পুরো উম্মতের জন্য হজ করা জায়েজ কি?
Hajj and Umrah · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
প্রশ্ন: আমি এর আগে ফরজ হজ সম্পন্ন করেছি। এবার আমি পুরো উম্মতের জন্য হজ করতে চাই। এটা কি জায়েজ?
উত্তর:
বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
আলহামদুলিল্লাহ, সালাম ও দরুদ আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর প্রতি।
আপনার প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো— পুরো উম্মতের জন্য একক হজ করা জায়েজ নয়। এটি শরিয়তে প্রমাণিত কোনো আমল নয়। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত দলিল ও সালাফে সালেহীনের মতামত উল্লেখ করা হলো।
১. হজের মূল বিধান
হজ ফরজ হলে নিজের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজিব (সুরা আলে ইমরান ৩:৯৭)। যদি কেউ নিজের ফরজ হজ আদায় করে ফেলে, তাহলে সে নফল হজ করতে পারে। কিন্তু নফল হজেও নিয়ত করতে হবে নিজের জন্য অথবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য (যে ব্যক্তি মৃত বা অক্ষম)।
২. “উম্মতের জন্য হজ”—এ ধারণার শরয়ী ভিত্তি নেই
- রাসূল (ﷺ) নিজ জীবনে শুধু একবার হজ করেন (বিদায় হজ) এবং সেই হজ তিনি শুধু নিজের পক্ষ থেকে আদায় করেন। তিনি বলেননি যে, তিনি পুরো উম্মতের পক্ষ থেকে হজ করেছেন।
- সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও সালাফে সালেহীন কখনোই পুরো উম্মতের জন্য হজ করার রীতি পালন করেননি। এটি একটি বিদ‘আত (নবাবিষ্কৃত কর্ম) যা শরীয়তের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়েছে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
“যে ব্যক্তি নিজের পক্ষ থেকে ফরজ হজ সম্পন্ন করার পর ‘সমস্ত মুসলিমের পক্ষ থেকে’ হজ করার নিয়ত করে, এটি জায়েজ নয়। বরং হজ শুধু নিজের জন্য অথবা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জন্য করা হয়।”
(মাজমু‘উল ফাতাওয়া, ২৬/২৪)
শায়খ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন:
“একটি হজ শুধু একজনের পক্ষ থেকে করা যায়। একাধিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে একসঙ্গে করা শরিয়তসম্মত নয়।”
(শারহুল মুমতি‘, ৭/২৩০)
৩. বিকল্প কী করতে পারেন?
আপনি যদি উম্মতের জন্য কল্যাণ কামনা করেন, তবে নিজের হজের সময় নিম্নোক্ত কাজ করতে পারেন:
ক. দো‘আ উম্মতের জন্য
আপনার হজের সময় (তাওয়াফ, সাঈ, আরাফার ময়দানে) উম্মতের জন্য দো‘আ করা সর্বোত্তম। রাসূল (ﷺ) বলেন:
“যে ব্যক্তি (মক্কায়) চুপচাপ বসে থাকে, তার গুনাহ মাফ হয় না; বরং যে ব্যক্তি সেখানে অবস্থান করে (ইবাদত ও দো‘আ করে), তার জন্য কল্যাণ রয়েছে।”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ২৯৫৭)
খ. নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ
আপনি চাইলে মৃত মুসলিম অথবা অসুস্থ/অক্ষম জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ করতে পারেন। এর জন্য তাদের অনুমতি নেওয়া জরুরি (যদি জীবিত হয়) অথবা তাদের নাম উল্লেখ করে নিয়ত করা।
রাসূল (ﷺ) এক মহিলাকে বলেছিলেন:
“তুমি তোমার পিতার পক্ষ থেকে হজ করো।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩৩৪)
গ. নফল হজ নিজের জন্য
যদি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজ করতে না চান, তাহলে নিজের জন্য নফল হজ করে নিন। নিজের জন্য নফল ইবাদত করলেও আপনি উম্মতের জন্য দো‘আ করতে পারেন।
৪. শায়খ ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়া
শায়খ ইবনে বায (রহ.) জিজ্ঞাসিত হন: “কেউ যদি ফরজ হজের পর ‘গোটা উম্মতের পক্ষ থেকে’ হজ করে, তাহলে কি তা গৃহীত হবে?”
উত্তরে তিনি বলেন:
“এটি বিদ‘আত। হজ শুধু একজন ব্যক্তির পক্ষ থেকে হয়। ‘সমস্ত মুসলিমের পক্ষ থেকে’ বলে কোনো হজ হয় না। বরং এটি একটি অপপ্রচারিত ধারণা।”
(মাজমু‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৭/২৩৫)
৫. কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রমাণ
-
সুরা হজ (২২:২৭): “আর মানুষের মধ্যে হজের জন্য ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে দূর-দূরান্তের পথ পাড়ি দিয়ে।”
এখানে ‘তারা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের, যারা নিজের পক্ষ থেকে হজ করবে। -
সহীহ বুখারি (হাদিস নং ১৮৫২): রাসূল (ﷺ) বলেন: “হজ শুধু ওই ব্যক্তির জন্য ফরজ, যে সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে।”
সামর্থ্য থাকলে নিজের পক্ষ থেকে আদায় করাই মূল।
৬. উপসংহার
- “পুরো উম্মতের জন্য হজ” একটি অপ্রমাণিত ধারণা। এটি জায়েজ নয়।
- আপনি চাইলে নির্দিষ্ট মৃত/অক্ষম ব্যক্তি অথবা নিজের পক্ষ থেকে নফল হজ করতে পারেন।
- উম্মতের জন্য দো‘আ ও ইস্তিগফার করা হজের সময় উত্তম আমল।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের ইবাদত কবুল করুন। আমিন।