ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী ব্যবসায় বিনিয়োগের সঠিক পদ্ধতি জানুন।
Business and Job · Hanafi
Question
আসসালামু আলাইকুম।
আমরা একটি ব্যবসা পরিচালনা করছি এবং ব্যবসার জন্য ইনভেস্টমেন্ট নেওয়ার চিন্তা করছি। এ বিষয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে সঠিক পদ্ধতি জানতে চাই।
আমাদের পরিকল্পনা হলো:
* একজন ব্যক্তি ব্যবসায় টাকা ইনভেস্ট করবে।
* ব্যবসায় যদি লস হয়, তাহলে সেই ইনভেস্টকারী কোনো লস বহন করবে না; সম্পূর্ণ লস কোম্পানির মালিক বহন করবে।
* কিন্তু ব্যবসায় লাভ হলে ইনভেস্টকারী পূর্বনির্ধারিত একটি শতাংশ হারে লাভ পাবে।
এখন আমার প্রশ্নগুলো হলো:
১। এভাবে ইনভেস্টমেন্ট নেওয়া ও লাভ দেওয়া শরীয়ত অনুযায়ী জায়েজ হবে কি?
২। যদি জায়েজ হয়, তাহলে ইনভেস্টকারীকে লাভ কোন ভিত্তিতে দিতে হবে?
* সে যে মূল টাকা ইনভেস্ট করেছে, তার উপর নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে (যেমন ১ লক্ষ টাকায় ৫% = ৫,০০০ টাকা) দিতে হবে?
* নাকি ব্যবসার মোট লাভ থেকে নির্ধারিত শতাংশ হিসেবে দিতে হবে?
৩। ইনভেস্টমেন্টের ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মত ও সঠিক পদ্ধতি কী হবে, দয়া করে বিস্তারিত জানালে উপকৃত হব।
জাযাকাল্লাহু খাইরান।
Answer
উত্তর
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
আপনার পরিকল্পনা হলো:
- একজন বিনিয়োগকারী (Investor) ব্যবসায় মূলধন দেবেন।
- ব্যবসায় লোকসান হলে বিনিয়োগকারী কোনো ক্ষতি বহন করবেন না; পুরো লোকসান কোম্পানির মালিক বহন করবেন।
- কিন্তু লাভ হলে বিনিয়োগকারী পূর্বনির্ধারিত একটি শতাংশ (যেমন মূলধনের ৫%) পাবেন।
১. এই বিনিয়োগ পদ্ধতি কি শরীয়তসম্মত?
না, এটি জায়েজ নয়। কারণ:
(ক) লোকসানের দায়ভার না নেওয়া সুদের শামিল
ইসলামী শরীয়তে, যেকোনো অংশীদারিত্ব বা বিনিয়োগে মূলধন প্রদানকারী লোকসানের ঝুঁকি নেবেন। যদি কেউ তার মূলধনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নেয়, তাহলে তা মূলত একটি ঋণ (Loan) হিসেবে গণ্য হবে, আর তার উপর লাভ দেয়া সুদ (Riba) হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারা, ২:২৭৫)
(খ) মুদারাবা ও শিরকাতের মূলনীতি লঙ্ঘন
ইসলামী বিনিয়োগের দুটি স্বীকৃত পদ্ধতি হলো:
- মুদারাবা (Mudarabah): একজন মূলধন দেয় (রব্বুল মাল), অন্যজন কাজ করে (মুদারিব)। লোকসান হলে শুধু মূলধন দেয়া ব্যক্তির উপরই ক্ষতি হয় (যদি কাজে গাফিলতি না থাকে)। কিন্তু এতে লাভ নির্দিষ্ট পরিমাণ বা শতাংশে (যেমন ৫%) ঠিক করা যায় না; বরং লাভের অনুপাত (শতকরা) ঠিক করতে হবে।
- শিরকাত (Shirkah): সকল অংশীদার মূলধন ও কাজ উভয়ে অংশ নেয়। এতে লোকসান হলে সবার মূলধন অনুপাতে ক্ষতি ভাগাভাগি হয়; আর লাভ হয় চুক্তি অনুযায়ী শতাংশ হারে।
আপনার বর্ণিত শর্তে (বিনিয়োগকারী লোকসান বহন করবে না) এটি কোনো বৈধ চুক্তির সাথে মেলে না। এটি “গ্যারান্টেড রিটার্ন” – যা সুদ-এর অন্যতম রূপ।
২. লাভ কীভাবে দিতে হবে?
আপনার বর্ণিত পদ্ধতি (মূলধনের ওপর নির্দিষ্ট শতাংশ – যেমন ৫%) কখনোই জায়েজ নয়। বরং বৈধ পদ্ধতি হলো:
(ক) মোট লাভের শতাংশ হিসেবে
- লাভের ভিত্তি হবে সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক লাভ, ইনভেস্টকৃত টাকার উপর নয়।
- উদাহরণ: ব্যবসায় মোট লাভ হলো ১,০০,০০০ টাকা। যদি বিনিয়োগকারীর চুক্তিকৃত অংশ ৪০% হয়, তবে তিনি পাবেন ৪০,০০০ টাকা। এটা স্থির নয়, লাভ বাড়লে বা কমলে পরিবর্তন হবে।
(খ) সঠিক নিয়ম
আপনার বর্ণিত কাঠামো (কোম্পানির মালিকই ম্যানেজার এবং বিনিয়োগকারী শুধু মূলধন দেবে) এটি মুদারাবা-র মতো। কিন্তু সঠিক নিয়ম:
- লোকসান হবে শুধু বিনিয়োগকারীর মূলধনে (যদি গাফিলতি না থাকে) – এতে কোনো ব্যতিক্রম করা যাবে না।
- লাভের হার শতাংশ হিসেবে ধার্য করতে হবে (যেমন লাভের ৪০%) – নির্দিষ্ট টাকার অংকে নয়।
৩. শরীয়তসম্মত পদ্ধতি কী হবে?
সঠিক পদ্ধতি – মুরাবাহা বা মুদারাবা চুক্তি:
(ক) মুদারাবা চুক্তি
- মূলধন দেয়া ব্যক্তি (রব্বুল মাল) এবং ব্যবসা পরিচালনাকারী (মুদারিব) – এ দুজনের মধ্যে চুক্তি হবে।
- শর্ত: লোকসান হলে শুধু রব্বুল মালের মূলধন থেকে কাটা হবে (মুদারিবের কোনো টাকা ক্ষতি হবে না, তবে তার পরিশ্রম নষ্ট হবে)।
- লাভ: পূর্বনির্ধারিত শতাংশ হারে (যেমন ৫০:৫০ বা ৪০:৬০) ভাগ হবে। লাভের কোনো নির্দিষ্ট টাকার অংক ঠিক করা যাবে না।
(খ) শিরকাত চুক্তি
- যদি উভয়েই মূলধন প্রদান করে এবং উভয়েই কাজে অংশ নেয়, তাহলে লোকসান মূলধন অনুপাতে এবং লাভ চুক্তি অনুপাতে ভাগ হবে।
আপনার জন্য প্রস্তাবনা:
- আপনি (যিনি ব্যবসা চালান) মালিক বা পরিচালক। বিনিয়োগকারীকে বলবেন: “আপনার টাকা নিয়ে আমরা ব্যবসা করব। লোকসান হলে আপনার টাকাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে (যদি আমার গাফিলতি না থাকে), আর লাভ হলে আমরা নির্ধারিত শতাংশে ভাগ করে নেব।”
উদাহরণ:
- বিনিয়োগকারী ১ লক্ষ টাকা দিলেন। আপনি ৪০% লাভ মালিক হিসেবে নিজের জন্য নির্ধারণ করলেন, বিনিয়োগকারী পাবেন ৬০%। তিনি লাভের অংশ হিসেবে পাবেন (এক মাস বা বছর পর) মোট লাভের ৬০%। যদি লাভ ২০,০০০ টাকা হয়, তিনি পাবেন ১২,০০০ টাকা। লাভ না হলে কিছুই পাবেন না। লোকসান হলে তার মূলধন থেকে হিসাব করা হবে।
তাহকীক (Hanafi References)
- ইবনে আবেদীন (রহ.) “রদ্দুল মুহতার” (৪/৫০৫-৫১২) এ বলেন: “মুদারাবায় লোকসান শুধু মূলধনের উপরই বর্তায়, আর লাভের ভাগ চুক্তি মোতাবেক হয়। একটি নির্দিষ্ট অংক ধার্য করা জায়েজ নয়।”
- ফাতাওয়া উসমানী (২/২৩১) এ উল্লেখ রয়েছে: “যদি কোনো ব্যক্তি এ শর্তে টাকা দেয় যে, লোকসান হলে আমি বহন করব না, বরং তোমাকে (মুদারিবকে) দিতে হবে, তাহলে এটি বাতিল কারণ লোকসানের দায় মূলধন প্রদানকারীর।”
- বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী) তে লেখা: “মুদারাবায় লাভের ভাগ দু’জনের মধ্যে শতাংশ হতে হবে, কোনো নির্দিষ্ট অংক (যেমন ১০০ টাকা) নয়।”
- ফাতাওয়া আলমগীরী (২/২৭২) তে রয়েছে: “মুদারিব যদি বলে, ‘লোকসান হলে আমি নিজে বহন করব’, কিন্তু মূলধনদাতা এতে সম্মত হয়, তবুও তা শুদ্ধ নয়, কারণ লোকসান স্বাভাবিক নিয়মে মূলধনদাতাকেই বহন করতে হয়।”
সুতরাং সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার বর্ণিত শর্তে (লোকসান শুধু কোম্পানির মালিক, লাভ বিনিয়োগকারী পাবে) বিনিয়োগ করা জায়েজ নয়। এটি ঋণের ওপর সুদ নেওয়ার মতো। শরীয়তসম্মত পদ্ধতি হলো:
- লোকসানের দায় মূলধন প্রদানকারীকে বহন করতে হবে।
- লাভের ভাগ হবে মোট লাভের শতাংশ হিসেবে, নির্দিষ্ট টাকার অংকে নয়।
আপনি যদি এই নীতিগুলো মেনে চলেন, তাহলে মুদারাবা বা শিরকাত চুক্তির মাধ্যমে বৈধভাবে বিনিয়োগ করতে পারেন।
আল্লাহই সর্বজ্ঞ।