যার পুরোপুরি বুদ্ধি ও জ্ঞান নেই, তার ব্যাপারে শরীয়তের সিদ্ধান্ত কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
উস্তাদ আমার এক পরিচিত ছোট বোন প্রশ্নটা করেছে। প্রশ্নটা তার মাকে নিয়ে:
আনটি (তার মা) ছোট বেলা থেকে সৃতি শক্তি অনেক দুর্বল। ছোট বেলার মা -বাবা তাকে মক্তবে পাঠিয়েছিল কিন্ত কিছুই শিখতে পারতো না, অনেকে পাগলি বলতো, কারন স্বাভাবিক অন্যদের থেকে আনটির(তার মায়ের)বুঝ অনেক কম ছিল। কিছুই মনে রাখতে পারতো না,এখন তার স্বামী সন্তান সব আছে। চার মেয়ে, মেয়েরা অনেক বড় হয়েছে, কেউ মেডিকেলে, কেউ ভার্সিটিতে পড়ে। তাদের সৃতি শক্ত অনেক ভালো। কিন্তু আনটি এখনো এমন, কথা গুছিয়ে বলতে পারে না, কোথায় কি বলতে হবে সেটাও বোঝে না। অন্য সব স্বাভাবিক। মা হিসেবে বাচ্চাদের প্রতি ভালোবাসা সব ঠিক আছে। কিন্তু মেয়েরা চেষ্টা করেও একটা সুরাও এখনো মুখস্ত করাতে পারেনি, অনেক কষ্টে লা ইলাহা ইল্লালাহ, এগুলো বলতে পারে। তিনি এটাও বোঝে না আখিরাত, জান্নাত জাহান্নাম বলে কিছু আছে। স্বাভাবিক ভাবে রান্না করে, খায়, ঘুমায়, সংসারের কাজকর্ম করে, প্রতিবেশির সাথে গল্প করে। তিনি নামাজ পড়তেও পারে না। নামাজের কোনো সুরাও মুখস্ত নেই।
উস্তাদ তিনি ঠিক পাগল নয়। আবার স্বাভাবিক ও নয়।
তার এক মেয়ে মেডিকেলে পড়ে। তিনি শুধু এতটুকু জানে যে মেয়ে ডাক্তার হবে। এর বেশি কিছু বোঝে না। তার মেয়েরা অনেক চেষ্ট করেছে বোঝাতে, সুরা শেখাতে, কিন্তু কোনো ভাবেই মনে রাখতে পারে না,
তিনি সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবর এগুলোও মনে রাখতে পারে না, বোঝেই না যে, নামাজ না পড়লে গুনাহ হবে। জ্বীন যাদু জাতীয় সমস্যা নয় হয়ত কারন তার নানী বলেছে তার মা ছোট বেলা থেকেই এমন।
লিখে তার সিচুয়েশনটা বোঝাতে পেরেছি কিনা জানিনা উস্তাদ।
আমার সেই ছোট বোন খুবি চিন্তিত তার মায়ের ব্যাপারে। সে আজ অনেকদিন ধরেই তার মায়ের ব্যাপারে কিছু প্রশ্নের উত্তর খুজছে -
১.আনটির ব্যাপারে শরীয়াহ এর হুকুম কি? তার মায়ের কি হিসাব হবেনা? তিনিতো নামাজ পড়তেও পারে না, ইসলামে তো পাগলের হিসেব হবেনা বলা আছে, কিন্তু আনটি তো পুরোপুরি পাগল ও নয়।
২.এই পরিস্থিতে তার করনীয় কি মেয়ে হিসাবে? অনেক চেষ্ট করে শুধু লা ইলাহা ইল্লালাহ বলতে পারে এখন, বাকি কিছুই মনে রাখতে পারে না। মেয়েদের সাথে নামাজে দাড়ালে মেয়েরা যেমন যেমন করে সেমন করতে পারে শুধু,
কি বলতে হবে বোঝে না মনেও রাখতে পারেনা।
৩.এত বছর পর ডাক্তারকে কি দেখানোর প্রয়োজন আছে উস্তাদ,এটা কি কোনো ক্লিনিকাল ইস্যু হতে পারে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থাটি স্পষ্ট যে, আনটি (মা) ছোটবেলা থেকেই স্মৃতিশক্তি ও বোধশক্তিতে অত্যন্ত দুর্বল। তিনি পূর্ণ পাগল নন, তবে স্বাভাবিক মানুষদের মতো বুঝতে ও মনে রাখতে পারেন না। এমন ব্যক্তি ইসলামী পরিভাষায় “মা’তূহ” বা “মা’রুর” (বুদ্ধি-বিবেকহীন) হিসেবে গণ্য। নিচে আপনার তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
১. আনটির ব্যাপারে শরী‘আহর হুকুম – তাঁর কি হিসাব হবে?
উত্তর:
যে ব্যক্তি বুদ্ধি-বিবেক সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেনি, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে ও মনে রাখতে অক্ষম (যেমন নামাজের সূরা, আখিরাতের ধারণা ইত্যাদি), সে ব্যক্তি মা’তূহ (ضعيف العقل) বলে গণ্য। হানাফী ফিকহের কিতাবে এসেছে:
- إمْدَادُ الْفَتَاوَىٰ (২/২৩) : “যার বিবেক এতটাই দুর্বল যে সে নামাজের ফরয, ওয়াজিব বা হারাম বুঝতেই পারে না, তার ওপর নামাজ ফরয নয়।”
- رَدُّ الْمُحْتَار (১/৬৫) : “পাগল ও মা’তূহ উভয়ের ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের কৃত কাজের জন্য দায়ী করা হবে না, যতক্ষণ না তারা সুস্থ হয়।”
আপনার মায়ের ক্ষেত্রে তিনি নামাজের সূরা মুখস্থ করতে পারেন না, নামাজের অর্থ ও গুরুত্ব বোঝেন না, এমনকি ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’-ও মনে রাখতে পারেন না। এটি তাঁর বিবেকের এতটাই দুর্বলতা যে, তিনি মা’তূহ-এর পর্যায়ে পড়েন। তাই তাঁর ওপর নামাজ, রোজা বা অন্য কোনো ইবাদত ফরয নয় এবং আখিরাতে তাঁর হিসাব হবে না। যেমনটি হাদীসে এসেছে:
“রাফি‘আল কালাম ‘আন ছালাসা…”
(অর্থ: তিন ব্যক্তি থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: নিদ্রিত ব্যক্তি জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত, শিশু বালেগ না হওয়া পর্যন্ত এবং পাগল সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত।)
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৪৪০৩; সহীহ বুখারী, হাদীস: ৬৬১৫)
এখানে পাগল বলতে শুধু উন্মাদ নয়, বরং যে বিবেক বিকল সে-ও অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আপনার মায়ের জন্য এটা একটি রহমত যে, আল্লাহ তাঁর ওপর বোঝা চাপিয়ে দেননি। তবে যদি তিনি কোনো ইবাদত করতে পারেন (যেমন ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা) তবে তা তাঁর জন্য নেকি হবে।
২. মেয়ে হিসেবে করণীয় কী?
উত্তর:
- সাধ্যমত শিক্ষা দেওয়া: যেহেতু তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে পারেন, মেয়েরা তাকে প্রতিদিন এ কালিমাটি বারবার বলার অভ্যাস করাতে পারে। এর বেশি চাপ দেওয়া ঠিক হবে না।
- নামাজের ক্ষেত্রে: যদি তিনি মেয়েদের সাথে দাঁড়িয়ে তাদের নড়াচড়া অনুকরণ করেন, তাহলে তা জায়েয। তিনি যা পারেন তাই করবেন, আল্লাহ তাঁর অক্ষমতা গ্রহণ করবেন।
ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি কুরআন মুখস্থ করতে পারে না, সে নামাজে যে কোনো জিকির পড়তে পারে, আর যদি কিছুই না পারে, তাহলে চুপ থাকবে।” (বাদায়িউস সানায়ি’- ১/২১২)
- দু‘আ করা: মেয়েরা বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দু‘আ করবে যেন মায়ের বিবেক উন্নতি হয় এবং ইবাদতের তাওফীক হয়।
- সম্মান ও সেবা: মা যা পারেন না, তার জন্য কখনো তাকে লজ্জা বা তিরস্কার করা যাবে না। বরং সন্তান হিসেবে তার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান বজায় রাখা ওয়াজিব।
- তাবলীগ ছাড়া অন্য কাজ: মায়ের যদি কোনো অসুবিধা হয় (যেমন খাওয়া-পরার সমস্যা), তা দেখভাল করা সন্তানের দায়িত্ব।
৩. ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন আছে কি?
উত্তর:
হ্যাঁ, অবশ্যই ডাক্তার দেখানো উচিত। এটি একটি ক্লিনিক্যাল ইস্যু হতে পারে – যেমন জন্মগত স্মৃতিভ্রংশ, অটিজম, বা নিউরোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার। অনেক সময় চিকিৎসার মাধ্যমে কিছুটা উন্নতি সম্ভব। কুরআন ও হাদীসে চিকিৎসা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন: “তোমরা চিকিৎসা করাও, কারণ আল্লাহ এমন কোনো রোগ দেননি যার নিরাময় দেননি।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৬৭৮)
তবে যদি এত বছর পরও কোনো উন্নতি না হয়, তবে অন্তত রোগটির ধরন জানা গেলে সন্তানেরা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে পারে। তাই একজন নিউরোলজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের শরণাপন্ন হওয়া মন্দ নয়। তবে শেষ পর্যন্ত যেহেতু এটি দীর্ঘদিনের অবস্থা, তাই চিকিৎসা কাজ না-ও করতে পারে; কিন্তু চেষ্টা করা জরুরি।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া:
- আপনার মা শরী‘আতের দৃষ্টিতে মা’তূহ হিসেবে বিবেচিত। তাঁর ওপর ইবাদত ফরয নয়, এবং আখিরাতে তাঁর হিসাব হবে না।
- মেয়ের করণীয়: সাধ্যমত শিক্ষা দেওয়া, বেশি চাপ না দেওয়া, দু‘আ করা এবং ভালোবাসা দিয়ে সেবা করা।
- চিকিৎসা: নিউরোলজিস্ট দেখানো obligatory না হলেও মুস্তাহাব (উত্তম)।
والله أعلم بالصواب