মিরাস কিভাবে বন্টন করতে হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
হুজুর আমার দাদা ইন্তেকাল করেছেন দু বছরের বেশি। তার মৃত্যুর সময় রেখে যাওয়া জমি ৬৫ শতক। এর বাহিরে ২ শতক জমি রয়েছে যা বছরের বেশির ভাগ সময় পানি জমি থাকে কয়েকমাস শুকনা থাকে তখন কৃষির কোনো কাজ থাকলে করে। আরো ৭ শতক জমি রয়েছে যা নদীর মধ্যে ডুবে গেছে। এছাড়া বাড়ির জায়গা আলাদা করে রয়েছে ১৩ শতক ও তার বাহিরে ডোবা ৮ শতক।আমার দাদার ২ ছেলে ২ মেয়ে সকলের ছেলে মেয়ে রয়েছে। দাদী জীবিত আছেন।এখন এই সম্পত্তি কে কতটুকু পাবে অনুগ্রহ করে জানাবেন। আর এখানকার সমস্যা যুক্ত জমি ২ শতক ও ৭ শতক আর ডোবা ৮ শতক এগুলো হিসাবে ধরতে হবে কিনা জানাবেন।
২. আমার দাদা মৃত্যুর কয়েকবছর আগে ওই ৬৫ শতকের একটি অংশ ৮ শতক আমার ছোটো ফুফুকে মৌখিকভাবে দিবে বলেছিল।এখন ওই জমি কিছুটা দামি হওয়ার কারণে চাচাও দাবি করছে।বাবাও মনে মনে চায়। এখন দাদার মৌখিক কথাকে কি ওসিয়ত ধরে সেটাকে কি ফুফুকে দিতে হবে?নাকি এখানে সবাইকে অংশীদার করতে হবে?
৩. জমি ভাগ করার পরে খারিজ করার টাকা কি শুধু বাবা চাচার দিতে হবে নাকি যার ভাগেরটা সেই টাকা দিবে?
৪. উপরে উল্লিখিত জমি ছাড়া দাদার মৃত্যুর কয়েকবছর আগে তিনি আমার বাবা ও চাচাকে ১৩ শতক জমি দিয়েছিলেন, যা বাবা চাচা বিক্রি করে নিজেদের প্রয়োজনে খরচ করেছেন।এই জমিও কি এখন হিসাবে ধরতে হবে? হিসাবে ধরলে ভাগ কিরকম হবে?
Answer
উত্তর
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على أشرف الأنبياء والمرسلين
প্রশ্ন ১: সম্পত্তির বণ্টন ও সমস্যাজনিত জমির হিসাব
মৃত ব্যক্তি (দাদা) রেখে গেছেন:
- ৬৫ শতক জমি (চাষযোগ্য)
- ২ শতক জমি (বছরের অধিকাংশ সময় পানি জমে থাকে, কখনো শুকালে চাষ হয়)
- ৭ শতক জমি (নদীতে ডুবে গেছে)
- ১৩ শতক বাড়ির জায়গা
- ৮ শতক ডোবা
ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির মালিকানাধীন সব সম্পদ (যে কোনো অবস্থায় থাকুক না কেন) তার রেখে যাওয়া মীরাসের অন্তর্ভুক্ত হবে। তাই উক্ত ২, ৭, ৮ ও ১৩ শতক জমি সবই মীরাসের তহবিলে গণ্য হবে। নদীতে ডুবে যাওয়া বা পানি জমে থাকা জমিও মালিকানাধীন, তাই তা হিসাবের বাইরে নয়। তবে ব্যবহার অনুপযোগী হলেও মূল্যায়ন করে বণ্টন করতে হবে।
ওয়ারিশ ও প্রাপ্ত অংশ
মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ:
- স্ত্রী (দাদী) – জীবিত
- ২ ছেলে (বাবা ও চাচা)
- ২ মেয়ে (ফুফু)
মৃতের সন্তান থাকায় স্ত্রী পাবেন ৮ অংশের ১ অংশ (সূরা নিসা ৪:১২)
অবশিষ্ট ৮অংশের ৭ অংশ সন্তানদের মাঝে বণ্টন হবে পুত্ররা প্রত্যেকে কন্যার দ্বিগুণ পাবেন (সূরা নিসা ৪:১১)
গণনা:
- মোট অংশ: ছেলে ২ জন × ২ = ৪ অংশ, মেয়ে ২ জন × ১ = ২ অংশ, মোট = ৬ অংশ
- স্ত্রীর অংশ বাদে অবশিষ্ট = ৮অংশের ৭অংশ।
- প্রতিটি অংশের মান = (৭/৮) ÷ ৬ = ৭/৪৮
প্রত্যেকের প্রাপ্ত অংশ (মোট সম্পত্তির অনুপাতে):
- স্ত্রী (দাদী) = ১/৮ = ৬/৪৮
- প্রত্যেক ছেলে = ২ অংশ = ১৪/৪৮ করে (অর্থাৎ ৭/২৪)
- প্রত্যেক মেয়ে = ১ অংশ = ৭/৪৮ করে
বাস্তব বণ্টনের নিয়ম:
সব জমি (উপযোগিতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করে) একত্রে মিলিয়ে উপরোক্ত অনুপাতে ভাগ করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট জমি আলাদা করে দেওয়া যাবে না, বরং সম্মিলিতভাবে বণ্টন করতে হবে।
উল্লেখ্য: মৃত ব্যক্তির ঋণ থাকলে প্রথমে তা পরিশোধ করতে হবে, তারপর ওসিয়ত (যদি থাকে) ১/৩ সীমার মধ্যে পালনীয়। এরপর বাকি সম্পদ উপরোক্ত ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টিত হবে।
(সূত্র: কোরআন ৪:১১-১২, রাদ্দুল মুহতার ৬/৭৭০, ফাতাওয়া আলমগীরী ৬/৪৪৭)
প্রশ্ন ২: ফুফুকে মৌখিকভাবে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি
মৃত্যুর কয়েকবছর আগে দাদা মৌখিকভাবে ৬৫ শতকের মধ্যে ৮ শতক ছোট ফুফুকে দিতে বলেছিলেন—এটি ওসিয়াত (উইল) হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু হানাফি ফিকহ অনুসারে:
- ওয়ারিশের জন্য ওসিয়াত বৈধ নয়, যদি না অন্য ওয়ারিশরা মৃত্যুর পর তা অনুমোদন করে। (সূত্র: সহিহ বুখারি, কিতাবুল ওসায়া; রাদ্দুল মুহতার ৬/৬৮৫)
- যেহেতু ফুফু একজন ওয়ারিশ (মেয়ে), এবং অন্যান্য ওয়ারিশ (চাচা, বাবা) এতে সম্মত নন, তাই এই ওসিয়াত বাতিল।
- মৌখিক প্রতিশ্রুতি ওসিয়াত হিসেবেও গ্রহণযোগ্য, কিন্তু তা ১/৩ সীমার মধ্যেও বৈধ নয় যেহেতু তা ওয়ারিশের জন্য। আর যদি দাদা জীবদ্দশায় এটি হিবা (উপহার) হিসেবে দিয়ে থাকতেন (দখলও দিয়ে দিতেন), তাহলে ভিন্ন কথা হতো। কিন্তু এখানে শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি, দখল হয়নি।
নির্ধারিত ফায়সালা:
- ৮ শতক জমি মীরাসের অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং উপরোক্ত অনুপাতে সব ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টিত হবে।
- ফুফুকে আলাদাভাবে দেওয়া জরুরি নয়।
(সূত্র: ফাতাওয়া উসমানী ২/২৯৭, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/১৮২)
প্রশ্ন ৩: খারিজ (নামজারি/রেজিস্ট্রেশন) খরচ কে দেবে?
জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খারিজ করতে যে খরচ হয় (সরকারি ফি, এজেন্ট কমিশন ইত্যাদি), তা যার ভাগে যতটুকু জমি পড়বে, তিনি নিজেই নিজের অংশের জন্য দেবেন। এটি একটি সাধারণ নীতি। হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে, ভাগ-বাটোয়ারার পর প্রত্যেকেই নিজ নিজ অংশের অধিকারী; সুতরাং তার দলিলাদির খরচ তাকেই বহন করতে হবে।
তবে যদি পারস্পরিক সম্মতিতে সবাই মিলে খরচ করে থাকে, তাহলে তা সম্ভব। কিন্তু বাধ্যবাধকতা নেই।
(সূত্র: আল-হিদায়া ৩/২২৬; ফাতাওয়া আলমগীরী ৫/৩৫৭)
প্রশ্ন ৪: পূর্বে দেওয়া ১৩ শতক জমির হিসাব
দাদা তার মৃত্যুর কয়েকবছর আগে বাবা ও চাচাকে ১৩ শতক জমি দিয়েছিলেন (উপহার/হিবা হিসেবে) এবং তারা তা বিক্রি করে নিজেদের প্রয়োজনে খরচ করেছেন।
হানাফি ফিকহ অনুসারে:
- জীবদ্দশায় যদি কেউ তার সম্পদ থেকে কোনো ওয়ারিশকে পূর্ণ হিবা (দান) করে এবং তা দখলও দিয়ে দেয়, তবে তা মীরাসের অন্তর্ভুক্ত হবে না। তা মৃত ব্যক্তির মালিকানা থেকে বেরিয়ে গেছে।
- এখানে যেহেতু দাদা জীবিত অবস্থায়ই জমি দিয়ে দিয়েছিলেন এবং তারা তা বিক্রিও করে ফেলেছেন, তাই এটি আর মীরাসের অংশ নয়। এ জমি পুনরায় মীরাসের তহবিলে আনতে হবে না।
তবে যদি প্রমাণিত হয় যে দাদা এটি মীরাস হিসেবেই দিয়েছিলেন (অর্থাৎ মৃত্যুর পর পাওয়ার জন্য) অথবা এটি ওসিয়াত ছিল, তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু প্রশ্নের বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, এটি একটি সম্পূর্ণ দান ছিল।
সুতরাং বর্তমান মীরাসের হিসাবে এই ১৩ শতক জমি গণ্য হবে না।
(সূত্র: রাদ্দুল মুহতার ৫/৬৬০, ফাতাওয়া উসমানী ২/২৪২)
সংক্ষিপ্ত ফায়সালা
১. মোট মীরাসের সম্পত্তি: ৬৫+২+৭+১৩+৮ = ৯৫ শতক (সব জমি ও বাড়ি-ডোবা সহ)।
২. বণ্টন: দাদী ১/৮, বাকি ৭/৮ ছেলে-মেয়ের মধ্যে ২:১ অনুপাতে।
৩. ফুফুর জন্য মৌখিক প্রতিশ্রুতি (ওসিয়াত) বাতিল, জমি সবাই পাবে।
৪. খারিজ খরচ প্রত্যেকেই নিজ নিজ অংশের জন্য দেবেন।
৫. পূর্বে দেওয়া ১৩ শতক জমি মীরাসের বাইরে।
প্রয়োজনীয় পরামর্শ: বণ্টনের আগে মৃতের কোনো ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করুন। তারপর সব ওয়ারিশের উপস্থিতিতে পারস্পরিক সম্মতিতে জমি মূল্যায়ন করে ভাগ করে নিন। কোনো ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে একজন আলেম বা মোক্তার-এর মাধ্যমে ভাগ-বাটোয়ারা করাই উত্তম।
والله أعلم بالصواب