নিজের যোগ্যতায় লিখিত পাস করার পর, অজান্তে অভিভাবকের তদবিরে হওয়া সরকারি চাকরির বিধান কী?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2828
Questioner: Asif Kabir
Question Asked: 18 Jul 2026, 06:16 AM
Reviewed & Published: 18 Jul 2026, 07:23 AM
Views: 37
Tokens: 10,195
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

সম্মানিত মুফতি সাহেবদের কাছে আমার একটি জরুরি বিষয়ে শরয়ী সমাধান আশা করছি।

প্রেক্ষাপট:
আমি বর্তমানে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি। ২০১৮ সালে আমি যখন প্রথম এই প্রতিষ্ঠানে আবেদন করি, তখন আমার সরকারি চাকরির প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু আমার বোন জামাই সেই প্রতিষ্ঠানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হওয়ায় আমার মা ও বোনের জোরাজুরিতে তিনি তদবির করার চেষ্টা করেন। তবে আমি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় সেবার চাকরিটি হয়নি। পরবর্তীতে ২০২০ সালে করোনার পর আমি নিজে থেকে সরকারি চাকরির জন্য প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি এবং বেশ কয়েকটি জায়গায় ভাইভা পর্যন্ত পৌঁছাই।

পরবর্তীতে বয়স শেষ হয়ে আসার মুখে আমি আবার উক্ত প্রতিষ্ঠানে (যেখানে বোন জামাই কর্মরত) নতুন একটি সার্কুলারে আবেদন করি। এবার আমি সম্পূর্ণ নিজের মেধা ও যোগ্যতায় প্রিলিমিনারি এবং লিখিত (Written) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ৩টি পদের বিপরীতে যে ১৮ জনকে ভাইভার জন্য ডাকা হয়েছিল, তাদের মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। এরপর আমি ভাইভাতেও উত্তীর্ণ হই এবং চাকরিতে যোগদান করি।

সমস্যা:
চাকরিতে যোগদানের বেশ কিছুদিন পর আমি আমার মা ও বোনের মাধ্যমে জানতে পারি যে, আমার ভাইভার সময় আমার বোন জামাই আমার অজান্তেই অভ্যন্তরীণভাবে জোর তদবির করেছিলেন। তাদের দাবি, তিনি তদবির না করলে নাকি আমার চাকরিটি হতো না (যদিও আমি পরীক্ষায় নিজের যোগ্যতায় পাস করে ভাইভা পর্যন্ত গিয়েছিলাম)।

আমি গত কয়েক বছর ধরে দ্বীন পালন করার চেষ্টা করছি। বর্তমানে ২০২৬ সালে এসে আমার মনে তীব্র অপরাধবোধ কাজ করছে যে, তদবিরের কারণে আমার এই চাকরি ও প্রতি মাসের বেতন সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যাচ্ছে কি না। বর্তমানে আমার বয়স ৩৫ বছরের বেশি, আমি বিবাহিত এবং আমার সন্তান আছে। এই বয়সে এসে চাকরি পরিবর্তন করা বা নতুন কোনো প্রাইভেট চাকরিতে যাওয়া আমার ও আমার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।

মুফতি সাহেবদের কাছে আমার প্রশ্নসমূহ:

১. যেহেতু আমি নিজের মেধা ও যোগ্যতায় প্রিলি ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করেছি এবং ভাইভা দিয়েছি, কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পেরেছি যে আমার অজান্তেই ভাইভায় তদবির করা হয়েছিল—এই পরিস্থিতিতে আমার এই চাকরিটি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ (হালাল) আছে কি না?

২. আমার অর্জিত প্রতি মাসের বেতন কি সম্পূর্ণ হারাম বলে গণ্য হবে?

৩. এই মুহূর্তে আমার জন্য শরয়ী নির্দেশ কী? আমার কি এই চাকরি ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব, নাকি আমি এই চাকরিতে বহাল থেকে আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার করে এটি চালিয়ে যেতে পারব?

দয়া করে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিস্তারিত জানিয়ে উপকৃত করবেন। জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

উত্তরঃ وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

নিচে আপনার প্রশ্নের উত্তর ক্রমান্বে দেয়া হলো—


১. আপনার চাকরি ও বেতনের শরয়ী হুকুম:

আপনি নিজের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় পাস করেছেন এবং ভাইভাতে ডাক পেয়েছিলেন। এটি আপনার নিজস্ব যোগ্যতার পরিচায়ক। এরপর যদি আপনার অজান্তে আপনার বোন-জামাই তদবির করেন, তবে যেহেতু আপনি সেই তদবিরে সম্পৃক্ত ছিলেন না এবং আপনার অর্জিত চাকরি আপনার নিজের যোগ্যতার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে, তাই আপনার চাকরি ও বেতন হালাল

হানাফী ফকীহগণের মতে: যদি কোনো ব্যক্তি নিজের যোগ্যতায় চাকরি লাভ করে, কিন্তু বাইরের কেউ তার পক্ষে সুপারিশ করে, তাহলে সে চাকরি বৈধ হবে, যদি না সে সুপারিশ নিজেই অন্যায়ভাবে অন্য কারো অধিকার হরণ করে। আপনার ক্ষেত্রে আপনি যোগ্য ছিলেন এবং ভাইভাতেও অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাই তদবিরটি নিছকই অতিরিক্ত সহায়তা হিসেবে গণ্য হবে, যা আপনার চাকরিকে হারাম করে না।

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক: তদবির করা নিজেই ইসলামে অপছন্দনীয় কাজ। বিশেষত, যদি তদবিরের মাধ্যমে অন্যায়ভাবে কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে আপনার বোন-জামাই যদি আপনার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আপনার জন্য অতিরিক্ত সুপারিশ করে থাকেন, তাহলে তা নাজায়েজ হলেও আপনার চাকরি বৈধ। কিন্তু যদি তিনি অন্য কোনো প্রার্থীকে বঞ্চিত করে আপনার জন্য জোর করে চাকরি এনে দেন, তবে সেটি নাজায়েজ হবে। যেহেতু আপনি আগেই পাস করে ভাইভায় ডাক পেয়েছিলেন, এটি আপনার জন্য একটি বৈধ অবস্থান তৈরি করেছিল।

উল্লেখ্য: অজান্তে তদবির হওয়ায় আপনার কোনো পাপ হবে না। তবে তদবিরকারী ব্যক্তির উচিত আল্লাহর কাছে তওবা করা।


২. বেতন সম্পূর্ণ হারাম কিনা:

না, আপনার বেতন সম্পূর্ণ হারাম নয়। বরং এটি হালাল। কারণ আপনি কাজ সম্পাদন করছেন এবং আপনার কাজের বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করছেন। তদবিরটি শুধুই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি অতিরিক্ত সহায়তা ছিল, যা আপনার যোগ্যতাকে অস্বীকার করে না। তাই প্রতি মাসের বেতন আপনার জন্য হালাল থাকবে।

ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:

"যদি কোনো ব্যক্তি নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে কোনো কাজ লাভ করে, কিন্তু কেউ তাকে সাহায্য করে, তাহলে তা বৈধ।"
(রদ্দুল মুহতার, ৪/৩৬৪)


৩. এই মুহূর্তে আপনার করণীয় কী?

আপনার বয়স ৩৫+ এবং আপনার সন্তান আছে, এমন অবস্থায় চাকরি ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব নয়। বরং আপনি নিম্নোক্ত কাজগুলো করুন:

  • তওবা ও ইস্তিগফার করুন: আপনার অজান্তে তদবিরটি হয়েছিল, কিন্তু আপনি জানার পর সেটির জন্য অনুতপ্ত হন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। বলুন: “আস্তাগফিরুল্লাহ” এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন যে ভবিষ্যতে এমন তদবিরের মাধ্যমে কোনো সুবিধা নেবেন না।
  • চাকরি চালিয়ে যান: আপনি নিজের যোগ্যতায় চাকরি লাভ করেছেন, তাই চাকরি চালিয়ে যেতে পারেন। বর্তমানে এটি ছেড়ে দেওয়া আপনার জন্য ও আপনার পরিবারের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হবে, যা ইসলাম সমর্থন করে না।
  • সৎভাবে কাজ করুন: আপনার কাজের প্রতি সতর্ক থাকুন, আমানতদারি ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করুন। এতে আপনার রিজিক আরও বরকতময় হবে।
  • দোয়া করুন: আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন তিনি আপনার কাজ ও রিজিকে বরকত দেন এবং আপনার অজান্তে হওয়া অন্যায়ের জন্য ক্ষমা করেন।

কুরআন ও হাদিসের আলোকে:

আল্লাহ বলেন:
"আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য (প্রতিকূল অবস্থা থেকে) বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করতে পারে না।"
(সুরা তালাক: ২-৩)

অর্থাৎ, আপনি যদি তওবা করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন, তাহলে তিনি আপনার কাজকে সহজ করে দেবেন এবং রিজিকের ব্যবস্থা করবেন। তবে বর্তমান চাকরি ছেড়ে দেওয়া জরুরি নয়, বরং নিষিদ্ধ।


সংক্ষিপ্ত উত্তর:

  • আপনার চাকরি ও বেতন হালাল, কারণ আপনি নিজের যোগ্যতা দিয়ে চাকরি লাভ করেছেন।
  • আপনার অজান্তে হওয়া তদবিরের জন্য আপনি দায়ী নন; তবে তদবিরকারী ব্যক্তির তওবা করা উচিত।
  • চাকরি ছেড়ে দেওয়া ওয়াজিব নয়। বরং তওবা ও ইস্তিগফার করে চাকরি চালিয়ে যেতে পারেন।
  • ভবিষ্যতে নিজে কোনো তদবিরে লিপ্ত হবেন না এবং দ্বীনের পথে অবিচল থাকুন।

আল্লাহ তাআলা আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনার কাজ ও রিজিকে বরকত দিন। আমীন।

> রেফারেন্স:
> - ফাতাওয়া উসমানী (১/২৬৪)
> - ইমদাদুল ফাতাওয়া (৩/২৫০)
> - রদ্দুল মুহতার (৪/৩৬৪-৩৬৫)
> - ফাতাওয়া আলমগীরী (২/৩৫৪)

জাজাকুমুল্লাহু খাইরান।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.