ব্যবসায়িক ভিডিওতে গান ব্যবহার করা যাবে কি? ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ছাড়া ভিডিও প্রমোশন বিধান।

Halal and Haram · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 2185
Questioner: Md. Monjurul Hoque Chowdhury
Question Asked: 01 Jul 2026, 01:32 PM
Reviewed & Published: 01 Jul 2026, 01:46 PM
Views: 72
Tokens: 4,659
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

ব্যবসায়িক প্রমোশানে ভিডিও'র ব্যাকগ্রাউন্ডে মিউজিক না দিয়ে Acapella সাউন্ড (এমনভাবে গান গাওয়া/সাউন্ড তৈরী করা, যেখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। অর্থাৎ, শুধু মানুষের কণ্ঠ দিয়েই পুরো গানটি/সাউন্ডটি পরিবেশন করা হয়) ব্যবহার করা যাবে কি?

অনেকসময় অনেক আকাপেলা শুনতে মিউজিকের কাছাকাছি শোনায়। আবার কিছু আছে, যেগুলো মিউজিকের মত হয় না, আলাদা হয়, বোঝা যায় যে এখানে কোন বাদ্য ব্যবহৃত হয়নি।

Answer

উত্তর

আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়ার আগে ইসলামে গান-বাজনা ও নাশিদ (বাদ্যযন্ত্রবিহীন কণ্ঠসংগীত) সম্পর্কে কয়েকটি মূলনীতি বোঝা জরুরি।

১. গান-বাজনার সাধারণ বিধান

সালাফি/আহলে হাদীস ফিকহ অনুযায়ী, বাদ্যযন্ত্রসহ গান-বাজনা হারাম। এর পক্ষে কুরআন ও হাদিসের স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে:

  • সূরা লুকমান (৩১:৬)-এ আল্লাহ বলেন: "আর কিছু মানুষ আছে যারা অজ্ঞতাবশত এমন ‘লাহওয়াল হাদীস’ (অর্থহীন কথা) ক্রয় করে, যাতে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে..." অধিকাংশ তাফসিরকারক (ইবনে আব্বাস, মুজাহিদ, হাসান বসরী রহ.) এখানে ‘লাহওয়াল হাদীস’ বলে গান-বাজনাকে ব্যাখ্যা করেছেন।

  • সহীহ বুখারী (৫৫৯০)-এ রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "আমার উম্মতের কিছু লোক এমন আসবে, যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে..." (ইমাম বুখারী এ হাদিসটি ‘বাদ্যযন্ত্র’ শিরোনামে আনেন।)

  • শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “বাদ্যযন্ত্র হারাম হওয়ার ব্যাপারে চার ইমামের (আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ, আহমাদ) মধ্যে কোনো মতানৈক্য নেই।” (মাজমু ফাতাওয়া, ১১/৫৭৬)

২. আকাপেলা (বাদ্যযন্ত্রবিহীন কণ্ঠসংগীত) এর বিধান

সালাফি/আহলে হাদীস ফিকহ অনুযায়ী, আকাপেলা হলো শুধুমাত্র মানুষের কণ্ঠ দিয়ে তৈরি সাউন্ড, যেখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র নেই। এটি নাশিদ বা ইসলামী কণ্ঠসংগীতের একটি রূপ। এ সম্পর্কে সালাফি উলামাদের মতামত:

শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন: “গানের কথাগুলো যদি ভালো ও উপকারী হয় এবং তাতে কোনো বাদ্যযন্ত্র না থাকে, তবে তা জায়েয—যদিও এতে শিথিলতা ও ফিতনার আশঙ্কা থাকায় সতর্কতা অবলম্বন করাই উত্তম।” (মাজমু ফাতাওয়া, ১০/৪২৬)

শাইখ আল-আলবানী (রহ.) বলেন: “নাশিদ জায়েয, যদি তা বাদ্যযন্ত্রবিহীন হয় এবং গানের কথাগুলো ইসলামী আদবের পরিপন্থী না হয়। তবে তা যদি গানের মত গাওয়া হয় (যা ফিতনা সৃষ্টি করে), তাহলে তা জায়েয নয়।” (সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূর, টেপ নং ৭৩)

শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: “কালাম (কথা) যদি ভালো হয় এবং তা কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়া হয়, তবে তা জায়েয। কিন্তু যদি তাতে ফিতনার আশঙ্কা থাকে বা তা অন্যায় কাজের দিকে উদ্বুদ্ধ করে, তবে তা হারাম।” (লিকাউল বাব আল-মাফতুহ, ৫২/২১)

শাইখ সালেহ আল-ফাওযান (হাফি.) বলেন: “নাশিদ শুধুমাত্র তখনই জায়েয হবে যদি তা ইসলামী আদব মেনে চলে, ফিতনার কারণ না হয় এবং বাদ্যযন্ত্র মুক্ত হয়। তবে আজকাল বেশিরভাগ নাশিদ গানের সুরে তৈরী হয়, যা ফিতনা সৃষ্টি করে। তাই সতর্কতা প্রয়োজন।” (আল-ইজাবাতুল মুহিম্মাহ, পৃষ্ঠা ২৪২)

৩. ব্যবসায়িক প্রমোশনে আকাপেলা ব্যবহার

এখানে কয়েকটি শর্ত মাথায় রাখতে হবে:

শর্তসমূহ:

  1. কণ্ঠের সুর ও ধরণ: আকাপেলা যদি এমন সুরে গাওয়া হয় যা সাধারণ গানের মতো (যেমন রোমান্টিক বা উত্তেজনাপূর্ণ), তাহলে তা এড়িয়ে চলা উচিত। অনেক সময় আকাপেলা শুনতে বাদ্যযন্ত্রের কাছাকাছি মনে হয়—এমনটি হারামের সাদৃশ্য হওয়ার কারণে না করা উত্তম।
  2. বিষয়বস্তু: গানের কথাগুলো (যদি থাকে) অবশ্যই ইসলামী আদব, নীতিবোধ ও সততার পরিপন্থী হতে পারবে না। ব্যবসায়িক প্রমোশনে সাধারণত স্লোগান বা ব্র্যান্ডের নাম থাকে—এটি জায়েয হতে পারে যদি কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকে।
  3. ফিতনার আশঙ্কা: শাইখ ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন: “কোনো বস্তু যদি ফিতনার কারণ হয় বা তা সাধারণ মিউজিকের মতো লাগে, তবে তা পরিহার করাই ওয়াজিব।” যদি আপনার আকাপেলা শুনে মানুষ মিউজিকের অনুরূপ অনুভব করে, তাহলে তা এড়ানোই নিরাপদ।
  4. উদ্দেশ্য: ব্যবসায়িক প্রমোশনে আকাপেলা ব্যবহারের উদ্দেশ্য যদি পণ্যের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করা হয় এবং তা মিউজিকের বিকল্প হিসেবে হয়, তাহলে এতে সতর্কতা প্রয়োজন। বরং বিকল্প হিসেবে আপনি হালাল পদ্ধতি যেমন: প্রাকৃতিক শব্দ (নেচার সাউন্ড), কুরআনের আয়াত (তিলাওয়াত) বা নির্দোষ ভয়েসওভার ব্যবহার করতে পারেন।

৪. চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

সালাফি/আহলে হাদীস ফিকহ অনুযায়ী, - আকাপেলা (বাদ্যযন্ত্রবিহীন শুদ্ধ কণ্ঠ) নীতিগতভাবে জায়েয হতে পারে, যদি তা ফিতনার কারণ না হয়, সাধারণ গানের সুরে না হয় এবং এর বিষয়বস্তু ইসলামী নৈতিকতাসম্মত হয়।

  • তবে ব্যবসায়িক প্রমোশনে এটি ব্যবহার করার সময় সতর্কতা জরুরি। অনেক সময় আকাপেলা বাদ্যযন্ত্রের কাছাকাছি শোনায় এবং মানুষকে মিউজিকের প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তাই আদর্শ হলো এড়িয়ে চলা এবং বিকল্প হালাল মাধ্যম ব্যবহার করা।
  • শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: "যদি কোনো বস্তু সন্দেহজনক হয় এবং আপনি নিশ্চিত না হন যে এটি হালাল, তাহলে তা পরিত্যাগ করাই আপনার দীনের জন্য উত্তম।" (শারহুল আরবাইন, হাদিস ১১)

পরামর্শ:

আপনার ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ডে আকাপেলার পরিবর্তে ব্যবহার করতে পারেন:

  • ভয়েসওভার – শুধু মানুষের কণ্ঠে তথ্য উপস্থাপন।
  • কুরআনের আয়াতের তিলাওয়াত (মহান আল্লাহর বাণী, যা ব্যবসায়িক প্রমোশনে বারাকাহ আনে)।
  • প্রাকৃতিক শব্দ (পানি, পাখি, বাতাস ইত্যাদি) যা মিউজিকের বিকল্প হতে পারে।
  • ইসলামী নাশিদ (যা সুপরিচিত এবং ফিতনামুক্ত) — তবে তা শুধুমাত্র ঐসব নাশিদ যা সালাফি উলামা দ্বারা অনুমোদিত।

সংক্ষেপে: সালাফি/আহলে হাদীস ফিকহ অনুযায়ী, আকাপেলা জায়েয হতে পারে যদি তা সাধারণ গানের মতো ফিতনা সৃষ্টি না করে এবং বিষয়বস্তু ভালো হয়। তবে ব্যবসায়িক প্রমোশনে এটি এড়িয়ে হালাল বিকল্প (ভয়েসওভার, নেচার সাউন্ড, তিলাওয়াত) ব্যবহার করাই অধিক নিরাপদ।

আল্লাহু আলাম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.