পিতা মাতার এবং নিজ সন্তান এর সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারীর ইবাদত, আল্লাহ গ্রহণ করবেন, না সব বাতিল হয়ে যাবে ?

Family Life · Ahle Hadith / Salafi

Questioner: Masud
Question Asked: 31 May 2026, 01:06 AM
Reviewed & Published: 31 May 2026, 02:02 AM
Views: 41
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

পিতা মাতার এবং নিজ সন্তান এর সাথে সম্পর্ক ছিন্নকারী ইবাদত, আল্লাহ গ্রহণ করবেন, না সব বাতিল হয়ে যাবে ?
সম্পর্ক ছিন্নকারী কখনো কি আল্লাহর রহমত পাবে, না সারা জীবনের জন্য জাহান্নামে থাকবে কুরআন হাদিসে কি বলে?

Answer

উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ ওয়াসসালাতু ওয়াসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ।

আপনার প্রশ্নের মূল বিষয় দুটি:

  1. পিতা-মাতা ও সন্তানের সাথে সম্পর্কচ্ছেদকারী ব্যক্তির ইবাদত কি আল্লাহ গ্রহণ করবেন, নাকি সব বাতিল হয়ে যাবে?
  2. এমন ব্যক্তি কি কখনো আল্লাহর রহমত পাবে, নাকি চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে?

কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে এবং সালাফি আকীদার (আহলে হাদীস) ভিত্তিতে এই বিষয়ে স্পষ্ট বিধান নিচে প্রদত্ত হলো।


১. সম্পর্কচ্ছেদকারীর ইবাদতের অবস্থা

রক্তসম্পর্ক ছিন্ন করা (কাতিআর রাহিম) কবীরা গুনাহ। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তার সকল ইবাদত বাতিল বা অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে। মূলনীতি হলো:

  • ইবাদতের মৌলিক শুদ্ধতা (যেমন নামায, রোজা) ফরয হিসেবে আদায় হলে তা আদায় হয়ে যায়। কিন্তু পূর্ণ সওয়াব ও কবুলিয়াত (আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্যতা) নির্ভর করে তাকওয়া ও গুনাহ থেকে দূরত্বের উপর।
  • কবীরা গুনাহের কারণে সমস্ত ইবাদত নষ্ট হয়ে যায় না, যতক্ষণ না ব্যক্তি শিরক বা কুফরী করে। তবে কবীরা গুনাহ ইবাদতের সওয়াব কমিয়ে দেয় এবং কবুলের পথে বাধা সৃষ্টি করে।

প্রমাণ:

  • কুরআনে আল্লাহ বলেন:
    "হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা: ১৫৩) – এখানে নামায ফরয হিসেবে আদায় করতে বলা হয়েছে, গুনাহগারের নামায বাতিল হয় না বরং তা তার জন্য কল্যাণকর।
  • হাদীসে এসেছে: "যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৫৫৬)
    • ইমাম নববী (রহ.) বলেন: এর অর্থ হলো, সে অবিলম্বে জান্নাতে যাবে না, বরং প্রথমে জাহান্নামে শাস্তি ভোগ করবে। অথবা এটি একটি সতর্কবাণী যে, এই গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় মৃত্যু হলে জান্নাতের জন্য অযোগ্য।
  • শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রহ.) বলেন:
    "কবীরা গুনাহ করলে বান্দার নেক আমল বাতিল হয় না, বরং তা কমে যায়। তবে তাওবা করলে আল্লাহ তা ক্ষমা করেন।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ১০/৪৫৫)
  • শাইখ ইবন উসাইমীন (রহ.) বলেন:
    "আত্মীয়তা ছিন্নকারীর ইবাদত সহীহ হলেও তার সওয়াব পূর্ণ হয় না। বরং তা হ্রাস পায়। তবে ফরয ইবাদত আদায় হয়ে যায়, এবং তাকে শাস্তি দেওয়া হবে গুনাহের কারণে।" (শারহুল মুমতি), ৬/২৫৫)

সারকথা: সম্পর্কচ্ছেদকারীর ইবাদত সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয় না, কিন্তু তার সওয়াব ও কবুলিয়াত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাকে তাওবা ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে হবে।


২. সম্পর্কচ্ছেদকারী কি চিরস্থায়ী জাহান্নামে যাবে?

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা অনুযায়ী, কোন মুসলিম চিরস্থায়ী জাহান্নামে থাকবে না, যদি না সে শিরক বা কুফরী করে মৃত্যুবরণ করে। আত্মীয়তা ছিন্ন করা কবীরা গুনাহ হলেও তা কুফরী নয়।

প্রমাণ:

  • কুরআনে আল্লাহ বলেন:
    "নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শিরক করাকে ক্ষমা করেন না। আর এছাড়া (অন্যান্য গুনাহ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।" (সূরা নিসা: ৪৮)
    • ইমাম তাবারী (রহ.) ব্যাখ্যা করেন: শিরক ছাড়া অন্য সব গুনাহ আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, আর চাইলে শাস্তি দিয়ে পরে জান্নাতে নিয়ে যেতে পারেন।
  • হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
    "যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান আছে, সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৪)
  • শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.) বলেন:
    "আত্মীয়তা ছিন্ন করা হারাম ও কবীরা গুনাহ। তবে এর কারণে ব্যক্তি জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না, যদি সে মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। বরং তার গুনাহের পরিমাণ শাস্তি ভোগ করে পরে জান্নাতে যাবে। কিন্তু যদি তাওবা না করে মরে, তবে আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন বা শাস্তি দিতে পারেন।" (ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব)

সতর্কতা: আত্মীয়তা ছিন্নকারী যদি অহংকার ও বিদ্বেষের সাথে এই গুনাহে লিপ্ত থাকে এবং তাওবা না করে, তবে তাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। হাদীসে এসেছে:
"তিন ব্যক্তির সাথে আল্লাহ কিয়ামতে কথা বলবেন না, তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। তাদের একজন হলো আত্মীয়তা ছিন্নকারী।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০৮)

তবে এটি শাস্তির সতর্কবাণী, চিরস্থায়ী জাহান্নামের নয়। চিরস্থায়ী জাহান্নাম কেবল মুশরিক ও কাফিরদের জন্য।


চূড়ান্ত ফয়সালা

  1. ইবাদতের গ্রহণযোগ্যতা: সম্পর্কচ্ছেদকারীর ফরয ইবাদত (যেমন নামায, রোজা) সহীহ হলেও তার সওয়াব ও কবুলিয়াত পূর্ণ নয়। তাকে তাওবা ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে হবে। সমস্ত ইবাদত বাতিল হয়ে যাওয়ার মতো কথা ভুল।
  2. জাহান্নামের শাস্তি: যদি সে তাওবা না করে এবং মুসলিম অবস্থায় মরে, তবে সে সাধারণ মুমিনদের মতো চিরস্থায়ী জাহান্নামে যাবে না। বরং তার গুনাহের শাস্তি ভোগ করে একদিন জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে অবিলম্বে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বঞ্চিত হবে, যেমন হাদীসে বলা হয়েছে।

উপসংহার: সম্পর্কচ্ছেদ একটি ভয়াবহ গুনাহ, যা রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তবে আশা করা যায় যে, যদি ব্যক্তি তাওবা করে ও সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন এবং তার ইবাদত কবুল করবেন। এ ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে কঠিন সতর্কবাণী থাকলেও আল্লাহর রহমত তাঁর গজবের উপর বিজয়ী। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত দ্রুত তাওবা করা এবং আত্মীয়দের সাথে সদাচরণ শুরু করা।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.