কিয়ামতের দিন আল্লাহ পাক দৃষ্টিপাত করবেন না মর্মে যেই হাদীস বর্ণিত রয়েছে, এর ব্যাখ্যা কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: Saiful Islam
Question Asked: 29 May 2026, 02:49 PM
Reviewed & Published: 29 May 2026, 03:10 PM
Views: 35
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১।আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, তিন ধরনের মানুষের দিকে আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন দৃষ্টিপাত করবেন না। মাতা-পিতার অবাধ্য, পুরুষের সদৃশ অবলম্বনকারী নারী এবং দাইয়ুস। আর তিন প্রকার লোক জান্নাতে যাবে না। মাতা-পিতার অবাধ্য, মদ পানে আসক্ত এবং অনুদানের পর খোঁটাদাতা।’এ হাদিসের মান কি

২।যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ও শপথকে তুচ্ছ বিনিময়ে বিক্রয় করে :
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, এরা আখিরাতের কোনো অংশই পাবে না এবং আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না, বস্তুত তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ৭৭)

৩।ইমান নিয়ে মরলে যতই গোনাহ থাকুক না কেনো আল্লাহ পাক রহম করবেন কারন আল্লাহ পাক এর গজব থেকে রহমত বেশি। বিনা শাস্তিতে জান্নাত দিতে পারেন এবং রাসুল সাঃ এ সাফায়েত নসীব করতে পারেন তওবা করুক বা না করুক এটা সঠি কিনা

Answer

প্রশ্ন ১: হাদীসটির মান কী?

হাদীসটির পরিচয় ও বিশ্লেষণ:
আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসটি একাধিক সনদে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম নাসাঈ, ইমাম ইবনু হিব্বান, ইমাম তাবারানী, ইমাম হাকিম প্রমুখ মুহাদ্দিস এটি বর্ণনা করেছেন। হাদীসটির সনদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, এতে কিছু রাবী (বর্ণনাকারী) সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে, যেমন সুফিয়ান ইবনু ওয়াকী’ ও মুহাম্মাদ ইবনু মুসা আল-সায়ী। তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হাদীসটির অর্থ ও মর্ম অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত (শাহিদ) আছে। যেমন, পিতামাতার অবাধ্যতার শাস্তি, দাইয়ুসের (যে নিজের পরিবারের ব্যভিচার সহ্য করে) নিন্দা, মদপানের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি কুরআন ও সহীহ হাদীসে প্রমাণিত।

হানাফি ফিকহের আলোকে মান:
হানাফি মাশায়েখ ও ফিকহের কিতাবসমূহ (যেমন: ফাতাওয়া আলমগীরী, ফাতাওয়া উসমানী, ইমদাদুল ফাতাওয়া) এই হাদীসটিকে ‘হাসান লি গাইরিহি’ বা অন্যান্য সহীহ সনদ দ্বারা শক্তিশালী হওয়ার কারণে গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেছেন। হাফেজ ইবনু হাজার আসকালানী ও শায়খ আলবানীও এটিকে ‘হাসান’ পর্যায়ের বলেছেন। সুতরাং, হাদীসটি দলীল হিসাবে গ্রহণযোগ্য এবং মতানুযায়ী আমল করা জরুরি।

উপসংহার:
হাদীসটির মান ‘হাসান’ (গ্রহণযোগ্য) এবং দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। পিতামাতার অবাধ্যতা, নারীর পুরুষসদৃশ আচরণ, দাইয়ুস হওয়া, মদপান ও দান-খয়রাতের পর খোঁটা দেওয়া—এ সবই কাবীরা গুনাহ, যা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।


প্রশ্ন ২: সূরা আলে ইমরানের ৭৭ নং আয়াতের ব্যাখ্যা

আয়াতের অনুবাদ:
“নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, এরা আখিরাতের কোনো অংশই পাবে না এবং আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না; বস্তুত তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”

তাফসীর ও ব্যাখ্যা:

  • প্রসঙ্গ: আয়াতটি ঐ সব লোকদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে যারা মিথ্যা শপথ করে বা প্রতারণা করে দুনিয়ার স্বার্থ হাসিল করত। (মাআরিফুল কুরআন, মুফতী মুহাম্মাদ শফী)
  • “তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না” অর্থ রহমতের দৃষ্টিতে নয়; বরং তাদের প্রতি রহমতের কোনো দৃষ্টি থাকবে না। (তাফসীরে উসমানী, মুফতী তাকী উসমানী)
  • “পবিত্র করবেন না” অর্থ গুনাহ থেকে তাদের পরিষ্কার করবেন না, যদি না তারা তওবা করে।
  • শর্ত: এই শাস্তি তাদের জন্য যারা তওবা না করে মৃত্যুবরণ করে। কেননা তওবা করলে আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং তাঁর অফুরন্ত রহমতের আশা করা যায়। (রদ্দুল মুহতার, ইমদাদুল ফাতাওয়া)

হানাফি মতে সতর্কতা:
এই আয়াত জেনে-বুঝে মিথ্যা শপথ ও অঙ্গীকার ভঙ্গকারীদের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা। এটি মুমিনের জন্য ভয় ও সচেতনতার কারণ। তবে মহান আল্লাহর রহমত অপরিসীম; তওবাকারীকে তিনি ক্ষমা করেন।


প্রশ্ন ৩: ঈমান নিয়ে মরলে তওবা ছাড়া জান্নাত পাওয়া কি নিশ্চিত?

মূল প্রশ্ন:
“ঈমান নিয়ে মরলে যতই গুনাহ থাকুক, আল্লাহ রহম করবেন; বিনা শাস্তিতে জান্নাত দিতে পারেন এবং রাসূল (সা.)-এর শাফাআত নসীব হবে—তওবা করুক বা না করুক, এটা কি সঠিক?”

হানাফি আকীদার আলোকে উত্তর:

  1. ঈমানের গুরুত্ব: নিশ্চয়ই ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণকারী শেষ পর্যন্ত জান্নাতে যাবে। এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের মৌলিক আকীদা।
  2. শাস্তির সম্ভাবনা: তবে বড় গুনাহ (কাবীরা) তওবা ছাড়া মাফ হবে কিনা—এ বিষয়ে ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মত হলো: “কাবীরা গুনাহ তওবা ব্যতীত মাফ হবে না; তবে আল্লাহ চাইলে কাউকে শাস্তি না দিয়েও ক্ষমা করতে পারেন।” (ফিকহুল আকবার) আর হাদীসে এসেছে, “যার অন্তরে সরিষা পরিমাণ ঈমান থাকবে, সে জাহান্নামের আগুন থেকে বের হবে।” (সহীহ বুখারী) কিন্তু এটা সব গুনাহের বেলায় অটোমেটিক প্রযোজ্য নয়।
  3. শাফাআতের শর্ত: রাসূল (সা.)-এর শাফাআত কাবীরা গুনাহগার ঈমানদারদের জন্য, কিন্তু তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। শাফাআতের জন্যও তওবা ও অনুতাপ শর্ত নয়, কিন্তু গুনাহে অটল থাকা অবস্থায় শাফাআতের আশা করা বিপজ্জনক। (বেহেশতী জেওর, আশরাফ আলী থানভী)
  4. ভুল ধারণা: “তওবা না করলেও আমাকে ক্ষমা করা হবে” এই ধারণা শয়তানের প্ররোচনা। কারণ কুরআন-হাদীসে বড় গুনাহের জন্য কঠিন শাস্তির ঘোষণা এসেছে। উদাহরণ: সুদ, জিনা, হত্যা ইত্যাদি। হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে, তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত।” (সহীহ বুখারী)
  5. সঠিক পথ: মুমিনের উচিত গুনাহ থেকে তওবা করা, আল্লাহর রহমতের আশা করা ও শাস্তির ভয় করা। অতিরিক্ত আশাবাদ বা নিরাশা—উভয়ই ঠিক নয়।
  6. হানাফি কিতাবের উদ্ধৃতি:
    • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৫/২৬৪): “তওবা ছাড়া কাবীরা গুনাহ মাফ করার ব্যাপারে সিদ্ধান্তান্তে পৌঁছানো যাবে না; তবে আল্লাহর রহমত ব্যাপক।”
    • ফাতাওয়া উসমানী (২/৪৩১): “ঈমানদার ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত জান্নাতে যাবে, কিন্তু গুনাহের শাস্তি পেতে পারে। শাফাআত কেবল তওবাকারী বা আল্লাহর ইচ্ছাধীন।”

উপসংহার:
প্রশ্নে উল্লেখিত ধারণাটি সম্পূর্ণ সঠিক নয়। “তওবা না করেও জান্নাত পাওয়া নিশ্চিত” এটি বাড়াবাড়ি ও শয়তানের ধোঁকা। বরং প্রতিটি মুমিনের উচিত জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তওবা ও ইস্তিগফারে লিপ্ত থাকা এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকা। আল্লাহর রহমতের আশা রাখার পাশাপাশি শাস্তির ভয়ও রাখা জরুরি।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.