পিতার জন্য তার সন্তানদের মধ্যে হেবা বণ্টনে সমতা রক্ষা করা সংক্রান্ত।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: English Grammar
Question Asked: 30 May 2026, 08:45 AM
Reviewed & Published: 30 May 2026, 01:51 PM
Views: 22
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

একজন ৮০ বছরের বয়স্ক মানুষের ৫ জন পুত্র সন্তান এবং ৩ জন মেয়ে রয়েছে। ছেলে মেয়েরা উভয়েই বিবাহিত এবং প্রত্যেকের ছেলে মেয়ে এবং কারো কারো ছেলে মেয়ে এবং নাতি নাতনি রয়েছে। উক্ত মানুষটির নিজ স্ত্রী বেঁচে নেই। উনার এক পুত্র সন্তান মারা গিয়াছে এবং উক্ত সন্তান এক ছেলে এবং এক মেয়ে রেখে গেছেন। মেয়েছি বিবাহিত এবং তাঁর দুই সন্তান রয়েছে, আর ছেলেটির বয়স ১৬/১৭ বছর। উক্ত ৮০ বছরের বয়স্ক লোকটি তাঁর জমি বিক্রি করে তাঁর মৃত্যু বরন করা ছেলেটির ছেলেকে এক লক্ষ টাকা এবং তার অন্য দুই ছেলের এক ছেলের এক ছেলেকে এক লক্ষ টাকা এবং অন্য এক ছেলের দুই ছেলেকে দুই লক্ষ টাকা দিয়েছে। অর্থাৎ তিনি তার ৪ নাতিকে ৪ লক্ষ্য টাকা দিয়াছে। উক্ত নাতিদের চেয়ে তার গড়িব আরো নাতি রয়েছে। এমতাবস্থায় উনি যা করছেন তা শরিয়া মোতাবেক কতটুকু সঠিক কাজ করছেন? উল্লেখ্য যে সকল নাতিদের টাকা দিয়াছেন তাদের বিশেষ কোন প্রয়োজন নেই টাকার যেমন চিকিৎসা বা অতি প্রয়োজনীয় কোন চাহিদা পূরণ করতে।

Answer

উত্তর:
প্রশ্নে বর্ণিত ব্যক্তির কাজটি শরিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক নয়। কারণ এটি সন্তান-সন্তান ও নাতি-নাতনিদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. হেবা (উপহার) ও সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার

ইসলাম সন্তানদের মধ্যে হেবা (জীবদ্দশায় দেওয়া উপহার) বণ্টনে ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
"তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২৫৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৬২৩)

হানাফী ফিকহের অনুসরণীয় গ্রন্থ রদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ আছে:
"পিতার জন্য তার সন্তানদের মধ্যে হেবা বণ্টনে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব। কোনো সন্তানকে অন্যদের চেয়ে বেশি দেওয়া মাকরুহ তাহরীমী (নিষিদ্ধের কাছাকাছি) এবং গুনাহের কাজ।" (রদ্দুল মুহতার: ৫/৬৯৪)

এখানে উক্ত ব্যক্তি তার ৪ জন নাতিকে (শুধুমাত্র কিছু পুত্রের পুত্র) মোট ৪ লক্ষ টাকা দিয়েছেন, অথচ তার আরো অনেক নাতি-নাতনি রয়েছে (মেয়েদের সন্তানসহ)। তিনি তাদের কাউকে কিছু দেননি। এটি স্পষ্টতই বৈষম্য এবং শরিয়তসম্মত নয়।

২. নাতি-নাতনিদের মধ্যে সমতা অপরিহার্য

যদি কেউ সন্তানদের পরিবর্তে নাতি-নাতনিদের উপহার দিতে চান, তাহলে তাদের মধ্যেও সমতা রক্ষা করতে হবে। ফতোয়ায়ে উসমানী (১/৩৯৪) এবং ফাতাওয়ায়ে শামী (৫/৬৯৪)-তে উল্লেখ আছে:
"নাতি-নাতনিরাও সন্তানের মতোই উপহারের ক্ষেত্রে সমতার অধিকারী। তাদের মধ্যে বৈষম্য করাও নাজায়েজ।"

এখানে তিনি শুধুমাত্র ৪ জন নাতিকে টাকা দিয়েছেন, অথচ তার আরো নাতি-নাতনি রয়েছেন (যেমন মৃত পুত্রের কন্যা ও তার সন্তান, অন্যান্য পুত্রের কন্যা, মেয়েদের সন্তান ইত্যাদি)। এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে জুলুম (অন্যায়)।

৩. প্রয়োজন ছাড়া বিশেষ কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া

প্রশ্নে উল্লেখ আছে যে, যাদের টাকা দেওয়া হয়েছে তাদের বিশেষ কোনো প্রয়োজন নেই (যেমন চিকিৎসা বা অতি জরুরি প্রয়োজন)। তাই অগ্রাধিকার দেওয়ার কোনো শরয়ি কারণ নেই। হাদীসে এসেছে:
"তোমাদের সন্তানদের মধ্যে উপহার বণ্টনে সমতা রক্ষা করো। যদি আমি কাউকে অগ্রাধিকার দিতাম, তবে মেয়েদেরকে অগ্রাধিকার দিতাম।" (বায়হাকী, শুআবুল ঈমান: ৮৬১১)

৪. মৃত পুত্রের সন্তানদের প্রতি বিধান

মৃত পুত্রের এক ছেলে (১৬/১৭ বছর) ও এক মেয়ে (বিবাহিত ও দুই সন্তানের মা) রয়েছে। তিনি শুধুমাত্র ওই ছেলেকে ১ লক্ষ টাকা দিয়েছেন, কিন্তু মেয়েকে কিছু দেননি। অথচ নবী করীম (সা.) বলেছেন:
"যে ব্যক্তি তার সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করবে, তার বিরুদ্ধে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৫৪২)

মৃত পুত্রের সন্তানরাও তার নাতি-নাতনি, এবং তাদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা উচিত ছিল। যদি তিনি তাদের কাউকে দিতে চান, তাহলে ছেলে ও মেয়ে উভয়কে সমানভাবে দিতে হতো, অথবা সবার মধ্যে সমতা বজায় রাখতে হতো।

৫. নিজের জীবিত সন্তানদের অধিকার

উক্ত ব্যক্তির ৫ পুত্র ও ৩ কন্যা জীবিত। তিনি তাদের কিছু না দিয়ে শুধু নাতিদের দিচ্ছেন। এটি أيضاً সঠিক নয়, কারণ সন্তানদের মধ্যে সমতা রক্ষা করা জরুরি। তবে তিনি চাইলে সন্তানদের রেখে নাতিদেরও দিতে পারেন, কিন্তু সেক্ষেত্রে সবার (সন্তান ও নাতি-নাতনি) মধ্যে ন্যায়বিচার করতে হবে। ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী-তে এসেছে:
"পিতার জন্য সন্তানদের মধ্যে হেবা বণ্টনে সমতা রক্ষা করা ওয়াজিব। কোনো সন্তানকে বেশি দিলে তা মাকরুহ।" (ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী: ৪/৪০২)

৬. বয়স ও অসুস্থতার প্রভাব

যেহেতু তার বয়স ৮০ বছর, তাই এটি মারাযুল মাউত (মৃত্যুশয্যা) হওয়ার আশঙ্কা থাকে। মারাযুল মাউতে দেওয়া হেবা উইল (ওসিয়ত) হিসেবে গণ্য হয়, যা মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি নাজায়েজ এবং উত্তরাধিকারীদের জন্য ওসিয়ত করা নিষিদ্ধ (তবে অ-উত্তরাধিকারীর জন্য এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত জায়েজ)। এখানে তিনি নাতিদের দিচ্ছেন, যারা তার ওয়ারিস নয় (জীবিত সন্তান থাকার কারণে নাতিরা সরাসরি ওয়ারিস হয় না)। তাই তিনি চাইলে এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত নাতিদের দিতে পারেন, কিন্তু তারপরও সমতা রক্ষা করতে হবে। তবে তিনি এক-তৃতীয়াংশের বেশি দিলে বা বৈষম্য করলে তা বৈধ হবে না।

৭. করণীয়

উক্ত ব্যক্তির উচিত:

  • তিনি যদি নাতি-নাতনিদের উপহার দিতে চান, তাহলে সব নাতি-নাতনিকে (ছেলে-মেয়ে, পুত্রের সন্তান ও কন্যার সন্তান) সমানভাবে দেবেন।
  • অথবা তিনি তার জীবিত সন্তানদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দিতে পারেন। স্ত্রী মারা গেলে তার সম্পদে সন্তানদের অংশও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
  • ইতিমধ্যে দেওয়া টাকা ফেরত নেওয়া জরুরি নয়, বরং বাকি নাতি-নাতনিদের তাদের প্রাপ্য সমপরিমাণ টাকা দিয়ে সমতা আনতে হবে। সম্ভব না হলে তিনি তওবা করবেন এবং ভবিষ্যতে এমন বৈষম্য থেকে বিরত থাকবেন।

সারসংক্ষেপ:
উক্ত ব্যক্তির কাজ শরিয়তসম্মত নয়। তিনি শুধু ৪ জন নাতিকে টাকা দিয়ে বাকি নাতি-নাতনি ও নিজের সন্তানদের বঞ্চিত করেছেন, যা নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ। তার উচিত তওবা করা এবং সমতা বিধান করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে চলার তাওফীক দান করুন। (আমীন)

উল্লেখ্য:

  • কোরআন: সূরা নিসা (৪:১১-১২) ও সূরা বাকারা (২:১৮২)
  • হাদীস: সহীহ বুখারী ও মুসলিম (সন্তানের মধ্যে ন্যায়বিচার)
  • হানাফী ফিকহ: রদ্দুল মুহতার (৫/৬৯৪), ফাতাওয়ায়ে আলমগিরী (৪/৪০২), ফতোয়ায়ে উসমানী (১/৩৯৪), ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৫৬)

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.