তারাবির নামাজ পড়িয়ে বা মসজিদে বয়ান করে নিজে থেকে চেয়ে হাদিয়া নেওয়া কি জায়েজ।
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
তারাবির নামাজ পড়িয়ে বা মসজিদে বয়ান করে হাদিয়া নেওয়া প্রসঙ্গে
প্রশ্নের উত্তর
তারাবির নামাজ পড়ানো, মসজিদে বয়ান করা বা ধর্মীয় সেবা প্রদানের বিনিময়ে নিজে থেকে হাদিয়া চাওয়া শরীয়তের সম্মত নয়। এটি ইখলাস (একনিষ্ঠতা) ও নিঃস্বার্থ সেবার পরিপন্থী। তবে মাসিক বা বাৎসরিক হিসেবে বিনিময় নির্ধারণ করে দ্বীনি কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ হওয়া যাবে। অর্থাৎ ফরয ইবাদত পালনের জন্য সময় নির্ধারণ করে কাউকে নিয়োগ দেয়া যাবে। তবে নফল ইবাদত পালনের জন্য বিনিময়ে কাউকে নিয়োগ দেয়া যাবে না। যেমন, মসজিদের ইমাম, মাদরাসার শিক্ষকবৃন্দ সময় ব্যয় হিসেবে কাজ বা সময় নির্ধারণ মূলক নিয়োগ হতে পারবেন। এবং বয়ানের সময় নির্ধারণ মূলক হাদিয়া নির্ধারণ করে বয়ান করতে পারবেন। তখন বিনিময়টা সময় ব্যয়ের উপর চলে আসবে।
দলিল ও হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি
১. কুরআনের দলিল: আল্লাহ তাআলা বলেন: "তারা বলে, আমরা তোমাদেরকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য খাদ্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোনো প্রতিদান বা কৃতজ্ঞতা চাই না।" (সূরা আল-ইনসান: ৯)
২. হাদিসের দলিল: রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন: "তোমরা কুরআন পাঠ করো এবং (এর বিনিময়ে) লোকদের নিকট থেকে কিছু চেয়ো না। কারণ অচিরেই এমন এক সম্প্রদায়ের আগমন হবে যারা কুরআন পাঠ করবে এবং লোকদের নিকট তা দিয়ে (পার্থিব প্রয়োজন) চাইবে।" (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২২২৬৭)
অন্য হাদিসে বর্ণিত: "যে ব্যক্তি কুরআনের বিনিময়ে (পারিশ্রমিক) গ্রহণ করে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় উঠবে যে, তার মুখে মাংস থাকবে না (অর্থাৎ তার চেহারা অন্ধকার হবে)।" (শারহ মা'আনিল আছার, ত্বহাবী)
৩. হানাফি ফিকহের কিতাবের বক্তব্য:
-
রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): এতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ইমামের জন্য তারাবির নামাজ পড়ানোর বিনিময়ে নির্ধারিত বেতন বা পারিশ্রমিক গ্রহণ করা মাকরুহ তাহরিমি। (রদ্দুল মুহতার, ২/৪৪১)
-
ফাতাওয়া আলমগিরী (হিন্দিয়া): "ইমামের জন্য তারাবির নামাজ পড়ানোর বিনিময়ে কোনো কিছু গ্রহণ করা জায়েয নয়। যদি কেউ স্বেচ্ছায় কিছু দেয়, তবে তা গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে তা চাওয়া জায়েয নয়।" (ফাতাওয়া আলমগিরী, ১/১৫৮)
-
ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): ধর্মীয় কাজের বিনিময়ে বেতন বা পারিশ্রমিক গ্রহণ ইখলাস নষ্ট করে। বিশেষ করে যদি নিজে থেকে চাওয়া হয়, তবে তা আরও বেশি অপছন্দনীয়। (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/২৪১)
-
ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তকী উসমানী): "তারাবি বা অন্য কোনো নফল নামাজ পড়ানোর জন্য নির্ধারিত বেতন বা হাদিয়া চাওয়া শুদ্ধ নয়। তবে যদি কেউ স্বেচ্ছায়, অনুরোধ ছাড়াই কিছু দেয়, তাহলে তা গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু ইমামের উচিত ইখলাস বজায় রাখা।" (ফাতাওয়া উসমানী, ২/২৭৫)
-
বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানভী): এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, ইমামের জন্য তারাবি পড়ানো বা দ্বীনি কাজ করা মূলত ইবাদত। এর বিনিময়ে কোনো অর্থ চাওয়া ইবাদতকে ব্যবসায় পরিণত করে। (বেহেশতী জেওর, ২/২৭)
নিজে থেকে হাদিয়া চাওয়ার বিধান:
- নিজে থেকে হাদিয়া চাওয়া শরীয়তে নিষিদ্ধ। এটি ধর্মীয় কাজের পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থতা নষ্ট করে।
- বিশেষ করে তারাবির নামাজ পড়ানো বা মসজিদে বয়ান করা ইবাদত। এর বিনিময়ে কিছু চাওয়া ইবাদতের ইখলাস নষ্ট করে।
মুফতি তকী উসমানি দামাত বারাকাতুহুমের বক্তব্য:
"যারা তারাবি পড়ান এবং বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ করেন, তাদের জন্য করণীয় হলো: তারা যেন তা নির্ধারিত বেতন বা চুক্তিভিত্তিক পারিশ্রমিক হিসেবে না নেন। বরং মসজিদ কমিটি বা এলাকাবাসী যদি স্বেচ্ছায় কোনো কিছু প্রদান করেন, তবে সেটা হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে নিজে থেকে চাওয়া, চুক্তি করা বা মনমত না হলে অসন্তুষ্ট হওয়া জায়েয নয়।" (ইসলাহী খুতুবাত, জুলাই ২০১৫)
দ্বিতীয় অংশের উত্তর: হাদিয়া পছন্দ না হলে দুঃখ প্রকাশ
হাদিয়া পছন্দ না হওয়ার কারণে দুঃখ প্রকাশ করা বা অসন্তুষ্টি দেখানো জায়েয নয়। কারণ:
১. এটি ইখলাস ও তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী। ২. হাদিয়া দেওয়া সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন বিষয়, একে বাধ্যতামূলক করা যায় না। ৩. দুঃখ প্রকাশ করলে মনে হবে যে, আপনি ইবাদতটি পার্থিব লাভের জন্য করেছেন, যা ইখলাস নষ্ট করে।
উপসংহার
১. তারাবির নামাজ পড়িয়ে বা বয়ান করে নিজে থেকে হাদিয়া চাওয়া জায়েয নয়। ২. কারো কাছ থেকে হাদিয়া পেলে তা অনুরোধ ছাড়া ও স্বেচ্ছায় প্রদত্ত হলে গ্রহণ করা যেতে পারে। ৩. হাদিয়া পছন্দ না হলে দুঃখ প্রকাশ বা অসন্তুষ্টি দেখানো জায়েয নয়। ৪. দ্বীনি কাজের ক্ষেত্রে ইখলাস (একনিষ্ঠতা) বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৫. নির্ধারিত সময় বন্দির জন্য বেতন নির্ধারণ করা জায়েয। যেমন, মাসিক বেতনে মাসের জন্য কোথাও চুক্তিবদ্ধ হওয়া যাবে।তখন সময় বন্দীর বিনিময় হবে যা নেয়া জায়েয।