মধু ফারমেন্টেড হলে কি হারাম?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
মধু ও বাদামের মিশ্রণ ফারমেন্টেড হয়ে গেলে তার বিধান
উত্তর
মধু ও বাদামের মিশ্রণ যদি ফারমেন্টেড (fermented) হয়ে এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যে তা নেশা সৃষ্টিকারী (intoxicating) হয়ে যায়, তবে তা নাপাক এবং খাওয়া হারাম।
তবে যদি ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় সামান্য পরিমাণে অ্যালকোহল তৈরি হয় কিন্তু তা নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে না পৌঁছায় এবং মূল পদার্থের স্বাদ-গন্ধ অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে তা নাপাক নয় এবং খাওয়া জায়েয।
দলিল ও বিস্তারিত আলোচনা
১. কুরআন ও হাদীসের দলিল
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ "হে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী এবং ভাগ্য-নির্ধারক তীর—এসব শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত নাপাক বস্তু। সুতরাং তোমরা এসব থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হও।" (সূরা আল-মায়িদাহ: ৯০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ "প্রতিটি নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই মদ এবং প্রতিটি নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু হারাম।" (সহীহ মুসলিম: ২০০৩)
২. হানাফী ফিকহের নীতিমালা
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে, তরল পদার্থের ক্ষেত্রে নেশা সৃষ্টিকারী হওয়াই হারাম হওয়ার মানদণ্ড। যদি কোনো তরল পদার্থ নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তবে তা নাপাক এবং হারাম।
ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর মতে, অল্প পরিমাণেও খামির (fermentation) হলে তা নাপাক, যদি তা খেজুর বা আঙ্গুরের রস হয়। তবে অন্যান্য তরলের ক্ষেত্রে তাদের মত হলো—নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে পৌঁছালেই কেবল হারাম।
ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর প্রসিদ্ধ মতানুসারে, মধু বা বাদামের মিশ্রণ যদি ফারমেন্টেড হয়ে নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তবে তা নাপাক ও হারাম।
৩. ফাতাওয়া আলমগীরী ও রদ্দুল মুহতার থেকে
ফাতাওয়া আলমগীরীতে উল্লেখ আছে:
العسل إذا غلى حتى صار مسكرا يحرم شربه عند أبي حنيفة رحمه الله "মধু যখন ফুটে/ফারমেন্টেড হয়ে নেশা সৃষ্টিকারী হয়ে যায়, তখন ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) এর মতে তা পান করা হারাম।" (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫/৩০৭)
রদ্দুল মুহতারে ইবনে আবিদীন (রহঃ) উল্লেখ করেছেন:
كل مسكر حرام نجس عندنا "আমাদের (হানাফী) মতে প্রতিটি নেশা সৃষ্টিকারী বস্তু হারাম ও নাপাক।" (রদ্দুল মুহতার, ১/২০৮)
৪. মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) এর বক্তব্য
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহঃ) তার "জাওয়াহিরুল ফিকহ" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
যেকোনো তরল পদার্থ যখন নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা নাপাক এবং পান করা হারাম। তবে যদি ফারমেন্টেশন প্রক্রিয়ায় সামান্য অ্যালকোহল তৈরি হয় কিন্তু তা নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে না পৌঁছায় এবং মূল পদার্থের স্বাদ-গন্ধ অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে তা নাপাক নয়।
৫. মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) এর বক্তব্য
মুফতী তাকী উসমানী (দামাত বারাকাতুহুম) তার "ফিকহুল বুয়ূ" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন:
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, কোনো তরল পদার্থে যদি নেশা সৃষ্টিকারী পরিমাণে অ্যালকোহল তৈরি হয়, তবে তা নাপাক ও হারাম। কিন্তু যদি অ্যালকোহলের পরিমাণ এত নগণ্য হয় যে তা নেশা সৃষ্টি করে না এবং মূল পদার্থের স্বাদ-গন্ধ অপরিবর্তিত থাকে, তবে তা পাক ও জায়েয।
সারসংক্ষেপ
| অবস্থা | বিধান | |--------|--------| | মধু-বাদামের মিশ্রণ ফারমেন্টেড হয়ে নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে পৌঁছেছে | নাপাক ও হারাম | | সামান্য ফারমেন্টেশন হয়েছে কিন্তু নেশা সৃষ্টিকারী নয় এবং স্বাদ-গন্ধ অপরিবর্তিত | পাক ও জায়েয | | ফারমেন্টেশন হয়নি | পাক ও জায়েয |
ব্যবহারিক নির্দেশনা
১. প্রশ্নে উল্লেখিত "গেজিয়ে গেছে" অর্থাৎ ফারমেন্টেড হয়ে অ্যালকোহলে পরিণত হয়েছে—যদি তা নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে পৌঁছে থাকে, তবে তা নাপাক এবং খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম।
২. যদি আপনি নিশ্চিত না হন যে তা নেশা সৃষ্টিকারী পর্যায়ে পৌঁছেছে কিনা, তবে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম এবং তা পরিত্যাগ করা উচিত।
৩. এই ধরনের মিশ্রণ যদি নেশা সৃষ্টিকারী হয়ে যায়, তবে তা বিক্রি করাও জায়েয নয়।
আল্লাহ তাআলাই সর্বজ্ঞ।