ছাগলের প্রজনন টাকার বিনিময়ে করলে কি জায়েজ হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
শ্রদ্ধেয় মুক্তি সাহেবগণ,
আমরা যারা গ্রামে গঞ্জে দু তিনটা কিংবা চারটা করে ছাগল লালন পালন করি তারা কিভাবে হালাল ভাবে ছাগলের প্রজনন করাবেন?
যেহেতু অন্যের পাঠা দিয়ে টাকার বিনিময়ে প্রজনন করা নাজায়েজ তো হালাল পন্থা কি হতে পারে এক্ষেত্রে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণ মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবনের সাথে সম্পৃক্ত। ছাগলের প্রজনন সংক্রান্ত আইনগত দিকটি স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
মূল ফতোয়া
আপনার জানা মতে, অন্যের পাঠা (পুরুষ ছাগল) দিয়ে ছাগলের প্রজনন করানোর বিনিময়ে টাকা বা কোনো নির্দিষ্ট পারিশ্রমিক (এক্সপ্লিসিট ফি) নেওয়া বা দেওয়া হানাফি ফিকহে নাজায়েজ (অবৈধ)। এটি পশু প্রজননের ক্ষেত্রে "বীজ বিক্রয়" বা স্পার্ম ভাড়া দেওয়ার পর্যায়ে পড়ে, যা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।
রদ্দুল মুহতার (হানাফি ফিকহের প্রামাণ্য গ্রন্থ)-এ উল্লেখ আছে:
"وَلَا يَجُوزُ اسْتِئْجَارُ الْفَحْلِ لِلضِّرَابِ (পশুর সঙ্গমের জন্য পুরুষ পশু ভাড়া দেওয়া জায়েজ নয়)... وكذا لا يجوز بيع مائه (এবং একইভাবে এর বীর্য বিক্রি করাও জায়েজ নয়)।" (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারাহ, বাবু ইজারাতিল হায়াওয়ান)
ফাতাওয়া হিন্দিয়াতেও (আলামগিরি) স্পষ্ট বলা হয়েছে:
"وَأَمَّا النَّعْجَةُ وَالْمَاعِزَةُ وَالْبَقَرَةُ وَالنَّاقَةُ... لَا يَجُوزُ اسْتِئْجَارُ الْفَحْلِ لِضِرَابِهَا (ভেড়া, ছাগল, গরু, উট ইত্যাদির ক্ষেত্রে পুরুষ পশুকে সঙ্গমের জন্য ভাড়া দেওয়া জায়েজ নয়)।"
হালাল পন্থা ও সমাধান
আপনি গ্রামীণ পরিবেশে ২-৪টি ছাগল লালন-পালন করেন, তাই সহজ ও হালাল কিছু পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. পুরুষ ছাগল (পাঠা) নিজে রাখা বা সহযোগিতায় রাখা:
যদি আপনার এলাকায় ১০-১২টি ছাগল থাকে, তাহলে একটি ভালো জাতের পাঠা একসাথে কেনা বা পালন করা সুন্নত ও হালাল পন্থা। এটি দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ীও।
২. বিনিময় বা বন্ধুত্বপূর্ণ লেনদেন (বিনা টাকায়):
আপনার পাঠা যদি আপনার না থাকে, তাহলে কোনো মুসলিম প্রতিবেশীর সাথে শর্তহীন ও বিনামূল্যে প্রজনন করানো বৈধ। যেমন:
আপনি তার কাছে পাঠা নিয়ে গিয়ে সঙ্গম করাতে পারেন এবং এর বিনিময়ে কিছু দেওয়া জরুরি নয়। তবে আপনি ইচ্ছাপূর্বক (শর্ত ছাড়া) তাকে একটি উপহার (যেমন: একটি বাচ্চা, দুধ, বা কিছু ফল-মূল) দিতে পারেন। এটি জায়েজ।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) এর মতে, শর্তহীনভাবে ব্যবহার করলে এবং কোনো নির্দিষ্ট মজুরি না দিলে তা বৈধ।
৩. হাদিয়া (উপহার) পদ্ধতি:
আপনি যদি কারো পাঠা ব্যবহার করেন এবং তাকে কিছু দিতে চান, তাহলে সেটাকে উপহার (হাদিয়া) হিসাবে দিন। সরাসরি "এত টাকার বিনিময়ে প্রজনন করাই" বলে চুক্তি করবেন না। এবং সঙ্গম করানোর সাথে সাথে দিবেন না, বরং আগে অথবা পরবর্তীতে দিবেন। " এটি অধিকতর নিরাপদ ও হালাল পদ্ধতি।
৪. অংশীদারিত্ব বা শরিকানায় পাঠা পালন:
আপনি এবং আপনার প্রতিবেশীরা একত্রে একটি পাঠা কিনে পালন করুন এবং সবাই প্রজননের জন্য ব্যবহার করুন। খরচ ভাগ করে নিলে এটি নাজায়েজ কিছু নয়।
গুরুত্বপূর্ণ নোট:
- টাকার বিনিময়ে প্রজনন করানো জায়েজ নয় কারণ এটি বীর্য বিক্রয় বা গর্ভাধানের বিনিময়ে পারিশ্রমিক এর শামিল, যা হাদিস ও ইজমা দ্বারা নিষিদ্ধ।
- ইমাম মুহাম্মদ (রহ.) এবং ইমাম মালেক (রহ.) এর মতে কিছুক্ষেত্রে বৈধতা আছে, কিন্তু হানাফি মাযহাবের প্রধান ফতোয়া (যা অধিকাংশ ভারতীয় উপমহাদেশের আলেম গ্রহণ করেন) তা নাজায়েজ।
কুরআন-হাদিসের দলিল ও উক্তি:
হাদিস:
روى البخاري عن ابن عمر رضي الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم نهى عن عسب الفحل (ফাহলের বীর্য বিক্রি নিষেধ করেছেন)। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইজারাহ)
এখানে "উসবুল ফাহল" বা পুরুষ পশুর সঙ্গমের বিনিময় নিষিদ্ধ।
মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.) তে উল্লেখ আছে:
"পশুর প্রজননের জন্য পুরুষ পশু ভাড়া দেওয়া বা নির্দিষ্ট বিনিময়ে সঙ্গম করানো নাজায়েজ। তবে শর্তহীনভাবে উপহার দেওয়া জায়েজ।"
ফতোয়া ওসমানী (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানী দা.বা.) তে এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।
পরিশেষে:
উপসংহার: আপনি যদি সম্পূর্ণ হালাল পন্থায় ছাগলের প্রজনন করতে চান, তাহলে শর্তহীন ও বিনামূল্যে অন্যের পাঠা ব্যবহার করুন অথবা নিজে একটি পাঠা পালন করুন। কোনো অবস্থাতেই টাকা বা নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করবেন না। এক্ষেত্রে আপনি যদি বিনিময়ে কিছু দিতেও চান, তাহলে সেটা উপহার হিসেবে দিন, "প্রজননের পারিশ্রমিক" হিসেবে নয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রোজগারের তাওফিক দিন। (আমিন)