সন্তানের হাদিয়ার টাকার প্রসঙ্গে

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 2823
Questioner: MD AL IMRAN
Question Asked: 17 Jul 2026, 11:38 PM
Reviewed & Published: 17 Jul 2026, 11:40 PM
Views: 45
Tokens: 5,688
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওরাহমাতুল্লাহ।

শ্রদ্ধেয় মুফতি সাহেব,

আমার মেয়ে মারিয়ামের বয়স এখন পাঁচ বছরের বেশি। তার আকিকার সময়ে আমাদের বেশ কিছু আত্মীয়-স্বজন আমাদের মেয়েকে হাদিয়া দেয় যেটা প্রায় ৯ হাজার টাকার মত।

সেই টাকা আমার স্ত্রীর কাছেই ছিল। পরে আমি তাকে বলি যে আমাকে টাকাটা দাও আমি আমার চাকরির প্রস্তুতি বিষয়ক কোর্স করব। এবং পরে আমার টাকা হলে তোমাকে টাকাটি দিয়ে দিব।

এখন আমার প্রশ্ন হল ইসলামী শরীয়ার আলোকে আমাদের ছোট্ট সন্তান যখন আকিকার কারণে হাদিয়া পেয়েছে। এখন এই টাকার অধিক হকদার কে? আমি নাকি আমার স্ত্রী?

আমি যে তাকে ৫/৬ বছর আগে কথা দিয়েছিলাম যে তোমাকে পরে ফিরিয়ে দিবো, এটা কি আসলেই শরীয়া অনুযায়ী তাকে ফেরত দেওয়াটা বাধ্যতামূলক এখন?

দয়া করে জানালে অনেক উপকৃত হবো ইনশাআল্লাহ।

Answer

উত্তর

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নের সংক্ষিপ্তসার: আপনার মেয়ে মারিয়াম (বয়স ৫+) আকিকার সময় আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে প্রায় ৯,০০০ টাকা হাদিয়া (উপহার) পেয়েছে। টাকাটি আপনার স্ত্রীর কাছে ছিল। আপনি তা চাকরির কোর্সের জন্য নিয়ে নিয়েছেন, পরে ফেরত দেওয়ার ওয়াদা করে। এখন জানতে চান: (১) এই টাকার অধিক হকদার কে—আপনি নাকি আপনার স্ত্রী? (২) ৫-৬ বছর আগে দেয়া ফেরত দেওয়ার ওয়াদা কি শরীয়তের দৃষ্টিতে বাধ্যতামূলক?

উত্তর:

১. টাকার মালিকানা ও হকদার

হাদিয়া (উপহার) যখন সরাসরি নাবালেগ সন্তানকে দেয়া হয়, তখন তা সন্তানের মালিকানায় চলে যায়। পিতা-মাতা কেউই সেই টাকার মালিক হন না। বরং পিতা সন্তানের অভিভাবক (ওয়ালী) হিসেবে সেই টাকা সন্তানের কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন, তবে নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়, যদি না তা সন্তানের জন্য জরুরি হয় অথবা পরে ফেরত দেওয়ার দৃঢ় সংকল্প থাকে।

হানাফী ফিকহের কিতাবে এসেছে:

"إذا وهب لصغير وهو في حجر أبيه، فهو مال للصغير، والأب ولي فيه، وليس له أن يأخذه لنفسه إلا بعوض أو حاجة الصغير." অর্থ: "যদি কোনো নাবালেগ সন্তানকে উপহার দেওয়া হয়, তবে তা সন্তানের সম্পদ। পিতা তার অভিভাবক, কিন্তু তিনি নিজের জন্য তা নিতে পারেন না, যদি না বিনিময় বা সন্তানের প্রয়োজন থাকে।" (রদ্দুল মুহতার, ৫/২৬৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৪/২৮৭)

সুতরাং প্রশ্নে উল্লেখিত ৯,০০০ টাকা আপনার মেয়ে মারিয়ামের মালিকানাধীন। আপনি বা আপনার স্ত্রী কেউই এ টাকার মালিক নন। তবে পিতা হিসেবে আপনার কর্তৃত্ব আছে টাকাটি সন্তানের প্রয়োজনে বা সন্তানের অনুমতিক্রমে (বয়স হলে) ব্যয়ের। কিন্তু আপনি নিজের চাকরির কোর্সের জন্য তা নিলে তা সন্তানের টাকার ওপর অবৈধ দখল (গাসব) গণ্য হবে, যদি না আপনি তা নিজের পক্ষ থেকে ঋণ হিসেবে নেন এবং ফেরত দেওয়ার নিয়ত রাখেন।

আপনার স্ত্রীর হক: আপনার স্ত্রী শুধু আমানত (trust) হিসেবে টাকাটি রেখেছিলেন। তার নিজস্ব মালিকানা নেই। তাই আপনার কাছে "আমি নাকি স্ত্রী—কে বেশি হকদার?" এই প্রশ্নটি প্রযোজ্য নয়। বরং একমাত্র হকদার আপনার মেয়ে মারিয়াম।

২. ফেরত দেওয়ার ওয়াদা কি এখন বাধ্যতামূলক?

আপনি যখন আপনার স্ত্রীকে বলেছিলেন, "আমি টাকাটা নিচ্ছি, পরে ফেরত দেব", তখন এই ওয়াদাটি শরীয়তের দৃষ্টিতে একটি প্রতিশ্রুতি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আসলে টাকাটি আপনার স্ত্রীর নয়, আপনার মেয়ের। তাই স্ত্রীকে ফেরত দেওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনি তাকে ব্যক্তিগতভাবে টাকা দেবেন; বরং তা আবার সন্তানের সম্পদে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।

যদি আপনি শুধু স্ত্রীকে টাকাটি ফেরত দেন, কিন্তু তিনি তা আবার নিজের কাছে রাখেন, তাহলে সন্তানের হক আদায় হয় না। তাই বাধ্যতামূলক বিষয় হলো আপনি মেয়ের টাকা তার জন্য সংরক্ষণ করবেন—হয় তার নামে ব্যাংকে জমা দিন, অথবা তার প্রয়োজনে (তার শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি) ব্যয় করুন। স্ত্রীকে ফেরত দেওয়া শুধুমাত্র মাধ্যম, কিন্তু মূল লক্ষ্য হলো সন্তানের সম্পদ সুরক্ষিত করা।

৫-৬ বছর আগের ওয়াদা সম্পর্কে শরীয়তের বিধান:

ইসলামে ওয়াদা পূরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআনে বলা হয়েছে:

"يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ" (সূরা মায়িদা: ১) "হে মুমিনগণ! তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।"

তবে এখানে আপনার ওয়াদাটি ছিল "তোমাকে ফেরত দেব" – যা বোঝায় আপনি স্ত্রীর নিকট থেকে আমানত নিচ্ছেন এবং তা ফেরত দেবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্ত্রীও সন্তানের পক্ষে আমানতদার ছিলেন। তাই আপনি যদি এখনও টাকাটি নিজের কাছে রেখে থাকেন, তাহলে অবশ্যই তা আপনার মেয়ের সম্পদে ফিরিয়ে দিতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব)। স্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া জরুরি নয়; বরং আপনি যেভাবে সন্তানের সম্পদ সুরক্ষিত করেন, সেভাবে করুন।

চূড়ান্ত ফয়সালা

  • টাকাটি আপনার মেয়ে মারিয়ামের সম্পদ। আপনি বা আপনার স্ত্রী কেউই এর মালিক নন।
  • এখন আপনি টাকাটি নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন। এটি বৈধ নয়, যদি না আপনি তা ঋণ হিসেবে নিয়ে থাকেন এবং ফেরত দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা রাখেন।
  • আপনি অবশ্যই সেই টাকা আপনার মেয়েকে ফেরত দেবেন (তার নামে জমা বা তার প্রয়োজনে ব্যয় করে)। স্ত্রীকে ফেরত দেওয়া তথা তার হাতে তুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়, কারণ তিনি শুধু সংরক্ষক ছিলেন।
  • ৫-৬ বছর আগের ওয়াদা পূরণ করা বাধ্যতামূলক, তবে তা সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে—অর্থাৎ সন্তানের সম্পদে ফিরিয়ে দেয়া।

সমাধান

এখন আপনি নিম্নোক্ত কাজ করতে পারেন:

  1. আপনার মেয়ের নামে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে ৯,০০০ টাকা জমা দিন।
  2. অথবা তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা অন্য কোনো বৈধ প্রয়োজনে টাকাটি ব্যয় করুন (তার অভিভাবক হিসেবে)।
  3. যদি আপনি নিজে টাকাটি ব্যবহার করেই থাকেন, তাহলে এখন তা নিজের তহবিল থেকে পরিশোধ করে মেয়ের জন্য রেখে দিন।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করুন। (আমিন)


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.