আল্লাহ আল্লাহ জিকির করা কি জায়েজ? সাহাবারা আল্লাহ আল্লাহ জিকির করতেন কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
আল্লাহ আল্লাহ জিকির: কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আল্লাহ আল্লাহ জিকিরের বৈধতা নিয়ে আপনি দ্বিধাগ্রস্ত। আপনি জানতে চাচ্ছেন:
- নবী (সা.) ও সাহাবারা কি এভাবে জিকির করতেন?
- কোনো আলেম বা পীরের আমল কি দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য?
- 'ওষুধের মতো জিকির' এই যুক্তি কি শরীয়তসম্মত?
- শুধু আত্মশুদ্ধির জন্য এই জিকির করা যাবে কি?
কুরআনের দলিল
আল্লাহ তায়ালা বলেন: "يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا" "হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর।" (সূরা আহযাব: ৪১)
আরও বলেন: "فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ" "তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমি তোমাদের স্মরণ করব।" (সূরা বাকারা: ১৫২)
এই আয়াতগুলোতে জিকিরের নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বা শব্দ উল্লেখ নেই। বরং আল্লাহর স্মরণের প্রতি সাধারণ নির্দেশ রয়েছে। 'আল্লাহ' শব্দটি জিকিরের সর্বোত্তম নাম, কারণ এটি আল্লাহর মহান নাম (ইসমে আযম)।
সাহাবা ও তাবেয়ীদের আমল
সাহাবাদের থেকে 'আল্লাহ আল্লাহ' বলে জিকির করার সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই। তবে তারা বিভিন্নভাবে আল্লাহর স্মরণ করতেন:
-
হযরত আবু বকর (রা.) বলতেন: "اللهم ربنا لا تزغ قلوبنا" (হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরকে সঠিক পথে রাখো)
-
হযরত উমর (রা.) জিকিরের মজলিস করতেন এবং তাতে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহিত করতেন।
-
হযরত আলী (রা.) বলেছেন: "জিকির হলো অন্তরের আলো এবং ঈমানের মূল।"
তবে সুনির্দিষ্টভাবে 'আল্লাহ আল্লাহ' শব্দের জিকিরের প্রমাণ সাহাবাদের থেকে সরাসরি না থাকলেও, তাবেয়ী ও পরবর্তী বুজুর্গদের আমল এই পদ্ধতির স্বীকৃতি দেয়।
হাদীসের দলিল
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "أفضل الذكر لا إله إلا الله" "সর্বোত্তম জিকির হলো 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'।" (তিরমিযী: ৩৩৭৬)
তবে তিনি আরও বলেছেন: "لا يزال لسانك رطبا من ذكر الله" "তোমার জিহ্বা সর্বদা আল্লাহর জিকিরে রসনাপূর্ণ থাকুক।" (তিরমিযী: ৩৩৭৫)
এখানে 'আল্লাহ' শব্দটি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' এর অংশ এবং এটি সর্বোত্তম জিকিরের অন্তর্ভুক্ত।
ফকীহ ও সুফীয়ানার দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) এর মতামত
ইমাম আবু হানীফা জিকিরের ক্ষেত্রে প্রশস্ততা দিয়েছেন। তিনি মনে করতেন যে, আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে জিকির করা জায়েয।
ইমাম শাফেয়ী (রহ.) এর মতামত
তিনি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কে সর্বোত্তম জিকির বলেছেন এবং আল্লাহর নামের জিকিরকে উৎসাহিত করেছেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এর মতামত
তিনি জোরে জিকির করার পক্ষে মত দিয়েছেন এবং 'আল্লাহ' শব্দের জিকিরকে বৈধ মনে করতেন।
ইমাম মালিক (রহ.) এর মতামত
তিনি মসজিদে জোরে জিকির করা অপছন্দ করতেন, তবে নীরবে জিকিরের অনুমতি দিয়েছেন।
'ওষুধের মতো জিকির' এই যুক্তির বিশ্লেষণ
আপনার যুক্তি সঠিক যে, যুক্তি শরীয়তের মাপকাঠি নয়। তবে ইসলামে কিছু নীতি রয়েছে:
-
ইবাহতের মূলনীতি: যে বিষয়ে কুরআন-হাদীসে নিষেধাজ্ঞা নেই, তা মূলত জায়েয।
-
ওয়াসিলার নীতি: যদি কোনো মাধ্যম বৈধ কাজে সহায়তা করে, তবে তা নাজায়েয নয়।
-
ইজতিহাদের নীতি: নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি না থাকলে, বুজুর্গরা তাদের অভিজ্ঞতা ও কুরআন-হাদীসের আলোকে পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারেন।
তবে 'ওষুধের তুলনা' সম্পূর্ণ যৌক্তিক নয়। কারণ:
- ডাক্তারের ওষুধ শারীরিক রোগের জন্য, আর পীরের দেয়া জিকির আধ্যাত্মিক রোগের জন্য
- উভয়ই আল্লাহর দেওয়া নিয়মের অধীন
- কিন্তু পার্থক্য হলো, ওষুধের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে, জিকিরের প্রমাণ কুরআন-হাদীস থেকে নিতে হবে
আপনার দ্বিধার সমাধান
আপনি 'আল্লাহ আল্লাহ' জিকির করে উপকৃত হয়েছেন, কিন্তু শয়তানের ধোঁকার ভয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। আপনার এই চিন্তা প্রশংসনীয়, কারণ আপনি দ্বীনকে সঠিকভাবে জানতে চান।
উত্তর: 'আল্লাহ আল্লাহ' জিকির করা জায়েয। কারণ:
- কুরআনের সাধারণ নির্দেশ: আল্লাহকে অধিক স্মরণ করা
- হাদীসের সাধারণ নির্দেশ: জিহ্বাকে জিকিরে রসনাপূর্ণ রাখা
- ইমামদের ফতোয়া: অধিকাংশ ইমাম এটিকে জায়েয বলেছেন
- আলেমদের ইজমা: তাসাউফের পীরগণ এটিকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন
আপনার জন্য পরামর্শ
-
সুন্নত মনে না করে করুন: আপনি যদি এটিকে ওয়াজিব বা সুন্নত না মনে করে শুধু আত্মশুদ্ধির জন্য করেন, তাহলে এটি জায়েয।
-
নিয়ত নির্ধারণ করুন: আপনি যদি নিয়ত করেন, "হে আল্লাহ, আমি আপনার স্মরণ করছি, আমার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করুন", তাহলে এটি নফল জিকির হিসেবে গণ্য হবে।
-
সন্দেহ দূর করুন: শয়তানের ধোঁকা সম্পর্কে আপনার চিন্তা সঠিক, তবে যদি কোনো কাজ কুরআন-হাদীসের সাধারণ নীতির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তাহলে সেটি নাজায়েয বলা ঠিক নয়।
-
সহীহ জ্ঞান অর্জন করুন: ইসলামকে জানার মাধ্যম হলো কুরআন, হাদীস, ইজমা ও কিয়াস। এর বাইরে কোনো কিছুই দলিল নয়।
রেফারেন্স সমূহ
- কুরআন: সূরা আহযাব: ৪১, সূরা বাকারা: ১৫২
- হাদীস: তিরমিযী: ৩৩৭৬, ৩৩৭৫; মুসলিম: ২৬৭৩
- ফিকহ: আল-হিদায়া (জিকিরের অধ্যায়), রদ্দুল মুহতার (জিকিরের বিধান)
- ফতোয়া: ফতোয়া উসমানী (জিকিরের বৈধতা), ইমদাদুল ফতোয়া (তাসাউফ ও জিকির)
- তাসাউফ: ইমাম গাযযালীর ইহইয়া উলুমিদ্দীন, শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভীর হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত
'আল্লাহ আল্লাহ' জিকির করা জায়েয এবং এটি আত্মশুদ্ধির একটি বৈধ মাধ্যম। আপনি যদি এটি সুন্নতের নিয়তে না করে শুধু আল্লাহর স্মরণ ও আত্মশুদ্ধির জন্য করেন, তাহলে কোনো দোষ নেই। তবে আপনার সন্দেহ দূর করতে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের সাথে সরাসরি আলোচনা করতে পারেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।