ওয়ারিশ আপত্তি করেন, তাহলে জোর করে নেওয়া যাবে না।
রদ্দুল মুহতার এ উল্লেখ আছে:
"لَا يَجُوزُ تَفْضِيلُ بَعْضِ الْوَرَثَةِ عَلَى بَعْضٍ فِي الْحَيَاةِ إلَّا بِرِضَاهُمْ" "জীবদ্দশায় কোনো ওয়ারিশকে অপরের ওপর প্রাধান্য দেওয়া জায়েয নয়, তবে সবার সম্মতিতে জায়েয।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪/৫১৪)
অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
১. মহিলার চিকিৎসা খরচ: মহিলার চিকিৎসা খরচ তার নিজের দায়িত্ব। তার মিরাছের অংশ থেকে তিনি তা বহন করবেন। যদি তার অংশ অপর্যাপ্ত হয়, তাহলে সন্তানদের জন্য মায়ের ভরণপোষণ দেওয়া উত্তম এবং সওয়াবের কাজ। ইসলামে পিতা-মাতার খেদমত করা সন্তানের কর্তব্য।
২. মিরাছ বন্টন: যেহেতু ১২ বছর হয়ে গেছে, মিরাছ বন্টন দেরি করা উচিত নয়। দ্রুত মিরাছ বন্টন করা প্রত্যেকের কর্তব্য।
৩. মহিলার বাবার সম্পত্তি: মহিলা তার বাবার কাছ থেকে কম সম্পদ পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু এটি তার বাবার সিদ্ধান্ত ছিল। বাবা জীবদ্দশায় সন্তানদের মধ্যে সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা বজায় রাখা উচিত ছিল। তবে এখন বাবা মারা গেলে এই বিষয়ে নতুন করে দাবি করা জটিল।
পরামর্শ
১. মহিলা যদি মনে করেন তার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তাহলে তিনি প্রমাণসহ দাবি করতে পারেন। কিন্তু যদি তা দান হয়ে থাকে, তাহলে দাবি করা উচিত নয়।
২. সন্তানদের উচিত মায়ের প্রতি সদয় হওয়া এবং তার চিকিৎসার খরচ বহন করা। এটি তাদের নৈতিক দায়িত্ব।
৩. মিরাছ বন্টন দ্রুত সম্পন্ন করা উচিত এবং সবার প্রাপ্য সঠিকভাবে দেওয়া উচিত।
৪. সন্তানরা চাইলে নিজেদের ইচ্ছায় মাকে অতিরিক্ত সম্পদ দিতে পারেন, তবে তা সবার সম্মতিতে।
والله أعلم بالصواب