পরিবার থেকে আলাদা হয়ে একা থাকা কি গোনাহ হবে? আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ না রাখাও কি গোনাহ ?

Family Life · Hanafi

Questioner: Asma
Question Asked: 29 May 2026, 11:31 PM
Reviewed & Published: 29 May 2026, 11:47 PM
Views: 30
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

দুনিয়ায় যাদের জীবন সুন্দর করার জন্য মা বাপ থাকে না তাদের মাথার উপর হাত রাখার জন্য কেউই থাকে না!

আমার পিতা একজন বেহিসাবি মানুষ ছিলেন। ওনি কখনোই ওনার চলাফেরা নিয়ে চিন্তা করেননি। লাখ লাখ ঋন রেখে শোচনীয় অবস্থায় মারা গেছেন, লাশও আমাদের বাড়িতে উঠেনি!

ছোট থেকে ঘরে কোনোদিন শান্তি ছিল না! ঝগড়া অশান্তি, হাত তুলা, নোংরা, বিশ্রি ভাষা শুনে দেখেই বড় হয়েছি। বাবাও পরিপূর্ণ দায়িত্বশীল ছিলেন না মাও পরিপূর্ণ দায়িত্বশীল নন।
খোটা দেন, বয়স নিয়ে! বিয়ে, পর্দা নিয়ে, মায়ের, ভাইয়ের কাঁধে দায়িত্ব আছে বলে খোটা দেন। দায়িত্ব নিয়ে বিয়ে দেন না, তারা চায় তাদের ঘাড় থেকে যেন নেমে যাই যেকোনোভাবে, কারো হাত ধরে কেন চলে যাই না বলে । টাকা পয়সা খরচ করে বিয়ে শাদী আমার জন্য এতটুকু করতে রাজি নন, অনীহা আছে।
২০২১ থেকে নিজের খরচ নিজেই বহন করছি কিন্তু খাওয়া থাকা তাদের সাথে হয় বলে খোটা দেন, ঝগড়া হয়, গায়ে হাত তুলা হয়, নোংরা অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়। এই নোংরা ভাষা, এই অসম্মান নিয়ে আমার বেচে থাকতে কষ্ট হয়। আমি ছোট থেকে শুধু এই কারণে তীব্র বিষন্নতায় ভুগেছি, ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুমিয়ে কাটিয়েছি, মা বাবার সাথে ঘর থেকে বের হতে ভয় পেয়েছি, লজ্জা পেয়েছি, আতংকে থেকেছি। আজ আমার বয়স ২৩। আমাকে বাহিরের অনেক মানুষ পর্দা করি বলে প্রচন্ড সম্মান করে মাদরাসার শিক্ষক হিসেবেও সম্মান করেন । আজো আমার মা পাবলিক প্লেসে, রাস্তায় আমাকে নোংরা ভাষায় জোরে জোরে গালি গালাজ করেন, রাস্তায় চিৎকার করে গালি দেন আমি বাজাইরা খা***! আমার আত্মসম্মানে লাগে! আমার খুব মানসিক যন্ত্রণা হয়। আমার দুনিয়ায় বেচে থাকতে কষ্ট হয়।

আমি ছোটো থেকে সবসময় আশা করে এসেছি, একদিন সব ঠিক হবে। কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি। মোহাব্বত, দোয়া দিয়ে মানুষ পরিবর্তন হয় না। মানুষের স্বভাব পরিবর্তন হয়ত কখনোই হয় না।

আত্মীয় বা মাহরামদের কেউই মাথায় হাত রাখেননি। সব থেকে বড় সম্পর্ক টাকার সম্পর্ক। কেউ কেউ মুখে মুখে একটু আদর দেখায় কিন্তু প্রকৃত আদর কেউ করেননি। মানুষ আমার বিপদ দেখে ভয় পান। কথা বলার হাল টাল জিজ্ঞেসও কেউ করেন না। আমি কখনোই কোনো বিপদে কারো কাছে হাত পাতিনি তবুও তারা এরিয়ে চলেন, ভয় পান।
কারো সাথেই কথা হয় না। আমার এক চাচা ইদে প্রত্যেককে হাদিয়া দেন, কোটি টাকার মালিক অবস্থা সম্পন্ন মাসে মাসে ৭০/৮০ হাজার ইনকাম করা বিবাহিত (কাজিন) বোনদের শুনলাম ইদে ৩ হাজার করে শপিং খরচ দেন। আমার জন্যও দেন তবে তা ভাগে ১ হাজার।

বছরে একবার এই দেওয়া ছাড়া কোটিপতি চাচার সাথেও কোনো যোগাযোগ থাকে না। সেই সম্পর্ক নেই। আর তারা কিছু দিলে সেটা যেন ভিক্ষা দেন! যারা অবস্থা সম্পন্ন তাদের জন্য গিফট হলেও আমার জন্য অনুগ্রহ, লোক দেখানো মোহাব্বত! খুব স্পষ্টভাবে লোক দেখানো মোহাব্বত, দিয়েছে, দেয় এটা আমাদের আগেই সবাই জানে।

আমি ছোট থেকে কখনো অন্যের টাকার উপর লোভ, ভোগের আশা করি না কারোর উপর হক জমাই না, হক চাই না, নূন্যতম আশা করি না।

কিন্তু তাদের এই আচরণ আত্মসম্মানে লাগে। গরীব হতে, না খেয়ে থাকতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি আফসোস নেই। আমার আত্মীয়দের কেউই আমার বিয়ের দায়িত্ব তথা পাত্র খুঁজার দায়িত্ব নেননি হয়ত তার সবথেকে বড় কারণ আমি ইয়াতিম এবং আমার বাবার সম্পত্তি দূরে থাক লাখ লাখ টাকার ঋন বর্তমানে আছে ।

একা বাঁচা যায় না। দ্বীন নারীদের সাবলম্বী হতে উৎসাহিত করে না। পুরুষ/ মাহরাম বা অভিভাবক ব্যতীত জীবন অনেক কঠিন।

আমি কখনোই আজ অব্দি কোনোরূপ অবৈধ সম্পর্কে জড়াইনি। এটা আমার ফিতরাতে নেই। কখনো পারবোও না, নোংরামিতে জড়াতে! যেখানটায় সম্মান নেই অন্য কোনো মাধ্যমে বিয়ের মাধ্যমে অভিভাবক বানানোর উপায় আমার জানা নেই। পরিবার ব্যতীত অন্য কোনো মাধ্যমেই সম্মান নেই আর আমাদের দ্বীনদার মুরুব্বিরা নওমুসলিমদের এসবক্ষেত্রে দেখার জন্য থাকলেও জন্মগত মুসলিমদের উপর ইনসাফ করার জন্য কেউই নেই। আর ব্যক্তিত্ব ওয়ালা মানুষ ছাড়া যে কাউকে বিয়ে করে নেওয়াটাও আমার জন্য সহজ নয়।

এমতাবস্থায়, নিজের হায়া, চরিত্র, পর্দা মেইনটেইন করে আমি যদি এভাবে পড়ে থেকে মানসিক যন্ত্রণায়, মৃত্যুর জন্য ছটফট না করে। পরিবারের কথা অনুযায়ী তাদের থেকে আলাদা হয়ে, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ বেছে নেই। একা বাঁচি তাহলে কি আমার গুনাহ হবে? আর বছরে একবার নিজ থেকে কল দেওয়া আত্মীয় মাহরামের হাদিয়ার নামে লোক অনুগ্রহ নেওয়া থেকে বিরত থাকি তা কি আমার জন্য অহংকার হবে? যদি তাদের একদিনের কলও রিসিভ না করি, তাদের কোনোরূপ লোক দেখানো অনুগ্রহ না নেই, আমার কি গুনাহ হবে?

আমি একা বাঁচতে গেলে, সমাজ আমায় বাকা চোখে দেখবে, কটু মন্দ কথা বলবে। কিন্তু আমি এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো, নিজের আখিরাত কবরের জন্য সবর করতে পারবো। আমার বাঁচতে কষ্ট হবে না।

আল্লাহর দ্বীন কি আমায় সমর্থন করে? আমি তাদের থেকে আলাদা হয়ে গেলেও তাদের মনে কোনোদিন মায়া, আফসোস থাকবে না, ফিরে আসতে বলার মতোও কেউ নেই আমার, তারা খুশি হবেন। আর যদি সামান্য অখুশি হন তার পেছনে শুধু মাত্র রিজন থাকবে সমাজ তাদের কী বলবে!

Answer

ফতোওয়া
আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও সংবেদনশীল। ইসলাম সব ধরনের নোংরামি, গালিগালাজ, মা-বাবার অত্যাচার এবং আত্মীয়দের দ্বিমুখী আচরণকে নিন্দা করে। নিম্নে প্রশ্নের উত্তর ধারাবাহিকভাবে দেওয়া হলো:


১. পরিবার থেকে আলাদা হয়ে একা থাকা কি গুনাহ হবে?

আপনার বর্ণনায় স্পষ্ট যে, আপনার মা আপনাকে প্রকাশ্যে গালিগালাজ ও মানসিক নির্যাতন করেন, এবং পরিবারে কোনো শান্তি নেই। এই অবস্থায় যদি আপনার দ্বীন (পর্দা, চরিত্র, নামাজ) রক্ষার্থে এবং মানসিক সুস্থতার জন্য আলাদা থাকা জরুরি মনে করেন, তবে তা জায়েয, বরং উত্তম হবে

  • কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
    “আর যদি তারা (মা-বাবা) তোমার সাথে জোর করে শিরক করতে চায়, তবে তাদের আনুগত্য করো না। আর দুনিয়াতে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করো।” (সূরা লুকমান: ১৫)
    অর্থাৎ, মা-বাবার অত্যাচার বা পাপের আদেশ সহ্য করতে হবে না।

  • ইমাম ইবনে আবেদিন (রহ.) বলেছেন:
    “যদি মা-বাবা সন্তানকে নাজায়েয কাজে বাধ্য করে বা তার দ্বীনি ও দুনিয়াবি ক্ষতি করে, তবে সন্তানের জন্য তাদের থেকে আলাদা হওয়া বৈধ।” (রাদ্দুল মুহতার, ৮/৪৯১)

  • আপনার জন্য সুপারিশ:
    আপনি যদি নিজের উপার্জন দিয়ে থাকতে পারেন, পর্দা ও চরিত্র রক্ষা করে চলতে পারেন, তাহলে আলাদা থাকা গুনাহ নয় বরং আপনার ঈমান ও ইজ্জত রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হবে। তবে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে শুধু দূরত্ব বজায় রাখা এবং মা-বাবার সাথে সদ্ব্যবহার (ফোনে খোঁজখবর নেওয়া) চালিয়ে যাওয়া ভালো।


২. আত্মীয়দের লোক দেখানো হাদিয়া (অনুগ্রহ) না নেওয়া কি অহংকার?

আপনার চাচার আচরণ স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক এবং লোক দেখানো। আপনি যদি এই হাদিয়া গ্রহণ করলে মানসিক কষ্ট বা অপমান বোধ করেন, তাহলে তা গ্রহণ না করা অহংকার নয়, বরং আত্মসম্মান রক্ষার অংশ

  • হাদিসে এসেছে:
    “যে ব্যক্তি মানুষের কাছে কিছু চায় না, আল্লাহ তাকে অমুখাপেক্ষী রাখেন।” (বুখারি: ১৪২৭)
    আপনি যেহেতু কারো কাছে হাত পাতছেন না, বরং লোক দেখানো অনুগ্রহ এড়িয়ে চলছেন, তাই এটি প্রশংসনীয়।

  • ইসলামে সতর্কতা:
    হাদিয়া গ্রহণ করা বৈধ, কিন্তু যদি তা অহংকার বা মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়, তবে তা পরিহার করাই উত্তম। আপনার জন্য অন্যের টাকার লোভ না রাখা ও নিজের উপার্জনে সন্তুষ্ট থাকা বড় গুণ।


৩. আত্মীয়দের সাথে যোগাযোগ না রাখার গুনাহ?

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। তবে যদি তারা আপনার প্রতি সুস্পষ্ট অত্যাচার করে, আপনাকে মানসিকভাবে ধ্বংস করে, এবং সম্পর্ক রক্ষা করা আপনার দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে আপনার জন্য তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা জায়েয

  • হাদিসে এসেছে:
    “সিলাতুর রাহিম (আত্মীয়তার সম্পর্ক) জান্নাতে প্রবেশ করে।” (মুসলিম: ২৫৫৮)
    কিন্তু এটি সেসব আত্মীয়দের জন্য যারা সুসম্পর্ক বজায় রাখে। যদি আত্মীয়রা শত্রুতা ও নির্যাতন করে, তবে তাদের থেকে দূরে থাকা জায়েয।

  • ইমাম কাসানী (রহ.) বলেছেন:
    “যদি আত্মীয়রা স্পষ্টতই ক্ষতি করে, তবে তাদের সাথে সম্পর্ক বজায় না রাখার অনুমতি আছে।” (বাদায়িউস সানায়ি, ৪/১১৪)

পরামর্শ: বছরে একবার বা ঈদে শুধু ফোন করে কল্যাণ কামনা করা যথেষ্ট। তাদের কাছ থেকে কোনো লোক দেখানো অনুগ্রহ গ্রহণ না করলে গুনাহ হবে না।


৪. একা বাঁচার ক্ষেত্রে সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি

সমাজের কথা ভেবে নিজের দ্বীন ও মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করা উচিত নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন:
“মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে লোকদের ভয় করেন না।” (তিরমিজি: ২৩৫৪)

  • আপনার জন্য পরামর্শ:
    • নিজের পর্দা ও চরিত্র রক্ষা করে চলবেন।
    • যদি সম্ভব হয়, কোনো দ্বীনি মাহরাম (যেমন মাদরাসার কোনো বিশ্বস্ত মুদাররিস) এর মাধ্যমে বিয়ের ব্যবস্থা করুন।
    • একা থাকলে নিজের নামাজ, জিকির ও কুরআন তিলাওয়াত বাড়িয়ে দিন।
    • দোয়া করতে থাকুন— “রব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিন” (সূরা ফুরকান: ৭৪)।

চূড়ান্ত ফতোওয়া

১. পরিবার থেকে আলাদা হয়ে একা থাকা আপনার জন্য জায়েয ও উত্তম, বরং এটি আপনার দ্বীন ও মনের জন্য কল্যাণকর।
২. আত্মীয়দের লোক দেখানো হাদিয়া না নেওয়া অহংকার নয়; এটি আত্মসম্মান ও দ্বীন রক্ষার অংশ।
৩. আত্মীয়দের সাথে ন্যূনতম যোগাযোগ (যেমন ঈদে ফোন) রাখা ওয়াজিব, তবে তাদের কল না ধরলে বা হাদিয়া না নিলে গুনাহ হবে না, কারণ তারা আপনার প্রতি অত্যাচারী।
৪. আপনার বেঁচে থাকা ও আখিরাতের জন্য সবর করা খুবই সওয়াবের কাজ। নবী (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি সবর করে, আল্লাহ তাকে সবর দান করেন।” (বুখারি: ১৪৬৯)

আল্লাহ আপনার যন্ত্রণা লাঘব করুন এবং উত্তম পথ দেখান। আমিন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.