মানুষকে ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা না রাখা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
* এখন আমার প্রশ্ন হল এইটার জন্য কি আমার ওয়াদা ভঙ্গের গোনাহ হবে?
* আরেকটা প্রশ্ন হচ্ছে যদি আমি বলতাম যে হ্যাঁ কথা রাখবো তখন আবার কি করতে হতো?
* এই টাইপের লোক সম্পর্কে সমালোচনা করা কি গীবতের পর্যায়ে হয়ে যাবে ?
* কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষের অগোচরে তার সমালোচনা করা যাবে?
Answer
মানুষকে ওয়াদা দিয়ে ওয়াদা না রাখা
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত। আমি হানাফি মাযহাবের আলোকে কুরআন, হাদিস এবং প্রামাণ্য কিতাবসমূহের ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করছি।
১. ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ হবে কি?
আপনি যখন নীরব ছিলেন এবং "হ্যাঁ" বলেননি, তখন technically আপনার পক্ষ থেকে কোনো ওয়াদা বা অঙ্গীকার সাব্যস্ত হয়নি। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ওয়াদা শুধুমাত্র স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করলেই সাব্যস্ত হয়। নীরব থাকা বা চুপ করা ওয়াদা হিসেবে গণ্য হয় না।
তবে ইসলামী নীতিশাস্ত্রে (আখলাক) একটি বিষয় রয়েছে—যদি কেউ আপনার কাছে কোনো বিষয় গোপন রাখতে বলে এবং আপনি নীরব থেকে তাকে উৎসাহিত করেন, তাহলে তা নৈতিকভাবে দায়িত্বশীলতার পর্যায়ে আসতে পারে। কিন্তু যেহেতু আপনি স্পষ্টভাবে কোনো অঙ্গীকার করেননি, তাই শরীয়তের দৃষ্টিতে আপনার ওপর ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ হবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তিনটি বিষয় মুনাফিকের আলামত: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, আর আমানত রাখলে খিয়ানত করে।" (সহিহ বুখারি: ৩৩; সহিহ মুসলিম: ৫৯)
যেহেতু আপনি ওয়াদা করেননি, তাই এই হাদিসের আওতায় আপনি পড়ছেন না।
২. যদি আপনি "হ্যাঁ, কথা রাখবো" বলতেন, তখন কী করতে হতো?
যদি আপনি স্পষ্টভাবে বলতেন "হ্যাঁ, আমি কাউকে বলবো না", তাহলে সেটি একটি ওয়াদা হিসেবে গণ্য হতো। তখন আপনার করণীয় ছিল:
ক. ওয়াদা ভঙ্গ না করা: সাধারণ অবস্থায় ওয়াদা পূরণ করা ওয়াজিব। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"আর তোমরা অঙ্গীকার পূরণ করো। নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (সূরা বনী ইসরাইল: ৩৪)
খ. তবে ব্যতিক্রম পরিস্থিতিতে: যদি ওই ওয়াদা পূরণে কারো ক্ষতি হয় বা অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে ওয়াদা ভঙ্গ করা জায়েয। কেননা রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"মুসলিমের ওপর শর্তসমূহ পূরণ করা আবশ্যক, তবে সেই শর্ত ছাড়া যা হারামকে হালাল করে বা হালালকে হারাম করে।" (সুনানে তিরমিজি: ১৩৫২; সুনানে আবু দাউদ: ৩৫৯৪)
আপনার ক্ষেত্রে, সেই মহিলা মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার করে তা ফেরত না দেওয়া এবং পরিবারে ঝামেলা সৃষ্টি করা—এটি অন্যায় কাজ। তাই আপনি যদি "হ্যাঁ" বলেও থাকতেন, তবুও পরিবারের কল্যাণ এবং অন্যায় প্রতিরোধের জন্য তার টাকা চাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করা জায়েয হতো। তবে উত্তম পদ্ধতি হলো—প্রথমে তাকে সরাসরি বোঝানোর চেষ্টা করা, তারপর প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের জানানো।
৩. এই ধরনের লোক সম্পর্কে সমালোচনা করা কি গীবত হবে?
গীবতের সংজ্ঞা: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা সে অপছন্দ করে, সেটিই গীবত।" (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৯)
যদি আপনি তার সম্পর্কে এমন কিছু বলেন যা সত্য এবং সে তা অপছন্দ করে, তাহলে সেটি গীবত হবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে গীবত জায়েয আছে।
৪. কোন কোন ক্ষেত্রে মানুষের অগোচরে সমালোচনা করা যাবে?
ইমাম নববী (রহ.) এবং ফুকাহায়ে কেরাম গীবত জায়েয হওয়ার ৬টি ক্ষেত্র উল্লেখ করেছেন:
ক. জুলুম/অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য: কারো জুলুমের বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়ার জন্য। যেমন—কারো কাছ থেকে টাকা ধার করে ফেরত না দেওয়া একটি জুলুম। আপনি বা আপনার পরিবার যদি তার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা জায়েয।
খ. ফতোয়া জানার জন্য: কোনো মুফতির কাছে পরামর্শ চাওয়ার সময়।
গ. সতর্ক করার জন্য: মুসলিমদেরকে কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচানোর জন্য। যেমন—কেউ প্রতারক বা ধোঁকাবাজ হলে তাকে সম্পর্কে অন্যদের সতর্ক করা। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমাদের মধ্যে কেউ যদি এমন কিছু দেখে যা সে অপছন্দ করে, তাহলে সে যেন বলতে পারে।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৭৮৪)
ঘ. প্রকাশ্য পাপাচারী: যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে পাপ করে, তার সম্পর্কে সমালোচনা করা জায়েয।
ঙ. পরিচয়ের জন্য: কাউকে চেনানোর জন্য।
চ. উপদেশ দেওয়ার জন্য: যিনি উপদেশ দিচ্ছেন, তার সম্পর্কে বলা।
আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিধান:
১. আপনার পরিবারের ক্ষেত্রে: যেহেতু সেই মহিলার ঋণ নেওয়ার কারণে আপনার পরিবারে ঝামেলা হচ্ছে এবং তিনি মানুষের টাকা ফেরত দিচ্ছেন না, তাই তাকে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে আলোচনা করা গীবত হবে না। এটি "জুলুম থেকে বাঁচার" এবং "সতর্ক করার" পর্যায়ে পড়ে।
২. অন্যদের সতর্ক করার ক্ষেত্রে: যদি কেউ তার কাছ থেকে টাকা ধার দেওয়ার আগে আপনার কাছে জানতে চায়, তাহলে আপনি তাকে সতর্ক করতে পারেন। এটি জায়েয।
৩. তবে সতর্কতা: শুধুমাত্র তার সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা করা বা তার ব্যক্তিগত দোষ চর্চা করা গীবত হবে। তাই শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্যই বলবেন, অতিরিক্ত কিছু নয়।
উপসংহার:
১. আপনার ওয়াদা ভঙ্গের গুনাহ হবে না, কারণ আপনি স্পষ্টভাবে কোনো ওয়াদা করেননি। ২. আপনি যদি "হ্যাঁ" বলতেন, তবুও অন্যায় প্রতিরোধের জন্য প্রকাশ করা জায়েয হতো। ৩. পরিবারের কল্যাণে এবং মানুষের ক্ষতি থেকে বাঁচাতে তার সম্পর্কে আলোচনা করা গীবত হবে না। ৪. তবে অপ্রয়োজনীয় সমালোচনা থেকে বিরত থাকুন এবং শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্যই প্রকাশ করুন।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।