নবী সা. কে দাড়িয়ে সালাম প্রদান করা কি জায়েয?
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
Answer
ইসলামের দৃষ্টিতে দূরবর্তী স্থান থেকে নবী করীম (সা.)-এর প্রতি দাঁড়িয়ে সালাম প্রদানের বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নটি হলো: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে দাঁড়িয়ে সালাম প্রদান করা ইসলামের দৃষ্টিতে কী? অর্থাৎ, দূর থেকে (যেমন মসজিদে নববীতে না গিয়ে) যখন কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম পাঠায়, তখন দাঁড়ানো জায়েজ কি না?
হানাফী মতে বিস্তারিত উত্তর
হানাফী মতে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম পাঠানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং তা সর্বাবস্থায় মুস্তাহাব (প্রিয়)। তবে দাঁড়িয়ে সালাম পাঠানোর ক্ষেত্রে শরী‘আতের দৃষ্টিভঙ্গি নিম্নরূপ:
১. সালাম পাঠানোর মূল বিধান
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম পাঠানো কুরআন ও সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ ۚ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
(সূরা আহযাব, ৩৩:৫৬)
"নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দুরূদ পাঠান। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার প্রতি দুরূদ পাঠাও এবং যথাযথভাবে সালাম জানাও।"
এই সালাম যে কোনো অবস্থায় পাঠানো যায় – বসে, দাঁড়িয়ে, চলতে থাকা অবস্থায়। দাঁড়ানোকে শর্ত করা হয়নি।
২. দাঁড়িয়ে সালাম প্রদানের ফিকহী হুকুম
হানাফী ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাবসমূহে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়ানো জায়েজ এবং তা মুস্তাহাবও হতে পারে, যদি তা আদব ও ভালোবাসার প্রকাশ হয়। তবে একে ওয়াজিব বা ফরয মনে করা বা নিয়মিত বিশেষ আমল হিসেবে নির্ধারণ করা বিদ‘আতের শামিল হতে পারে।
-
ইবনে আবেদীন (রহ.) তার ‘রাদ্দুল মুহতার’ (৫ম খণ্ড, ২৯৪ পৃষ্ঠা)-এ বলেন:
"নবী (সা.)-এর নাম শুনে দাঁড়ানো এবং তাকে সম্মান করা জায়েজ, বরং মুস্তাহাব, যদি তা শরী‘আতের পরিপন্থী কোনো বিশ্বাসের সাথে না হয়।"
-
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) ‘ইমদাদুল ফাতাওয়া’ (১ম খণ্ড, ১৯৪ পৃষ্ঠা)-এ বলেন:
"আমার হুজ্জাহ ও দলীল অনুযায়ী, নবী (সা.)-এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়ানো জায়েজ, তবে নিয়মিতভাবে দাঁড়ানোর পদ্ধতি নির্ধারণ করা বিদ‘আত হতে পারে।"
-
মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) ‘ফাতাওয়া উসমানী’ (২য় খণ্ড, ২১৫ পৃষ্ঠা)-এ বলেন:
"রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সালাম দাঁড়িয়ে পাঠানো জায়েজ, বরং তা সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু যদি কেউ মনে করে যে, দাঁড়ানো ছাড়া সালাম শুদ্ধ হবে না বা দাঁড়ানো ওয়াজিব, তাহলে তা ভুল।"
৩. দূর থেকে দাঁড়িয়ে সালামের বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি
যেহেতু প্রশ্নে ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ’ উল্লেখ আছে, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারকের সামনে না থেকে দূর থেকে সালাম পেশ করা। এ ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে পাঠানো কোনো সমস্যা নয়। হাদীসে এসেছে:
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا
(সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪০৮)
"যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দুরূদ পাঠায়, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন।"
এই দুরূদ ও সালাম বসে-দাঁড়িয়ে, নিকটে বা দূরে – সব অবস্থায় সমানভাবে সওয়াবের কাজ। তাই দাঁড়িয়ে দূর থেকে সালাম পাঠানো জায়েজ ও মুস্তাহাব।
৪. সতর্কতা
কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে সালামকে বিদ‘আত বলে আখ্যা দেন। তাদের যুক্তি হলো, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় তাকে দাঁড়িয়ে সম্মান করলেও তাঁর ওফাতের পর তা নিয়মিত আমল হিসেবে করেননি। হানাফী উলামাগণ এ বিষয়ে বলেন: সাহাবীদের থেকে দাঁড়িয়ে সালামের অস্বীকৃতি প্রমাণিত নয়; বরং তাঁরা সম্মানার্থে দাঁড়াতেন। তবে পরে যারা এটাকে বাধ্যতামূলক বা নির্দিষ্টভাবে শর্তযুক্ত করেছে, তা বিদ‘আত গণ্য হয়েছে।
অতএব, দাঁড়িয়ে সালাম পাঠালে তা জায়েজ, তবে একে ধর্মীয় আবশ্যকতা মনে করা বা শুধু এটাই গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি ভাবা ঠিক নয়। বিনা কারণে দাঁড়ানোও জায়েজ, কারণ দাঁড়ানো কোনো গুনাহ নয়, বরং তা মুস্তাহাবের পর্যায়ে পড়ে।
সংক্ষিপ্ত ফতোয়া
হানাফী মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে নবী করীম (সা.)-কে দাঁড়িয়ে সালাম প্রদান করা জায়েজ ও মুস্তাহাব। এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। তবে একে ওয়াজিব বা বিশেষ ইবাদতের রূপ দেওয়া বিদ‘আত হবে। দাঁড়ানোকে সুন্নত বা আবশ্যক নয় বরং মুস্তাহাব মনে করাই উত্তম।
প্রাসঙ্গিক হানাফী কিতাবসমূহের রেফারেন্স
১. রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবেদীন) – ৫/২৯৪ (সম্মানার্থে দাঁড়ানোর জায়েজতা)
২. ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানবী) – ১/১৯৪ (দাঁড়িয়ে দুরূদ-সালামের অনুমতি)
৩. ফাতাওয়া উসমানী (মুফতী মুহাম্মদ শফী) – ২/২১৫ (দূর থেকে দাঁড়িয়ে সালাম জায়েজ)
৪. বেহেশতী জেওর (আশরাফ আলী থানবী) – ২য় অংশ, আমল অধ্যায় (দুরূদের ফযীলত)
৫. আল-হিদায়া (মারগীনানী) – সালাত অধ্যায় (সম্মানার্থে দাঁড়ানো সম্পর্কে ইঙ্গিত)
৬. শারহু মা‘আনিল আছার (তাহাবী) – দাঁড়ানোর হাদীসসমূহের ব্যাখ্যা
৭. উসুলুশ শাশী – ইজতিহাদ ও ফিকহী মূলনীতি (আদব ও বিদ‘আতের পার্থক্য)