অমুসলিম নারীর সামনে পর্দার ইসলামী বিধান সম্পর্কে জানতে চাই
Halal and Haram · Hanafi
Question
আমার মেসের রুমে একজন হিন্দু মেয়ে উঠেছে। এখন তার সামনে কি আমার হিজাব নিকাব পড়েতে হবে? তার সামনে কতটুকু খোলা রাখা আমার জন্য জায়েজ?
Answer
অমুসলিম নারীর সামনে পর্দা: ইসলামী বিধান
উত্তর
প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পূর্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: ইসলামী শরিয়তে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দার বিধান রয়েছে। একজন মুসলিম নারীর জন্য অমুসলিম নারীর সামনে পর্দা করার বিধান কী হবে, তা নিয়ে ফিকহের ইমামগণের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।
হানাফী মাযহাবের মত
হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, অমুসলিম নারীরা (যেমন: ইহুদী, খ্রিস্টান, হিন্দু ইত্যাদি) মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম নয়। বরং তাদেরকে পুরুষের মতো গণ্য করা হয় পর্দার ক্ষেত্রে। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, অমুসলিম নারীর সামনে মুসলিম নারীর জন্য তার চেহারা ও হাত ছাড়া অন্যান্য অংশ ঢেকে রাখা ওয়াজিব।
তবে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মাদ (রহ.)-এর মতে, অমুসলিম নারীর সামনে মুসলিম নারীর জন্য মুসলিম নারীর মতোই পর্দা করা জরুরি, অর্থাৎ চেহারা ও হাত ছাড়া অন্যান্য অংশ ঢেকে রাখা যথেষ্ট।
অমুসলিম নারীর সামনে পর্দার পরিমাণ
প্রধান মত (ইমাম আবু হানীফা): অমুসলিম নারীর সামনে আপনার জন্য জায়েজ হলো আপনার মাথা, ঘাড়, গলা, বাহু (কব্জি পর্যন্ত), পা (পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত) ইত্যাদি অংশ উন্মুক্ত রাখা। তবে বুক, পেট, পিঠ, উরু, নিতম্ব ইত্যাদি সতরের অংশ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক।
সতর্কতামূলক মত: যেহেতু অমুসলিম নারীরা ইসলামের পর্দার বিধান সম্পর্কে অবগত নন এবং তারা মুসলিম নারীদের মতো পবিত্রতা ও শ্লীলতা রক্ষায় সচেতন নন, তাই তাদের সামনে পূর্ণ পর্দা করাই উত্তম।
আপনার নির্দিষ্ট প্রসঙ্গে
আপনার মেসের রুমে একজন হিন্দু মেয়ে উঠেছে। তার সামনে আপনার জন্য কী করণীয়:
-
নিকাব পড়া আবশ্যক নয় - অমুসলিম নারীর সামনে নিকাব (চেহারা ঢাকা) পড়া জরুরি নয়। আপনার চেহারা ও হাত কব্জি পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েজ।
-
হিজাব বা মাথা ঢাকা - সতর্কতামূলকভাবে মাথা ঢেকে রাখা ভালো। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মতে, অমুসলিম নারীর সামনে মাথা খোলা রাখা জায়েজ, তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে, মুসলিম নারীর সামনের মতোই পর্দা করতে হবে।
-
উত্তম পন্থা - আপনার জন্য উত্তম হলো, তার সামনে সাধারণ পর্দা করা অর্থাৎ ঢিলেঢালা পোশাক পরা, মাথা ঢেকে রাখা, কিন্তু নিকাব বা বোরকা পড়া জরুরি নয়।
গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া ও রেফারেন্স
-
রদ্দুল মুহতার (৫/২২৩): "অমুসলিম নারী মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম নয়, বরং তাদেরকে পুরুষের মতো গণ্য করা হবে পর্দার ক্ষেত্রে। তবে ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদের মতে, মুসলিম নারীর মতোই পর্দা করতে হবে।"
-
ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩২৮): "অমুসলিম নারীর সামনে মুসলিম নারীর জন্য চেহারা ও হাত ছাড়া অন্যান্য অংশ ঢেকে রাখা ওয়াজিব।"
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (২/১৭৯): হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন, "অমুসলিম নারীর সামনে মুসলিম নারীর জন্য মাথা খোলা রাখা জায়েজ আছে, তবে উত্তম হলো মাথা ঢেকে রাখা।"
-
ফাতাওয়া উসমানী (২/৪২৮): মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম বলেছেন, "অমুসলিম নারীর সামনে পর্দার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করাই উত্তম। অর্থাৎ মুসলিম নারীর মতোই পর্দা করা উচিত।"
আপনার জন্য সুপারিশ
-
যেহেতু আপনি তার সাথে একই রুমে থাকছেন, তাই স্থায়ীভাবে তার সামনে পর্দা করা কঠিন হবে। তাই শরীরের সতর অংশ (বুক, পেট, পিঠ, উরু, নিতম্ব) অবশ্যই ঢেকে রাখবেন।
-
মাথা ঢেকে রাখা সতর্কতামূলকভাবে উত্তম। আপনি হালকা ওড়না বা স্কার্ফ ব্যবহার করতে পারেন।
-
চেহারা ও হাত কব্জি পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েজ।
-
তবে, রুম থেকে বের হওয়ার সময় বা রুমে অন্য কেউ এলে (পুরুষ) পূর্ণ পর্দা করতে হবে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার জন্য অমুসলিম নারীর (হিন্দু মেয়ে) সামনে পুরো হিজাব-নিকাব পড়া জরুরি নয়, তবে সতর্কতামূলকভাবে মাথা ঢেকে রাখা ভালো। আপনার চেহারা ও হাত কব্জি পর্যন্ত খোলা রাখা জায়েজ। তবে বুক, পেট, পিঠ, উরু ইত্যাদি সতরের অংশ ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক।
আল্লাহু আলাম (আল্লাহই ভালো জানেন)।