পরিবার পড়াশোনা করার জন্য অস্ট্রেলিয়া যাওযার ব্যাপারে চাপ দিচ্ছে, এখন করণীয় কি?
Halal and Haram · Hanafi
Question
একজন বোন এর পক্ষ থেকে আমি প্রশ্ন টা করছি..
বোন এর ব্যাপারে বললে মেয়েটা ভালো দ্বীনদার বর্তমান এ একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। কলেজ লাইফ থেকে সে দ্বীন খুজে পেয়েছিল এখন মা শা আল্লাহ দ্বীনের উপরে আছে বলেই জানি।তবে তার ফ্যামিলি ওতটা দ্বীন এর বুঝ রাখেন না। তবে তার দ্বীন পালনে কখনো তেমম বাধা হয়ে দাড়ায় নি। তো বোনটি মা শা আল্লাহ অনেক মেধাবি একাডেমিক এবং অনলাইন মাদ্রাসায় ও যুক্ত আছেন এবং অগ্রগতি খুব ভালো। সে বাবা -মায়ের চাপের ভার্সিটি তে ভর্তি হোন। দীন এর বুঝ হওয়ার পর ফ্রি মিক্সিং এ জড়াতে চায় নি বলে ভার্সিটি তে এডমিশন নিলেও জাস্ট পরিক্ষাগুলো দিয়ে থাকেন তিনি।এর পাশাপাশি পরিবার এর লোক তাকে বাহিরে পাঠাতে চান যেটা সে কোনোভাবেই চায় না কারন সে সদ্য দীন এর ফেরা একজন নারী। অন্যদেশে গিয়ে তিনি তিনের ঈমান হারা করতে চান না বলে খুবই সংকীত। সে আশংকা করছে যে তার দীন ক্ষতিগ্রস্থ হবে...তাই তার জন্য এভাবে একা বাহিরের দেশে পাড়ি জমানো কোনোভাবেই সম্ভব না। উল্লেখ্য একটি ঘটনা হচ্ছে এরই মধ্যে নাকি সে পরিবার এর চাপে IELTS এক্সাম দিয়েছে আর যার ফলাফল ও খুব ভালো...সে চেয়েছিল দেশে কোনো একটা কোচিং এ ঢুকে যাবে শিক্ষিকা হিসেবে যাতে তাকে বাহিরে যাওয়ার জন্য প্রেসার না করে তার পরিবার। কিন্তু তার বাবা নাকি তাকে না জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার জন্য ভিসা এপ্লাই করে দিয়েছে। কিন্তু মেয়ে তার ফ্যামিলিকে জানাতেও পারছেন না যে, সে তার দ্বীন কে এভাবে বিপদে ফেলতে চায় না আর সে বাহিরে কোনোভাবেই যেতে চাচ্ছে না। কিন্তু এই কথা ফ্যামিলিকেও বুঝাতে পারছেন না।এখন তার মনে কোনো কোনো সময় এমন কথাও আসছে আল্লাহ কি এতেই কল্যান রাখছে কিনা।।
সব কিছুর বিবেচনায় উস্তাদ থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলাম তার কি করা উচিৎ?.. উত্তম পরামর্শ দিয়ে তার নানাবিধ চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে সহযোগিতা করুন।ইসলামে এই ব্যাপারে দিকনির্দেশনা কি....
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী, বোনটি দ্বীনদার, মেধাবী এবং দ্বীন পালনে সচেতন। অন্যদিকে তার পরিবার দ্বীনের ব্যাপারে তেমন সচেতন না হলেও ইতোমধ্যে তাকে অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানোর জন্য চাপ দিচ্ছে এবং ভিসা আবেদনও করে দিয়েছে। বোনটি ভয় পাচ্ছেন যে বিদেশে একাকী গেলে তার দ্বীন ও ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিম্নে ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো:
১. পিতা-মাতার আনুগত্যের সীমা
ইসলামে পিতা-মাতার আনুগত্য ফরজ, তবে তা কেবল বৈধ ও ভালো কাজের ক্ষেত্রে। যদি পিতা-মাতা কোনো এমন কাজের আদেশ দেন যা আল্লাহর নাফরমানি বা দ্বীনের ক্ষতির কারণ হয়, তবে সেই আদেশ মানা জায়েজ নয়।
- হাদিস: "আল্লাহর নাফরমানিতে সৃষ্টির আনুগত্য নেই।" (সহিহ বুখারি: ৭২৫৭)
- ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: "পিতা-মাতার আদেশ মানা ওয়াজিব, তবে যদি তা হারাম কাজে উৎসাহিত করে, তবে তা মানা যাবে না।" (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৬/৩১৩)
এক্ষেত্রে বোনটির পিতা-মাতার চাহিদা তাকে বিদেশে একা পাঠানো, যা সরাসরি তার দ্বীনের জন্য হুমকি। তাই এই আদেশ মানা জরুরি নয়।
২. নারীর একাকী সফরের বিধান
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোনো নারী তার স্বামী বা মাহরাম পুরুষ ছাড়া দূরবর্তী সফর (সফরে সফর-দূরত্ব যা প্রায় ৪৮ মাইল বা ৭৮ কিমি) করতে পারে না। এটি একটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা।
- কুরআন: "আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং জাহেলিয়াতের যুগের মতো প্রদর্শন করো না।" (সুরা আহজাব: ৩৩)
- হাদিস: "কোনো নারী তার মাহরাম ছাড়া (দূরবর্তী) সফর করবে না।" (সহিহ বুখারি: ১৮৬২)
- ইমাম কাসানী (রহ.) ‘বাদায়িউস সানায়ি`-এ (২/২৬১) বলেন: "মাহরাম ছাড়া নারীর সফর হারাম।"
- ইবনু আবেদিন (রহ.) ‘রাদ্দুল মুহতার’ (৩/৫০৫)-এ বলেন: "যদি নারী মাহরাম ছাড়া সফর করে, তবে সে গুনাহগার হবে।"
এখানে বোনটির অস্ট্রেলিয়া যাত্রা দীর্ঘ সফর এবং তার সাথে কোনো মাহরাম নেই। তাই ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৩. দ্বীন রক্ষার গুরুত্ব
যদি কোনো কাজ দ্বীনের জন্য হুমকি হয়, তবে তা থেকে বেঁচে থাকা ফরজ। আল্লাহ বলেন:
- "আর তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে ফেলো না।" (সুরা বাকারা: ১৯৫)
- "যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে হিজরত করবে, সে পৃথিবীতে অনেক আশ্রয়স্থল ও প্রশস্ততা পাবে।" (সুরা নিসা: ১০০)
বোনটি যদি বিশ্বাস করে যে বিদেশে গেলে তার দ্বীন নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাহলে তার জন্য যাওয়া জায়েজ নয়। বরং সে দ্বীন রক্ষার জন্য অন্য কোনো বৈধ পথ অবলম্বন করবে।
৪. আল্লাহর কল্যাণের ধারণা
মনে যাতে কল্যাণের ধারণা আসে, তা শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে পারে। আল্লাহ বলেন:
- "শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়।" (সুরা বাকারা: ২৬৮)
যদি কোনো কাজের মধ্যে দ্বীনের জন্য সুস্পষ্ট ক্ষতি থাকে, তবে তাতে কল্যাণ আশা করা ঠিক নয়। বরং আল্লাহর কাছে তাওয়াক্কুল করে দ্বীন রক্ষার পথ বেছে নেওয়া উচিত।
৫. বাস্তব সমাধান
ক. পরিবারকে বোঝানো:
- নরম ও হিকমতের সাথে পরিবারকে বোঝান যে তিনি বিদেশে একা যেতে পারেন না, কারণ ইসলামে নারীর জন্য মাহরাম ছাড়া সফর নিষিদ্ধ।
- বলেন যে তিনি দেশে থেকেই শিক্ষিকা হিসেবে কাজ করতে চান এবং দ্বীনি শিক্ষা চালিয়ে যেতে চান।
- সম্ভব হলে কোনো আলেম বা দ্বীনদার ব্যক্তির মাধ্যমে পরিবারকে বুঝানোর চেষ্টা করুন।
খ. দ্বীনি বিকল্প:
- দেশের কোনো দ্বীনি মাদ্রাসা বা মহিলা মাদ্রাসায় শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করুন।
- অনলাইন মাধ্যমেও দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ও শিক্ষাদান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
গ. দোয়া ও ইস্তেখারা:
- আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করুন এবং দ্বীনের উপর অটল থাকার জন্য সাহায্য চান।
- সালাতুল ইস্তেখারা পড়ুন এবং আল্লাহর কাছে ভালো পথ দেখাতে বলুন।
৬. বিশেষ সতর্কতা
- কখনো কখনো শয়তান ‘আল্লাহর কল্যাণ’ নামে মানুষকে পথভ্রষ্ট করে। তাই নিজের দ্বীনের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেভাবে সাবধান থাকুন।
- যদি পরিবার চাপ সৃষ্টি করে, তবে বিনয়ের সাথে জানিয়ে দিন যে এর ফলে আপনার ঈমান বিপদে পড়বে। যদি তারা না শোনে, তবে দ্বীন রক্ষায় আপনাকে পিতা-মাতার এই আদেশ অমান্য করার অনুমতি আছে।
৭. সংশ্লিষ্ট হানাফি কিতাবের রেফারেন্স
- ফাতাওয়া উসমানী (১/৩২০): পিতা-মাতার আনুগত্য কেবল বৈধ কাজে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২২৫): নারীর একাকী সফর নিষিদ্ধ।
- রাদ্দুল মুহতার (৪/২০৬): দ্বীনের হেফাজতের জন্য পিতা-মাতার অবাধ্যতা জায়েজ।
- বাহিশতি জেওর (৮ম অধ্যায়): নারীর সফর ও পর্দা সম্পর্কিত বিধান।
উপসংহার
বোনটি অবশ্যই অস্ট্রেলিয়া যাওয়া থেকে বিরত থাকবেন। দ্বীনের হেফাজতই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। পরিবারকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন, কিন্তু যাওয়ার জন্য চাপ দিলেও যাবেন না। আল্লাহ তাআলা দ্বীনের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন।
والله أعلم بالصواب۔