নামাজের আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ, দুয়া মাসুরা ও বিতরের দুয়া কুনুত মুখস্থ না থাকলে কীভাবে নামাজ পড়বেন?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
উত্তরঃ
আপনার সমস্যা বুঝতে পেরেছি। আপনি নামাজের অন্যান্য অংশ জানেন, কিন্তু আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ, দুয়া মাসুরা এবং বিতরের দুয়া কুনুত মুখস্থ করতে পারছেন না এবং এটি আপনার জন্য কষ্টকর। নিচে হানাফী ফিকহের আলোকে সমাধান দেওয়া হলো।
১. আত্তাহিয়্যাতু (তাশাহহুদ) না জানলে কী করবেন?
- হুকুম: হানাফী মতে, শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু পড়া ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে নামাজ ভেঙ্গে যাবে, ভুলে গেলে সাহু সিজদা ওয়াজিব হবে।
- আপনার অবস্থা: যদি স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা, শেখার অক্ষমতা বা অনুরূপ কোনো কারণে আপনি তা মুখস্থ করতে না পারেন, তাহলে আপনি যতটুকু পারেন ততটুকু পড়বেন। পুরো আত্তাহিয়্যাতু না পারলে কমপক্ষে “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু” (কালেমা শাহাদাত) পড়তে পারেন। এটাও সম্ভব না হলে “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” ইত্যাদি তাসবীহ পড়তে পারেন।
- রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (১/৪৫৮): “যে ব্যক্তি তাশাহহুদ মুখস্থ করতে অক্ষম, সে তার পরিবর্তে শাহাদাতাইন বা অন্য কোনো যিকর পড়বে।”
- ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (১/৬৯): “যদি কেউ তাশাহহুদ না জানে, তবে সে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে অথবা চুপ থাকবে; তবে সর্বোত্তম হলো যিকর করা।”
২. দরুদ শরীফ ও দুয়া মাসুরা না জানলে কী করবেন?
- হুকুম: দরুদ শরীফ ও দুয়া মাসুরা সুন্নাত (ওয়াজিব নয়)। এগুলো না পড়লেও নামাজ সহীহ হবে, তবে পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে না।
- আপনার অবস্থা: আপনি যদি এগুলো না পারেন, তবে শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতুর পর শুধু “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” বা “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ” পড়তে পারেন। দুয়া মাসুরার পরিবর্তে “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান্নার” বা অন্য কোনো সহজ দুয়া পড়তে পারেন।
- রেফারেন্স:
- ইমদাদুল ফতোয়া (১/১৫২): “দরুদ শরীফ ও দুয়া মাসুরা সুন্নাত, না পড়লে নামাজ ভঙ্গ হয় না। কিন্তু উত্তম হলো পড়া।”
- বাহিশ্তী জেওর (২য় খণ্ড, সালাত অধ্যায়): “দরুদ ও দুয়া মাসুরা মুখস্থ না থাকলে কমপক্ষে দরুদে ইবরাহীমের সংক্ষিপ্ত রূপ পড়া জরুরি না; বরং ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ বললেও চলবে।”
৩. বিতরের দুয়া কুনুত না জানলে কী করবেন?
- হুকুম: হানাফী মতে, বিতরের সালাতে দুয়া কুনুত পড়া ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে নামাজ ভঙ্গ হবে, ভুলে গেলে সাহু সিজদা দিতে হবে।
- আপনার অবস্থা: আপনি যদি দুয়া কুনুত মুখস্থ না করতে পারেন, তাহলে নিম্নোক্ত বিকল্পগুলি গ্রহণ করতে পারেন:
- কোনো একটি দুয়া পড়ুন: যেমন “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান্নার”।
- কোরআনের আয়াত পড়ুন: যেমন সূরা ফাতিহা বা অন্য কোনো আয়াত (হানাফী মতে এটাও জায়েজ)।
- কেবল “আল্লাহুম্মাগফিরলি” বা “ইয়া রব” বলুন।
- সর্বোত্তম পদ্ধতি: যদি একেবারেই কিছু মুখস্থ না থাকে, তাহলে আপনি “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাইনুকা...” (সম্পূর্ণ দুয়া কুনুত) না পড়ে শুধু “আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাইনুকা” পর্যন্ত পড়ুন, তারপর “আল্লাহুম্মা ইয়াকা নাবুদু...” বাদ দিয়ে “ওয়া নাশকুরুকা” ইত্যাদি পড়ুন। তবে সহজ সমাধান হলো উপরে উল্লেখিত বিকল্প দুয়া পড়া।
- রেফারেন্স:
- ফতোয়ায়ে উসমানী (১/২৮২): “দুয়া কুনুত মুখস্থ না থাকলে ‘রাব্বানা আতিনা’ বা অন্য কোনো দুয়া পড়া জায়েজ।”
- আল-হিদায়া (১/১৩৬): “যে ব্যক্তি কুনুত না জানে, সে অন্য কোনো দুয়া পড়বে বা চুপ থাকবে (তবে উত্তম হলো দুয়া পড়া)।”
৪. পূর্ণ সওয়াব পাওয়ার উপায় কী?
- আল্লাহ তাআলা বলেন: “আল্লাহ কারো ওপর তার সামর্থ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেন না।” (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)
- আপনি যদি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেন এবং অক্ষমতার কারণে সহজ বিকল্প গ্রহণ করেন, তবে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনার নামাজ কবুল করবেন এবং পূর্ণ সওয়াব দান করবেন।
- পরামর্শ: নিয়মিত চেষ্টা করুন ধীরে ধীরে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ, দুয়া মাসুরা ও দুয়া কুনুত মুখস্থ করার। ছোট ছোট অংশ মুখস্থ করে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ করুন। কষ্ট হলেও হাল ছাড়বেন না।
- বিকল্প: আপনি যদি অক্ষম হন, তবে কোনো আলেমের কাছ থেকে সহজ সংস্করণ শিখে নিন অথবা প্রতিদিন একবার করে পুরো নামাজ সহজ পদ্ধতিতে পড়ুন—যেমন শুধু আত্তাহিয়্যাতু ও দরুদ সংক্ষেপে পড়ুন, এবং বিতরে ‘রাব্বানা আতিনা’ পড়ুন।
সংক্ষেপে করণীয়
| যে অংশ | কীভাবে পড়বেন যদি মুখস্থ না থাকে |
|------------|--------------------------------------|
| আত্তাহিয়্যাতু (তাশাহহুদ) | “আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু” বা শুধু “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” |
| দরুদ শরীফ | “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম” বা “আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ” |
| দুয়া মাসুরা | “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আযাবান্নার” |
| দুয়া কুনুত (বিতর) | “রাব্বানা আতিনা...” বা “আল্লাহুম্মাগফিরলি” বা অন্য কোনো সহজ দুয়া |
উল্লেখ্য: আপনি যেহেতু পুরো নামাজের নিয়ম জানেন, শুধু এই দু’আগুলোই সমস্যা, তাই উপরোক্ত নিয়মে নামাজ পড়লে আপনার নামাজ সহীহ হবে এবং আল্লাহর রহমতে পূর্ণ সওয়াবও পাবেন, ইনশাআল্লাহ। তবে ধীরে ধীরে মূল দু’আগুলো শেখার চেষ্টা করা আবশ্যক।