পাত্রপক্ষ দেখতে এলে পাত্রীর পর্দা ও পোশাকের শরয়ী বিধান এবং বিবাহিতা নারীর সাবেক স্বামী থাকা অবস্থায় ভিডিও কলের মাধ্যমে ‘তিন কবুল’ বলার মাসআলা
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১/ পাত্র পক্ষ যখন দেখতে আসবে, তখন পাত্রী যদি শাড়ি পরে মহিলা সদস্যদের সামনে যায় কিন্তু পাত্রের সামনে যাওয়ার সময় বোরকা হিজাব পড়ে শুধু মুখ, হাতের কবজি আর পা খোলা রাখে তাহলে হবে না??
অর্থাৎ শরীয়তে যেটুকু অনুমতি সেটুকুই দেখালো তবে বোরকা পরিধান করে। এতে কি কোনো সমস্যা হবে?
মানে বিষয়টা কি এমন বোরকা না পড়ে অন্য কিছু পরলে পাত্রের আগ্রহ হবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে গলা বা চুল বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাহলেও কি কোনো ক্ষতি নেই এই ক্ষেত্রে??
২/ ভয়াবহ এক পাপের ব্যাপারে কিছুদিন আগে অবগত হই। একজন বোন ফোন করে বিস্তারিত সবটা বলল এবং সমাধান চাইলো।
বোনটির বিয়ে হয়েছে প্রায় ৫ বছর হবে। একটি সন্তানও রয়েছে ৩ বছরের। শুরুর দিকে সবটা ভালো থাকলেও যত দিন যেতে থাকলো সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়তে লাগলো। তার হাজবেন্ড অকথ্য ভাষায় গালাগালি, মেরে বিছানায় ফেলে রাখার মতো জুলুম চালিয়ে যেতে থাকলো। আর ভরনপোষণও দিত না তেমন। বোনটি সেলাই কাজ করে যা পেত তা দিয়েই নিজে কোনোরকম চলতো। কথায় কথায় ছেড়ে দিবে এমন হুমকি দিত। তবে হ্যা সন্তানের ব্যাপারে যত্নশীল ছিল তার হাজবেন্ড। এই অবর্ণনীয় যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে প্রায় মাস পাচেক আগে এক অঘটন ঘটিয়ে বসে বোনটি।
সংসার জীবনের এই তীব্র কষ্ট থেকে বাচতে সে এক ফিতনায় অজান্তেই পরে যায়। ফোনে এক ছেলের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠে। সেই সম্পর্কের গভীরতা এত দূর পৌছায় যে, সেই ছেলের চাপাচাপিতে তারা ফোনে দুইজন দুই প্রান্ত থেকে ভিডিও কলে দুইজন সাক্ষী রেখে ৩ কবুল বলে। কোনো বিয়ে পড়ানো হইনি শুধু কবুলই নাকি বলে। এখন এতদিন পরে সে তার ভুল বুঝতে পেরে মাসয়ালা জানতে চেয়েছে।
এই বিয়ে কি শুদ্ধ হয়েছে??
হওয়ার কথা নয়, হোক বা না হোক তবে তার বর্তমান স্বামীর সাথে কি তার বৈবাহিক সম্পর্ক এখনো আছে??
সে এই সংসারটাও করতে চাচ্ছে না কারণ দিন দিন শারীরিক আঘাতের পরিমাণ বাড়ছেই।
আবার এমন না সে এই সংসার ভেঙে ওই ছেলের কাছে যাবে। সেই ছেলের সাথে কখনো সরাসরি দেখা হয়নি,কারণ সেই ছেলে বিদেশ থাকে।
এখন এই মুহূর্তে এই বোনের করণীয় কি??
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথম প্রশ্ন: পাত্রপক্ষ দেখতে এলে পাত্রীর পর্দা ও পোশাক
উত্তর:
শরীয়তে বিবাহের প্রস্তাবের জন্য পাত্রপক্ষ যখন পাত্রী দেখতে আসে, তখন পাত্রীর জন্য কেবলমাত্র মুখমণ্ডল ও হাতের কবজি পর্যন্ত (দুই হাতের তালু) দেখা জায়েয। এটি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদীস ও হানাফী ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহে উল্লেখ আছে।
-
হাদীস:
- عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: "إذا خطب أحدكم امرأة، فإن استطاع أن ينظر منها إلى ما يدعوه إلى نكاحها، فليفعل". (سنن أبي داود، كتاب النكاح، باب النظر إلى من يريد تزويجها)
- অর্থ: “যখন তোমাদের কেউ কোনো নারীর বিবাহের প্রস্তাব দেয়, যদি সে এমন কিছু দেখতে সক্ষম হয় যা তাকে বিবাহে উদ্বুদ্ধ করে, তবে সে যেন তা করে।”
-
হানাফী ফিকহের নির্দেশনা:
- ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, পাত্রের জন্য পাত্রীর চেহারা ও হাতের কবজি পর্যন্ত দেখা জায়েয। (আল-হিদায়া, کتاب النکاح: باب النظر)
- তবে পা (পায়ের পাতা) দেখা জায়েয নয়। কেননা পা অ-মাহরামের সামনে সতর (আওরাহ)-এর অন্তর্ভুক্ত। ইবনে আবেদীন (রহ.) বলেন:
- "المرأة الحرة كلها عورة إلا وجهها وكفيها" – “স্বাধীন নারীর সমস্ত শরীর সতর, তবে মুখমণ্ডল ও দুই হাতের তালু ব্যতীত।” (রদ্দুল মুহতার, ১:৪০৬)
- আর পায়ের পাতা সম্পর্কে ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, তা সতর। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ৫:৩৫৪)
সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থা বিশ্লেষণ:
- পাত্রী যদি বোরকা/হিজাব পরে পাত্রের সামনে যান, কিন্তু শুধু মুখ ও হাতের কবজি খোলা রাখেন এবং পা ঢেকে রাখেন, তাহলে তা সম্পূর্ণ জায়েয এবং শরীয়তসম্মত।
- তবে যদি পা খোলা থাকে (জুতা/মোজা ছাড়া), তাহলে তা জায়েয নয়; কারণ পা অ-মাহরামের সামনে দেখা দেওয়া হারাম।
- আর যদি বোরকার পরিবর্তে এমন পোশাক পরেন যা আকর্ষণীয় বটে, কিন্তু গলা বা চুল বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তা জায়েয নয়। কেননা সতর আবরণ করা ফরয, আর পাত্রের আগ্রহের জন্য হারাম পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েয নয়।
উপসংহার:
- পাত্রীর জন্য পাত্রের সামনে মুখ ও হাতের কবজি পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েয, তবে তা অতিরিক্ত সাজসজ্জা ও সৌন্দর্য প্রদর্শন ছাড়া হওয়া চাই।
- বোরকা পরিধান করে নির্দিষ্ট অঙ্গ খোলা রাখায় কোনো সমস্যা নেই; বরং এটি উত্তম, কারণ এতে সতর আবরণ নিশ্চিত হয়।
- পা খোলা রাখা বা মাকরূহভাবে আকর্ষণীয় পোশাক পরা জায়েয নয়।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: বর্তমান স্বামী থাকা অবস্থায় ভিডিও কলের মাধ্যমে ‘তিন কবুল’ বলে বিবাহের ঘটনা
উত্তর:
এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর এবং ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে এটি জিনা (ব্যভিচার)-এর অন্তর্ভুক্ত, বৈধ বিবাহ নয়।
কারণসমূহ:
১. বর্তমান স্বামীর অস্তিত্ব:
- প্রশ্নে বর্ণিতা নারী ইতিমধ্যে বৈধ বিবাহে আবদ্ধ (প্রায় ৫ বছর)। তার স্বামীর সাথে বিবাহ এখনও বিদ্যমান; তালাক বা খুলা হয়নি।
- ইসলামী আইনে একজন নারী একই সময়ে দুই স্বামী রাখতে পারে না। কুরআনে ইরশাদ:
- "وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ النِّسَاءِ إِلَّا مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ" – “আর নারীদের মধ্যে যারা সধবা (স্বামীর অধীনে), তবে তোমাদের মালিকানাধীন দাসীরা ব্যতিক্রম।” (সূরা আন-নিসা ৪:২৪)
- তাই বর্তমান স্বামী থাকা অবস্থায় অন্য কারো সাথে বিবাহ চুক্তি করা সম্পূর্ণ বাতিল ও হারাম।
২. বিবাহের শর্ত পূর্ণ হয়নি:
- ইসলামী বিবাহের জন্য ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ) উভয়ই প্রয়োজন। এখানে শুধু নারী ‘কবুল’ বলেছেন, কিন্তু পুরুষের পক্ষ থেকে ইজাব (যেমন: “আমি তোমাকে বিবাহ করলাম”) বলা হয়েছে বলে বর্ণনায় নেই।
- আর ‘তিন কবুল’ শব্দটি বিবাহের জন্য শরীয়তসম্মত নয়; বরং বিবাহে একবার কবুলই যথেষ্ট, তবে শর্ত হলো ইজাব ও কবুল পরপর হওয়া।
- সাক্ষীর উপস্থিতি: দুইজন সাক্ষী থাকলেও তারা ভিডিও কলের মাধ্যমে ছিলেন, যা হানাফী মতে একই মজলিসে (গathering) না থাকলে বিবাহ শুদ্ধ হয় না। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, সাক্ষীদের একত্রে উপস্থিতি এবং ইজাব-কবুল শুনতে পাওয়া শর্ত। (আল-হিদায়া, کتاب النکاح)
- আধুনিক মাধ্যম (ভিডিও কল) নিয়ে হানাফী ফকীহগণ ভিন্ন মত দিয়েছেন। তবে এখানে মূল প্রতিবন্ধকতা হলো নারী ইতিমধ্যে বিবাহিত, তাই যেকোনো অবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ বাতিল।
৩. জিনার পরিণতি:
- এই ধরনের সম্পর্ককে শরীয়ত ‘জিনা’ বলে গণ্য করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
- "لَا يَحِلُّ لِامْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ أَنْ تُحِلَّ فَرْجَهَا لِرَجُلٍ غَيْرِ زَوْجِهَا" – “যে নারী আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, তার জন্য নিজের লজ্জাস্থান স্বামী ব্যতীত অন্য কারো জন্য হালাল করা জায়েয নয়।” (সুনানু আবী দাউদ, ২১৫৩)
- তাই উক্ত ‘তিন কবুল’ কোনো বিবাহ নয়; বরং এটি ব্যভিচারের একটি অংশ যার জন্য তওবা করা ফরয।
সুতরাং:
- এই ‘বিয়ে’ আদৌ শুদ্ধ হয়নি। এটি বাতিল ও অকার্যকর।
- বর্তমান স্বামীর সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ক এখনও বিদ্যমান (যদি তিনি তালাক না দিয়ে থাকেন)।
বর্তমান করণীয় (বোনের জন্য আবশ্যক কর্তব্য):
১. তওবা ও ইস্তিগফার:
- আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। জিনা কবীরা গুনাহ, তবে তওবা কবুলের দরজা খোলা। কুরআনে ইরশাদ:
- "قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا" – “বলো, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।” (সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)
- তওবার জন্য শর্ত: (ক) গুনাহ থেকে বিরত থাকা, (খ) অনুতপ্ত হওয়া, (গ) ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প। (রদ্দুল মুহতার, ৫:২৬৯)
- সেই ছেলের সাথে সমস্ত সম্পর্ক (ফোন, ভিডিও কল, মেসেজ) সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করতে হবে এবং তার সাথে বিবাহের চিন্তাও পরিত্যাগ করতে হবে।
২. বর্তমান স্বামীর সাথে সম্পর্কের বিধান:
- যেহেতু জিনা স্বামীর হক নষ্ট করে না, তাই তার বিবাহ অটুট আছে। তবে শারীরিক নির্যাতনের কারণে তিনি চাইলে খুলা (বিবাহ বিচ্ছেদ) করতে পারেন।
- খুলার পদ্ধতি: স্বামীর কাছে তালাক চাওয়া বা আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ। যদি স্বামী তালাক দিতে রাজি না হন, তাহলে ইসলামী বিচারকের মাধ্যমে খুলা নেওয়া যায়।
- তবে গুনাহ করে সংসার ভাঙা উচিত নয়। তিনি প্রথমে স্বামীর সাথে কথাবার্তা, পরিবারের সাহায্য, বা ধৈর্যের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চেষ্টা করুন। যদি নির্যাতন এতই তীব্র হয় যে সহ্য করা অসম্ভব, তবে ইসলামী উপায়ে বিচ্ছেদ গ্রহণ করতে পারেন।
৩. দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে কোনো বৈধ সম্পর্ক নেই:
- সেই ছেলের সাথে বৈধভাবে বিবাহ করা এখনও সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান স্বামী তালাক না দেন। আর যেহেতু তিনি ইতিমধ্যে তার সাথে জিনায় লিপ্ত হয়েছেন, তাই পরবর্তীতে বিবাহ করলেও তওবা ছাড়া তা পবিত্র হবে না। তবে তওবা ও ইস্তিগফারের পর যদি স্বামী তালাক দেয়, তাহলে ইদ্দত (তিন হায়য) শেষে সেই ছেলের সাথে বিবাহ জায়েয হবে কি? – হানাফী মতে, জনৈক ব্যক্তি যে বিবাহিত নারীর সাথে ব্যভিচার করেছে, তার সাথে পরে বিবাহ করা মাকরূহ তাহরীমী (ঘৃণিত ও নিকটবর্তী হারাম) – তবে যদি উভয়ে তওবা করে, তবে বিবাহ শুদ্ধ হবে। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১:২৭৬; রদ্দুল মুহতার, ৩:১৪১)
- কিন্তু যেহেতু বোনটি বর্তমান স্বামীর সাথে থাকতে চান না, সেক্ষেত্রে প্রথমে বৈধভাবে বিচ্ছেদ সম্পন্ন করবেন, তারপর ইদ্দত পালন করবেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন যেন তিনি তাকে ভালো পাত্র দেন – সেই ছেলেকে নয়, যার সাথে তিনি পাপ করেছেন।
সারসংক্ষেপ:
- বর্তমান বিবাহ অটুট আছে, তবে নির্যাতনের কারণে খুলা জায়েয।
- দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে যে ‘বিবাহ’ হয়েছে তা বাতিল। তা থেকে ফিরে আসা এবং তওবা করা ফরয।
- কোনো অবস্থাতেই বর্তমান স্বামীকে ফাঁকি দিয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তির সাথে চলা জায়েয নয়। এটি দ্বিগুণ পাপ হবে।
আল্লাহ তাআলা তাকে তওবা করার তাওফীক দিন এবং এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ দেখান। আমীন।
والله أعلم بالصواب