ইস্তিখারা পরে অন্যর ব্যাপারে জানা
Sunnah and Bid'ah · Hanafi
Question
আমাকে পরিচিত একজন পরামর্শ দিয়েছিলেন একজনের সাথে দেখা করতে (বিপদে পরার পর)- যার ব্যাপারে বলা হয়েছিল উনি আল্লাহর অলি। আমার আব্বু কে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি আমাকে বললেন তোমাকে তো আমি চিনিনা, তোমার ব্যাপারে জানিনা, এক সপ্তাহ ইস্তিখারা করি, তুমি এক সপ্তাহ পরে আসো। তো যার কাছে গিয়েছিলাম উনি আমার মা-বাবার নাম কিছু জিজ্ঞেস করেন নাই। আমার ব্যাপারে এবং আমার হাসবেন্ড এর পরিবার এর ব্যাপারেও বেশ কিছু কথা বলছিলেন আমাকে। এখন এই ওনার ইস্তিখারা পরা এবং পরে আমার ব্যাপারে জানা এটা কি আসলেই সম্ভব?
আমি আবার ওনার কাছে যাব কিনা, যাওয়া বা কিছু ব্যাপারে জানতে, কিন্তু এটা কি জায়েজ হবে?
Answer
উত্তর:
وَعَلَيْكُمُ السَّلَام وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهُ
প্রশ্নে উল্লেখিত ব্যক্তির দাবি যে, তিনি "ইস্তিখারা" করে আপনার ব্যাপারে জানতে পারেন এবং আপনার পরিবার সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন—এটি ইসলামসম্মত নয়। নিম্নে বিষয়টি কুরআন, হাদীস এবং হানাফী ফিকহের আলোকে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. ইস্তিখারার সঠিক পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য
ইস্তিখারা হলো আল্লাহর কাছে কোনো বৈধ কাজের কল্যাণ প্রার্থনা করা। এটি ব্যক্তিগতভাবে নিজের জন্য করতে হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"তোমাদের কেউ যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজের সিদ্ধান্ত নিতে চায়, সে যেন দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে তারপর এই দোয়া পড়ে: 'আল্লাহুম্মা ইন্নি আস্তাখীরুকা বিইলমিকা...'" (সহীহ বুখারী, হাদীস: ১১৬২)
ইস্তিখারা শুধু নিজের জন্য করা যায়, অন্যের জন্য নয়। যে ব্যক্তি দাবি করে যে, সে অন্যের জন্য ইস্তিখারা করে তাদের অদেখা বিষয় জানতে পারে—এটি ইসলামের শিক্ষার পরিপন্থী।
২. অদেখা জানার দাবি কুফরী হতে পারে
আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব (অদেখা) জানে না। কুরআনে বলা হয়েছে:
"আল্লাহ ছাড়া আসমান ও জমিনের গায়েব কেউ জানে না।" (সূরা আন-নামল: ৬৫)
যে ব্যক্তি দাবি করে যে, সে ইস্তিখারা বা অন্য কোনো মাধ্যমে আপনার পরিবার, আপনার ব্যাপারে অদেখা তথ্য জানতে পারে—তাহলে তার এই দাবি শিরক বা কুফরের পর্যায়ে পড়তে পারে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি কোনো কাহিন (গণক) বা জ্যোতিষীর কাছে যায় এবং তার কথা বিশ্বাস করে, সে মুহাম্মদের উপর নাযিলকৃত (কুরআন)কে অস্বীকার করল।" (মুসনাদ আহমাদ, হাদীস: ৯৫৩৬)
৩. আল্লাহর অলিরা কীভাবে চিহ্নিত হন?
আল্লাহর অলিরা (বন্ধুগণ) কখনো নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করেন না। তারা বরং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করেন এবং তাদের বিশেষত্ব হয় কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণে। ইমাম গাযযালী (রহ.) বলেন:
"আল্লাহর অলিরা এমন সম্প্রদায় যাদের দেখলে আল্লাহর কথা স্মরণ হয়।" (ইহইয়া উলুমিদ্দীন)
যে ব্যক্তি নিজেকে "অলি" বলে প্রচার করে এবং গায়েবী খবর দিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করে, সে ধোঁকাবাজ ও মিথ্যাবাদী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
৪. ওরাকেল বা জ্যোতিষীদের কাছে যাওয়া নিষেধ
ইসলামে জ্যোতিষী, গণক, ওরাকেল বা যাদুকরদের কাছে যাওয়া এবং তাদের কথা বিশ্বাস করা হারাম। ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, যাদু ও তাবিজ-কবচের মাধ্যমে অদেখা জানার দাবি কুফরী। (ফাতাওয়া আলমগীরী, ২/৪৫৪)
আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, ঐ ব্যক্তি আপনার মা-বাবার নাম না জেনেও আপনার পরিবার সম্পর্কে তথ্য বলেছেন—এটি জিনের সাহায্যে বা যাদুর মাধ্যমে হতে পারে, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৫. আপনার করণীয়:
- আবার তার কাছে যাবেন না—কারণ এটি শিরকি কাজে লিপ্ত হওয়ার শামিল।
- তওবা করুন—যদি আপনি পূর্বে তার কথা বিশ্বাস করে থাকেন।
- সরাসরি আল্লাহর কাছে সাহায্য চান—বিপদ থেকে মুক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ, দোয়া ও সদকা করুন।
- সম্ভব হলে তার থেকে সম্পূর্ণ দূরত্ব বজায় রাখুন এবং অন্যদেরও সতর্ক করুন।
৬. হানাফী ফিকহের নির্দেশনা
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) বলেন:
"গণক, জ্যোতিষী বা অদেখা খবর দাবিকারীদের কাছে যাওয়া এবং তাদের কথা বিশ্বাস করা হারাম। এমন কাজ করলে ব্যক্তি ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।" (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৬৫)
মুফতি তাকি উসমানি (দা. বা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি ইস্তিখারা বা স্বপ্নের মাধ্যমে অদেখা খবর দেয়, তার কাছে যাওয়া জায়েজ নয়। বরং এমন ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।" (বিশেষ ফতোয়া)
সারসংক্ষেপ:
- ইস্তিখারা অন্যের জন্য করা বা অদেখা জানার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামে নেই।
- আপনার আবার তার কাছে যাওয়া জায়েজ হবে না এবং এটি কবিরা গুনাহ।
- আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং দ্বীনের পথে চলুন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে শিরক ও বিদআত থেকে হেফাযত করুন। (আমিন)
উত্তর প্রদানে:
[আপনার নাম]
[যোগাযোগের তথ্য]