নাতি-নাতনিকে কি সবাইকে সমান দিতে হবে?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
Answer
প্রশ্ন: একজন ৮০ বছরের বৃদ্ধ, তাঁর ৫ পুত্র ও ৩ কন্যা সন্তান। স্ত্রী মৃত। এক পুত্র আগেই মারা গেছে, তার এক ছেলে (১৬/১৭ বছর) ও এক মেয়ে (বিবাহিতা, দুই সন্তান)। তিনি জমি বিক্রি করে তাঁর মৃত পুত্রের ছেলেকে ১ লক্ষ টাকা, অন্য দুই জীবিত পুত্রের (একজনের এক ছেলে ও অপরজনের দুই ছেলে) তিন নাতিকে আরও ৩ লক্ষ টাকা (মোট ৪ লক্ষ) দিয়েছেন। বাকি নাতি-নাতনিদের কিছু দেননি। সবারই আর্থিক অভাব নেই। শরিয়ত অনুযায়ী এ কাজ কতটুকু সঠিক?
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، وعلى آله وصحبه ومن اتبعه بإحسان إلى يوم الدين، أما بعد:
উক্ত ব্যক্তির কাজটি শরিয়তসম্মত নয়। নিম্নে দলিল ও সালাফি ফিকহের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ আবশ্যক
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«اتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ»
"আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।"
(সহীহ বুখারী: ২৫৮৭, সহীহ মুসলিম: ১৬২৩)
এই হাদিস সন্তানদের মধ্যে দান-উপহারে সমতা বজায় রাখার নির্দেশ দেয়। ইমাম আহমাদ, ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনুল ক্বাইয়িম, ইবনে বায, ইবনে উসাইমীন প্রমুখ সালাফি আলিমগণ একমত যে, জীবিত অবস্থায় পিতা যদি তার সন্তানদের উপহার দেন, তবে পুত্র-কন্যাকে সমান দিতে হবে। কারণ হাদিসে কোনো তারতম্য নেই।
(মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ: ৩১/৩০৭, ফাতাওয়া ইবনে উসাইমীন: ১৮/৩২৩)
২. নাতি-নাতনির বিষয়ে বিধান
নাতি-নাতনিরা সন্তানের মতো সরাসরি 'আওলাদ' নয়। তবে সালাফি আলিমগণের মতামত:
- শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন: "নাতি-নাতনিদের মধ্যে কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়া জায়েয নয়, যদি না কোনো শরয়ি প্রয়োজন থাকে (যেমন অভাব, অসুস্থতা)। তবে ন্যায়বিচার করাই উত্তম, এবং সব নাতি-নাতনিকে সমান দিতে হবে।" (ফাতাওয়া ইবনে বায: ২০/২৬৩)
- শাইখ ইবনে উসাইমীন (রহ.) বলেন: "দাদা যদি কেবল কিছু নাতিকে দেন, তবে তা হারাম নয়, যদি ক্ষতি বা জুলুমের উদ্দেশ্য না থাকে। তবে উত্তম হলো ইনসাফ করা।" (শারহুল মুমতি‘: ১১/১২৪)
কিন্তু এখানে প্রশ্নকারীর ক্ষেত্রে কেবল চারজন নাতি বাছাই করা হয়েছে, অথচ আরও নাতি-নাতনি আছে। বিশেষ কোনো প্রয়োজন (যেমন চিকিৎসা বা অত্যাবশ্যকীয় চাহিদা) নেই—এটি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব।
৩. মৃত পুত্রের ছেলেকে দেওয়া আর তার মেয়েকে না দেওয়া
এটি জেন্ডার বৈষম্য। মৃত পুত্রের এক ছেলে ও এক মেয়ে—উভয়ই নাতি। ছেলেকে ১ লক্ষ দিয়েছেন, মেয়েকে কিছু দেননি। অথচ তারও সমান অধিকার। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ كَانَ لَهُ ابْنَةٌ فَلَمْ يَئِدْهَا وَلَمْ يُهِنْهَا وَلَمْ يُؤْثِرْ وَلَدَهُ عَلَيْهَا أَدْخَلَهُ اللَّهُ الْجَنَّةَ»
"যার একটি মেয়ে আছে, সে তাকে হত্যা করেনি, তাকে অপমান করেনি, এবং তার পুত্রকে তার ওপর প্রাধান্য দেয়নি, আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।"
(সুনান আবু দাউদ: ৫১৪৮, সহীহ)
সুতরাং পুত্র-কন্যায় বৈষম্য হারাম।
৪. জীবিত সন্তানদের উপেক্ষা
প্রশ্নকারী ৮০ বছর বয়সী ব্যক্তি তার ৫ জীবিত পুত্র ও ৩ কন্যাকে বাদ দিয়ে নাতিদের দিচ্ছেন। জীবিত সন্তানদের মধ্যে ইনসাফের হুকুম আরও জোরালো। যদি তিনি নাতিদের দিতে চান, তবে নিজ সন্তানদেরও সমান দিতে হবে, অথবা সবার জন্য সমানভাবে একটি নিয়ম করা উচিত। বিশেষ করে মৃত পুত্রের পরিবারের জন্য দেওয়া মনে হলে, তা মৃতের উত্তরাধিকারীদের (ছেলে ও মেয়ে) সমানভাবে দিতে হবে।
৫. ‘উইল’ বা ‘ওসিয়াত’ নয়—জীবদ্দশায় দান
যেহেতু তিনি জীবিত অবস্থায় জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন, এটি দান (হিবা)। মৃত ব্যক্তির ওসিয়াতের মতো এখানে 'ওয়ারিসের জন্য ওসিয়াত নিষিদ্ধ' (হাদিস: "لا وصية لوارث") প্রযোজ্য নয়। তবে দান করার সময় ইনসাফ ওয়াজিব।
(ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ: ৩১/৩০৬)
সংক্ষেপে শরয়ি রায়:
- এই দান শরিয়তসম্মত নয়।
- কারণ: (ক) সবার মধ্যে সমতা রক্ষা করা হয়নি, (খ) মৃত পুত্রের মেয়েকে উপেক্ষা করে জেন্ডার বৈষম্য করা হয়েছে, (গ) বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেবল চারজনকে দেয়া অন্যায়, (ঘ) জীবিত সন্তানদের বাদ দেওয়া।
- সমাধান: হয় সব নাতি-নাতনিকে (মৃত পুত্রের মেয়েসহ) সমানভাবে দেওয়া, অথবা কাউকে না দেওয়া। যদি ইতিমধ্যে দিয়ে ফেলেন, তাহলে তাওবা করতে হবে এবং অন্য নাতি-নাতনিদেরও সমান পরিমাণ দিতে হবে (যদি সম্ভব হয়)।
আল্লাহ তাআলা সবাইকে সঠিক পথ দেখান।
والله أعلم بالصواب