ক্রোধ ও অসতর্কতার কারণে মুখ দিয়ে কুফরি শব্দ বের হলে ঈমান কী চলে যায়?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 2760
Questioner: Mizanur Rahman
Question Asked: 15 Jul 2026, 11:53 PM
Reviewed & Published: 15 Jul 2026, 11:59 PM
Views: 46
Tokens: 5,222
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বাসায় আজকে আমার সাথে ঝগড়া লেগেছিল ফ্যামিলির কয়েকজনের সাথে। সেই সময়ে আমার মাথা খুব একটা ভালো ছিল না।

ঝগড়ার মুহুর্তে মুখ দিয়ে অসতর্কবশত কুফরি বলে ফেলেছি।

বলে নেওয়া ভালো, আমার বাসাই কারো ভিতরে আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া নাই।

১/ আমি বলেছি, আল্লাহ ধরবো। কিন্তু বলা উচিত ছিল, আল্লাহ ধরবে।
বাবাকে আল্লাহ ধরবে এটা বুঝাতে চেয়েছি। কিন্তু আমি বলে ফেলেছি আল্লাহ ধরবো।

২/ যেহেতু, আমার ফ্যামিলি কয়েকজনের কোনো শুকরিয়া দেখি না। ঝগড়ার এক পর্যায় কয়েকবার বাবাকে বলি, আল্লাহর কোনো শুকরিয়া নাই। কিন্তু বলা উচিত ছিল, আল্লাহর প্রতি আপনার কোনো শুকরিয়া নাই। বাক্য চয়েনে ভুল করেছি।

যাইহোক ঝগড়া শেষ হলে নিজের ভাষায় ভুল ধরে তওবা পড়েছি। অনুতপ্ত হয়েছি।

আমার প্রশ্ন:

ভুলক্রমে ঠিকভাবে বাক্য চয়ন না করার জন্য আমার ঈমান কী চলে গিয়েছে?

আমার বিয়ে কী নবায়ন করতে হবে?

Answer

প্রশ্নের উত্তর

প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার মনে যে দুশ্চিন্তা কাজ করছে, তা স্বাভাবিক। একজন মুমিনের ঈমান নিয়ে সতর্ক থাকা ভালো। তবে আশা করি, আপনার অবস্থা খুবই স্পষ্ট এবং আপনি অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেছেন। নিচে আপনার প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো—

১. "আল্লাহ ধরবো" বলা প্রসঙ্গে

আপনি যখন বলেছেন, "আল্লাহ ধরবো", আপনি মূলত বাবাকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, "আল্লাহ বাবাকে ধরবেন/পাকড়াও করবেন।" আরবি ব্যাকরণ ও ভাষাগত ভুলের কারণে বাক্যটি ভিন্ন অর্থ দিতে পারে, কিন্তু আপনার অন্তরের বিশ্বাস ও নিয়ত এখানে মুখ্য।

হানাফি ফিকহের নীতিমালা অনুযায়ী: কেউ যদি ক্রোধ বা অসাবধানতাবশত কোনো কুফরি শব্দ উচ্চারণ করে, কিন্তু অন্তর তা বিশ্বাস না করে এবং সঙ্গে সঙ্গেই অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে, তাহলে তার ঈমান চলে যায় না। বরং একে 'গুনাহ' হিসেবে গণ্য করা হয়, যা তওবার দ্বারা ক্ষমা হবে।

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ভুলবশত বা রাগের মাথায় বলা কুফরি শব্দ ঈমান নষ্ট করে না, যদি অন্তর থেকে তা বিশ্বাস না করা হয়। (রদ্দুল মুহতার, ৪/২২৪; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪২১)

আপনার বক্তব্য ছিল: "আল্লাহ ধরবো।" এটি কুফরি নয়, বরং একটি ভুল বাক্য গঠন। আপনি আল্লাহকে দায়ী করছেন না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে পাকড়াও কামনা করছেন। এটি ঈমান নষ্টের কারণ নয়।

২. "আল্লাহর কোনো শুকরিয়া নাই" বলা প্রসঙ্গে

আপনি বাবাকে বলেছেন, "আল্লাহর কোনো শুকরিয়া নাই।" অথচ বলা উচিত ছিল, "আল্লাহর প্রতি আপনার কোনো শুকরিয়া নাই।" বাক্যের গঠনগত ভুল হয়েছে, কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের লোকজনের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা নয়।

ফিকহি বিধান: কেউ যদি আল্লাহর প্রতি অকৃতজ্ঞতা (কুফর) বোঝাতে এমন বাক্য বলে, তাহলে সেটি কুফরি হয়। কিন্তু আপনি যেহেতু অন্যকে বুঝাতে গিয়ে ব্যাকরণগত ভুল করেছেন এবং তারপর অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেছেন, এতে আপনার ঈমান চলে যায়নি।

  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/৪২৫) ও ফাতাওয়া উসমানি (১/৪২৩)-তে উল্লেখ আছে, উচ্চারণের ভুল বা বাক্যগঠনের ত্রুটির কারণে কেউ কাফির হয় না, যদি তার অন্তর ও নিয়ত কুফরি না হয়।

৩. আপনার ঈমান কী চলে গিয়েছে?

না, ইনশাআল্লাহ আপনার ঈমান চলে যায়নি। কারণ:

  • আপনি অসাবধানতাবশত রাগের মাথায় কথা বলেছেন।
  • আপনি সঙ্গে সঙ্গেই অনুতপ্ত হয়েছেন এবং তওবা করেছেন।
  • আপনার অন্তর আল্লাহকে অস্বীকার বা তিরস্কার করেনি, বরং আপনি পরিবারের অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।

হাদিসে এসেছে: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, ভুলে যাওয়া এবং যা করতে তারা বাধ্য হয়েছে, তা ক্ষমা করে দিয়েছেন।" (ইবনে মাজাহ, ২০৪৫)

সুতরাং আপনার তওবা যথেষ্ট। নতুন করে ঈমান আনার প্রয়োজন নেই, তবে আপনি নিম্নোক্ত কাজগুলো করতে পারেন:

  • কালেমায়ে শাহাদাত পড়ে নিন (তাজদীদে ঈমান)।
  • দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে তওবা করুন।

৪. আপনার বিয়ে কি নবায়ন করতে হবে?

না, আপনার বিয়ে নবায়ন করার প্রয়োজন নেই। কারণ:

  • ঈমান চলে গেলে বিয়ে ভেঙে যায়। কিন্তু আপনার ঈমান চলে যায়নি।
  • বিয়ের নবায়ন তখনই আবশ্যক হয়, যখন কারো ঈমান চলে যায় এবং পুনরায় ঈমান আনে। আপনার ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ভুলবশত কুফরি শব্দ উচ্চারণ করলে ঈমান না চলে গেলে বিয়ে বহাল থাকে। (আল-হিদায়া, ২/২৫০; ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৪২৩)

উপসংহার ও পরামর্শ

আপনার ইমান চলে যায়নি এবং বিয়ে নবায়নেরও প্রয়োজন নেই। তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রাখুন:

  1. ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করুন: রাগের সময় জিহ্বা সংযত রাখা সবচেয়ে কঠিন। হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি রাগকে গিলে ফেলে, আল্লাহ তার অন্তর ঈমান দিয়ে ভরে দেন।" (আবু দাউদ)
  2. তওবা চালিয়ে যান: আপনি তওবা করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য হবে ইনশাআল্লাহ। তবে নিয়মিত ইস্তিগফার পড়ুন।
  3. পরিবারের সাথে শান্তিপূর্ণ আচরণ: পরিবারের সদস্যদের জন্য দোয়া করুন এবং ধৈর্যের সাথে তাদের বুঝানোর চেষ্টা করুন।

আল্লাহ আপনার তওবা কবুল করুন এবং আপনার ঈমান মজবুত করুন। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.