অন্যর বিয়ের ভিডিও ডিলেট হয়ে গেলে কি আমাকে দায়ভার নিতে হবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 3433
Questioner: Mahzabin Mimmi
Question Asked: 03 Aug 2026, 04:50 AM
Reviewed & Published: 03 Aug 2026, 05:19 AM
Views: 9
Tokens: 9,499
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

মুহতারাম মুফতি সাহেব, আসসালামু আলাইকুম।
আমি একটি পারিবারিক ও শরয়ী বিষয়ে আপনার কাছে ফতোয়া বা সঠিক দিকনির্দেশনা আশা করছি। ঘটনাটি নিম্নরূপ:
আমার এক খালাতো ভাইয়ের পরিবারের সাথে আমাদের সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন রয়েছে। তাদের দিক থেকে দূরত্ব বজায় রাখার প্রবণতা থাকলেও, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার তাগিদে আমরা সবসময়ই ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছি। তারা কিছুটা দ্বীন পালন করলেও তাদের মধ্যে শরীয়তের পূর্ণাঙ্গ বুঝ নেই।
সম্প্রতি আমার সেই খালাতো ভাই তার বিয়ের একটি ভিডিও ইউটিউবে 'পাবলিক' করে দেয়। ভিডিওটিতে গান-বাজনা, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা (ফ্রি-মিক্সিং) এবং নারীদের বেপর্দা দৃশ্য ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আমি বর্তমানে কঠোরভাবে পর্দা পালন করি (এমনকি গাইরে মাহরামের সামনে কণ্ঠের পর্দাও রক্ষা করি)। কিন্তু ওই ভিডিওটিতে আমার আগের কিছু বেপর্দা, সাজগোজ করা এবং নাচানাচির দৃশ্য ছিল।
ভিডিওটি পাবলিক হওয়ার পর আমি আমার ভাইয়ের স্ত্রীকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলি। আমি অনুরোধ করি যেন আমার পর্দার স্বার্থে ভিডিওটি ডিলিট করে দেওয়া হয় অথবা অন্তত প্রাইভেট করে দেওয়া হয়। কিন্তু তারা আমার কথায় কোনো কর্ণপাত করেনি এবং কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি।
এক সপ্তাহ অপেক্ষার পর আমি মানসিকভাবে অত্যন্ত ভেঙে পড়ি। নিরুপায় হয়ে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া ও ইস্তিগফার করি এবং ইউটিউবে শুধুমাত্র আমার উপস্থিতির সময়গুলো (Timestamps) উল্লেখ করে রিপোর্ট করি। আমি মূলত আমার দৃশ্যগুলো সরানোর জন্যই রিপোর্ট করেছিলাম। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ তাদের চ্যানেল থেকে পুরো ভিডিওটিই ডিলিট করে দেয়। কাকতালীয়ভাবে তাদের কাছে ওই ভিডিওটির কোনো ব্যাকআপও ছিল না।
এই ঘটনার পর তারা বিষয়টি জানতে পেরে আমার ওপর অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছে। তারা আমাকে নানাভাবে বাজে কথা বলছে, অপবাদ দিচ্ছে এবং এর ফলে আমার মা-ও কান্নাকাটি করছেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, তারা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো আচরণ করছে।
এমতাবস্থায় আমার জানার বিষয় হলো:
১. নিজের পর্দার সুরক্ষার জন্য আমি যে রিপোর্ট করেছি এবং এর ফলে তাদের পুরো ভিডিওটি ডিলিট হয়ে গেছে— এতে কি আমার কোনো গুনাহ হয়েছে বা আমি কি কারো হক নষ্ট করেছি?
২. এই ঘটনার জের ধরে তারা যদি আমার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে বা খারাপ আচরণ করে, তবে ইসলামি শরীয়তে এর দায়ভার কার ওপর বর্তাবে? এক্ষেত্রে আমার করণীয় কী?
কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিলে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ থাকব।

Answer

উত্তরে প্রাণভরে সালাম ও দু'আ

উত্তর:

আপনার প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ। নিম্নে কুরআন-সুন্নাহ ও হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করে উত্তর প্রদান করা হলো:


১. রিপোর্ট করার কারণে আপনার গুনাহ হয়েছে কি?

মূল নীতি: ইসলামে নিজের ইজ্জত-আব্রু ও পর্দা রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا "আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা সাধারণত প্রকাশ হয়ে পড়ে তা ছাড়া।" (সূরা আন-নূর: ৩১)

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন:

وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا "যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় এমন বিষয়ে যা তারা অর্জন করেনি, তারা অবশ্যই অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করল।" (সূরা আল-আহযাব: ৫৮)

আপনার করণীয় সম্পর্কে ফিকহি বিশ্লেষণ:

১. পর্দা রক্ষা করা ফরজ: আপনার পর্দা রক্ষা করা আপনার উপর ফরজ ছিল। ভিডিওতে আপনার বেপর্দা দৃশ্য থাকায় তা আপনার জন্য ক্ষতির কারণ ছিল।

২. রিপোর্ট করা জায়েয: নিজের পর্দা ও ইজ্জত রক্ষার জন্য ইউটিউবে রিপোর্ট করা জায়েয ছিল। কারণ এটি ছিল আপনার শরয়ী অধিকার রক্ষার প্রচেষ্টা।

৩. পুরো ভিডিও ডিলিট হওয়া: আপনি শুধুমাত্র আপনার দৃশ্যগুলো (Timestamps) উল্লেখ করে রিপোর্ট করেছিলেন, পুরো ভিডিও ডিলিটের জন্য নয়। ইউটিউব কর্তৃপক্ষ পুরো ভিডিওটি ডিলিট করেছে—এটি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। তাই এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই।

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:

"নিজের ইজ্জত-আব্রু রক্ষার জন্য অন্যায়ভাবে কারো উপর দোষারোপ করা জায়েয নয়, কিন্তু নিজের হক রক্ষার জন্য বৈধ উপায় অবলম্বন করা জায়েয।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৪২)

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন:

"নিজের পর্দা ও ইজ্জত রক্ষার জন্য বৈধ উপায়ে প্রতিকার চাওয়া জায়েয, এমনকি তা অন্য কারো ক্ষতির কারণ হলেও, যদি উদ্দেশ্য নিজের হক রক্ষা করা হয়।" (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৪/২৩০)

সারমর্ম: আপনার রিপোর্ট করা ছিল নিজের পর্দা রক্ষার বৈধ প্রচেষ্টা। আপনি কারো হক নষ্ট করেননি। পুরো ভিডিও ডিলিট হওয়া আপনার ইচ্ছার বাইরে ছিল। তাই এতে আপনার কোনো গুনাহ নেই।


২. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে দায় কার উপর?

মূল নীতি: আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ইসলামে কবিরা গুনাহ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ "আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহিহ বুখারী: ৫৯৮৪; সহিহ মুসলিম: ২৫৫৬)

আল্লাহ তাআলা বলেন:

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ "তোমরা কি তবে প্রত্যাবর্তন করলে পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে?" (সূরা মুহাম্মাদ: ২২)

দায়ভার: যদি তারা আপনার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে বা খারাপ আচরণ করে, তবে এর দায়ভার তাদের উপরই বর্তাবে। কারণ আপনি তো সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা করেছেন এবং বৈধ উপায়ে নিজের পর্দা রক্ষা করেছেন। তাদের ক্ষোভ ও সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের গুনাহ।

মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন:

"যদি কেউ বৈধ উপায়ে নিজের হক রক্ষা করে এবং এর ফলে অন্য ব্যক্তি ক্ষুব্ধ হয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে সম্পর্ক ছিন্নকারীর উপরই গুনাহ হবে, কারণ সে নিজেই সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।" (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৫০)


আপনার করণীয়:

১. ধৈর্য ধারণ করুন: আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৩)

২. দোয়া ও ইস্তিগফার চালিয়ে যান: আপনার কাজটি সঠিক ছিল, তাই আত্মবিশ্বাস রাখুন।

৩. সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যান: তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করুন, সালাম দিয়ে কথা বলুন, তাদের খোঁজ নিন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

لَيْسَ الْوَاصِلُ بِالْمُكَافِئِ وَلَكِنِ الْوَاصِلُ الَّذِي إِذَا قُطِعَتْ رَحِمُهُ وَصَلَهَا "সে-ই সম্পর্ক রক্ষাকারী নয় যে প্রতিদান দেয়, বরং সে-ই সম্পর্ক রক্ষাকারী যে সম্পর্ক ছিন্ন হলে পুনরায় জোড়ে।" (সহিহ বুখারী: ৫৯৯১)

৪. ক্ষমা করুন: তাদের ক্ষমা করে দিন, যদিও তারা আপনার প্রতি অন্যায় করে। আল্লাহ ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন।

৫. মাকে সান্ত্বনা দিন: আপনার মাকে বুঝান যে আপনি সঠিক কাজ করেছেন এবং আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে বলুন।


সংক্ষিপ্ত উত্তর:

১. আপনার রিপোর্ট করা জায়েয ছিল এবং এতে আপনার কোনো গুনাহ হয়নি। আপনি কারো হক নষ্ট করেননি। পুরো ভিডিও ডিলিট হওয়া আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।

২. তারা যদি সম্পর্ক ছিন্ন করে, তবে দায়ভার তাদের উপরই বর্তাবে। আপনার করণীয় হলো ধৈর্য ধরা, সম্পর্ক রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং তাদের জন্য দোয়া করা।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.