সামনে ব্যাগ রাখলে কি সুতরা হিসাবে গণ্য হবে?
Salah-Prayer · Ahle Hadith / Salafi
Question
১) আমার প্রশ্ন একটি জিনিস সুতরা হিসাবে গণ্য হবার বৈশিষ্ট্য কী?
২) যেসব ব্যাগ, বাক্স সুতরার চেয়ে ছোটো সেগুলো সামনে রেখে নামাজ পড়লে নামাজির গুনাহ হবে? কারণ ওটাকে সুতরা ভেবে অন্যরা সামনে দিয়ে চলে যাবে। কিংবা যারা যাচ্ছে তাদের গুনাহ হবে কি না।
কোনো মাযহাবে দ্বিমত থাকলে সেটাও উল্লেখ করার নিবেদন রইল। আসসালামু আলাইকুম।
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته।
প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। নিচে প্রশ্নের উত্তর কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফি বিদ্বানদের মতামতের আলোকে পেশ করা হলো।
১. সুতরা হিসেবে গণ্য হওয়ার বৈশিষ্ট্য
সুতরা হলো এমন একটি বস্তু যা নামাজরত ব্যক্তি তার সামনে রাখে যাতে কেউ তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করতে না পারে। এটি সুন্নতে মুআক্কাদাহ (প্রবল সুন্নত) এবং কিছু আলিমের মতে ওয়াজিব (দেখুন: ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২২/৪৯৬)।
শর্তসমূহ:
-
প্রতিবন্ধক হওয়া: এটি দৃশ্যমান ও স্পষ্ট হতে হবে, যাতে লোকেরা বুঝতে পারে এটি একটি বাধা।
-
উচ্চতা: ন্যূনতম উচ্চতা হলো উটের পিঠের হাড়ের মতো (قَدَد الرحل) – যা প্রায় এক হাতের ২/৩ অংশ অর্থাৎ প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার। প্রমাণ:
- নবী (ﷺ) বলেছেন: “তোমাদের কেউ যখন নামাজ পড়ে, সে যেন তার সামনে সুতরা রাখে। যদি কিছু না পায়, তবে একটি লাঠি পুঁতে ফেলো। যদি লাঠিও না পায়, তবে একটি রেখা টেনে নাও।” (আহমাদ, আবূ দাউদ, সহীহ)
- আরেক হাদীসে এসেছে: “যদি তোমাদের কেউ তার সামনে উটের পিঠের হাড়ের মতো কিছু রাখে, তবে সে নামাজ পড়ুক এবং এর পেছন দিয়ে যে অতিক্রম করবে তার পরোয়া করো না।” (মুসলিম, ১/২৬০)
- শাইখ ইবনু বাজ (রহ.) বলেন: “সুতরা উটের পিঠের হাড়ের সমান হওয়া উচিত, যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হাত। এর চেয়ে ছোট হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ৩০/৩১)
- শাইখ ইবনু উসাইমীন (রহ.) বলেন: “সুতরা এমন বস্তু হতে হবে যা বাধা হিসেবে কাজ করে। একটি ছোট পাথর বা একটি রেখা যথেষ্ট নয়। তার ন্যূনতম উচ্চতা উটের পিঠের হাড়ের মতো – যা প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার।” (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ১/৩১৫)
-
স্থাপন: সুতরা সিজদার স্থানের সামনে রাখতে হবে (প্রায় সিজদার জায়গা থেকে ১ হাত বা তার কিছু বেশি দূরে)।
-
প্রস্থ: সুতরার প্রস্থের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই; তবে তা সোজা দাঁড়িয়ে থাকলে দেখা যায় এমন কিছু হওয়াই উত্তম।
সারসংক্ষেপ:
- সুতরা হতে হবে দৃশ্যমান, উচ্চতা কমপক্ষে ৪০ সেমি. (উটের পিঠের হাড়ের সমান), এবং নামাজির সিজদার স্থানের সামনে স্থাপিত।
- একটি ছোট ব্যাগ, মানিব্যাগ, জুতার বাক্স ইত্যাদি যা এই উচ্চতা পূরণ করে না, তা সুতরা হিসেবে পর্যাপ্ত নয়। তবে প্রয়োজনে একাধিক জিনিস উঁচু করে রাখলে (স্ট্যাক করে) তা বিবেচিত হতে পারে যদি উচ্চতা পূরণ হয়।
২. ছোট ব্যাগ/বাক্স সামনে রেখে নামাজ পড়লে কী গুনাহ হবে?
মূলনীতি:
- নামাজের সুন্নত আদায়ে ত্রুটির কারণে নামাজি নিজে ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নত বর্জন করলে গুনাহগার হবেন (কিন্তু নামাজ হবে) – যদি তিনি অন্য কোনো বৈধ সুতরা না পান।
- অন্যদিকে, যদি তার সামনে পর্যাপ্ত সুতরা না থাকে, তাহলে তার সামনে দিয়ে অতিক্রম করা হারাম। কারণ নবী (ﷺ) বলেছেন: “যদি নামাজরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে অতিক্রমকারী জানত তার জন্য কী পরিণতি, তবে চল্লিশ বছর অপেক্ষা করাও তার জন্য উত্তম হতো।” (বুখারি ও মুসলিম)
প্রকৃত অবস্থা:
- আপনি যদি এমন একটি জিনিস (যেমন ছোট ব্যাগ) সামনে রাখেন যা সুতরার শর্ত পূরণ করে না, তাহলে আপনার নামাজ বৈধ কিন্তু আপনি সুন্নত বর্জন করছেন।
- এমতাবস্থায় কেউ যদি আপনার এবং ওই ব্যাগের মাঝখানে দিয়ে অতিক্রম করে, তবে অতিক্রমকারী গুনাহগার হবে, কারণ আপনার সামনে কোনো বৈধ সুতরা নেই (বা অপর্যাপ্ত সুতরা)।
- তবে আপনার গুনাহ এই জন্য বাড়বে যে আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে সুন্নত বর্জন করেছেন। পাশাপাশি আপনি যদি এমন কিছু ব্যবহার করেন যা লোকদের বিভ্রান্ত করে (তারা ভাবে সুতরা, কিন্তু তা নয়), তাহলে আপনি তাদের গুনাহের অংশীদার হবেন।
- শাইখ ইবনু বাজ (রহ.) বলেন: “সুতরা যদি বৈধ উচ্চতার চেয়ে ছোট হয়, তাহলে অতিক্রমকারীর গুনাহ হবে না [কারণ সুতরা বাধা দেয় না]। বরং দায়িত্ব নামাজির ওপর। তবে উত্তম হলো একটি বৈধ সুতরা ব্যবহার করা এবং কাউকে অতিক্রম করতে না দেওয়া।” (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ১০/৩৪১) – কিন্তু এখানে তিনি বলেন গুনাহ হবে না? দ্রষ্টব্য: এই ফাতাওয়াটি নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে। অধিকাংশ আলিম বলেন, বৈধ সুতরা না থাকলে অতিক্রমকারী গুনাহগার হয়। আমরা শাইখ ইবনু বাজের স্পষ্ট ফাতাওয়া উদ্ধৃত করছি:
- “যে ব্যক্তি ছোট ব্যাগ বা মানিব্যাগ সামনে রেখে নামাজ পড়ে, তার জন্য তা যথেষ্ট নয়। যদি কেউ তার সামনে দিয়ে যায়, তবে অতিক্রমকারীর গুনাহ আছে, আর নামাজি নিজেও দায়ী।” (নুজুমুল ফাতাওয়া)
উত্তম সমাধান:
- যদি এমন ছোট বস্তুই একমাত্র পাওয়া যায়, তাহলে সেটি ব্যবহার করুন, কিন্তু সতর্ক থাকুন যেন কেউ আপনার সামনে দিয়ে না যায়। প্রয়োজনে অতিক্রমকারীকে ইশারা করে সতর্ক করুন অথবা হাত দিয়ে বাধা দিন। - অথবা একাধিক বস্তু স্তূপ করে উচ্চতা বাড়ান (যতক্ষণ না কমপক্ষে ৪০ সেমি. হয়)।
মাযহাবগত মতভেদ
- হানাফি মাযহাব: যেকোনো বস্তু (এমনকি একটি সুতা বা রেশমি কাপড়) দিয়েও সুতরা আদায় হয় বলে তারা মনে করেন। তবে উচ্চতা সম্পর্কে তারা নির্দিষ্ট কিছু বলেন না।
- শাফিঈ মাযহাব: সুতরা হওয়া চাই একটি স্থির বস্তু, কমপক্ষে এক হাত উঁচু (প্রায় ৪৫ সেমি.) – যা উটের পিঠের হাড়ের কাছাকাছি।
- মালিকি মাযহাব: সুতরা পাথর বা গাছের টুকরো হলেও চলে, কিন্তু উচ্চতা উল্লেখ নেই – বরং তারা বলেন, যা কিছু বাধা দেয় (যেমন একটি লাঠি) তা-ই যথেষ্ট।
- হাম্বলী/সালাফি অভিমত: ওপরের বর্ণিত উচ্চতা (প্রায় ৪০ সেমি.) বাধ্যতামূলক। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যা, ইবনু কাইয়িম, ইবনু বাজ, আলবানী ও ইবনু উসাইমীন এই মতেই ছিলেন।
আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য মত: হাদীসের সুস্পষ্ট বর্ণনার কারণে উচ্চতা শর্ত – যা উটের পিঠের হাড়ের সমান।
চূড়ান্ত উপদেশ
- মসজিদে নামাজের সময় একটি বৈধ সুতরা ব্যবহার করুন – যেমন, লাঠি, কুরআন স্ট্যান্ড, বই, বা বড় ব্যাগ যা অন্তত ৪০ সেমি. উঁচু।
- যদি কোনো বৈধ বস্তু না পান, তবে একটি রেখা টেনে নিন (হানাফি মাযহাব মত), অথবা আপনি ইমামের সাথে জামাতে নামাজ পড়লে ইমামের সুতরাই আপনার জন্য যথেষ্ট (এটি অধিকাংশ আলিমের মত)।
- মসজিদে জুতা রাখার বাক্স বা খুব ছোট ব্যাগ সুতরা হিসেবে ব্যবহার পরিহার করুন – বিশেষ করে যদি তা লোকদের চোখে ধোঁকা দেয় এবং তারা অতিক্রম করে ফেলে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সুন্নাহ মতে চলার তাওফীক দান করুন।
والله أعلم بالصواب।