ইমান নিয়ে মরলে বান্দা যত গোনাহ-ই করুক না কেন, আল্লাহ পাক রহম করতেও পারেন? আবার আযাবও দিতে পারেন?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
তবে রহমতের সম্ভাবনা বেশি এটা সঠিক কিনা
Answer
উত্তর
প্রশ্নে উল্লেখিত ধারণাটি মৌলিকভাবে সঠিক, তবে কিছু সূক্ষ্মতা ও শর্তসাপেক্ষে বুঝতে হবে। ইসলামী আকীদা ও হানাফী ফিকহের আলোকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট:
১. আল্লাহর রহমত তাঁর গজবের উপর প্রাধান্যশীল
কুরআন ও হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর ক্রোধের উপর বিজয়ী। যেমন হাদীসে কুদসীতে এসেছে:
"إِنَّ رَحْمَتِي سَبَقَتْ غَضَبِي"
"নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর অগ্রগামী।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ২৭৫১)
এছাড়া সূরা আ’রাফ (৭:১৫৬)-এ ইরশাদ হয়েছে:
"وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ"
"আমার রহমত প্রতিটি বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করে রয়েছে।"
সুতরাং, ঈমানদার অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তির জন্য আল্লাহর রহমতের সম্ভাবনা বেশি থাকা একটি সঠিক ধারণা। তবে এর অর্থ এই নয় যে, শাস্তি একেবারেই হবে না—বরং আল্লাহ চাইলে বিনা শাস্তিতেও ক্ষমা করতে পারেন, আবার চাইলে গুনাহের অনুপাতে শাস্তি দিয়ে পরে জান্নাত দিতে পারেন।
২. ঈমান নিয়ে মৃত্যু হলে শেষ পর্যন্ত জান্নাত নিশ্চিত
হানাফী মাযহাবের মূলনীতি অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তাওহীদ ও রিসালাতের বিশ্বাস নিয়ে মৃত্যুবরণ করে, সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে না। তবে তার গুনাহের জন্য তাকে কিছু সময় শাস্তি ভোগ করতে হতে পারে (যদি না আল্লাহ ক্ষমা করেন)। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
"إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ"
(সূরা নিসা ৪:৪৮)
অর্থ: "নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করা ক্ষমা করেন না, এবং এছাড়া (অন্যান্য পাপ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।"
এ থেকে বুঝা যায়, শিরক ব্যতীত অন্য পাপগুলো আল্লাহ ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন, আবার ইচ্ছা করলে শাস্তিও দিতে পারেন। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাফাআত ও আল্লাহর রহমতের কারণে অধিকাংশ মুমিন গুনাহগার শেষ পর্যন্ত ক্ষমা পেয়ে যায়।
৩. তওবা ছাড়াই ক্ষমার সম্ভাবনা আছে, তবে তওবা উত্তম
প্রশ্নে বলা হয়েছে, "তওবা করুক বা না করুক" — এ কথাটি বাস্তবিক অর্থে সঠিক, কারণ আল্লাহর ক্ষমা তাঁর ইচ্ছাধীন। তবে শরীয়তে তওবাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং তওবাকারীর জন্য ক্ষমার প্রতিশ্রুতি অধিক। হাদীসে এসেছে:
"التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لَا ذَنْبَ لَهُ"
"গুনাহ থেকে তওবাকারী সেই ব্যক্তির মতো, যার কোনো গুনাহই নেই।" (ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৪২৫০)
তাই তওবা না করলেও আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু তওবার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর রহমতের অধিক হকদার হয়।
৪. রাসূল (সা.)-এর শাফাআত
হাদীসে প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের বড় গুনাহগারদের জন্য শাফাআত (সুপারিশ) করবেন। সহীহ বুখারীর হাদীসে এসেছে:
"شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي"
"আমার শাফাআত আমার উম্মতের কবীরা গুনাহওয়ালাদের জন্য।" (আবু দাউদ, তিরমিযী)
এ বিষয়ে হানাফী ফকীহগণ (যেমন ইমাম আবু হানীফা, ইমাম তাহাবী) একমত যে, শাফাআত হক (সত্য) এবং তা কেবল মুমিনদের জন্যই হবে।
৫. "রহমতের সম্ভাবনা বেশি" বলা কি সঠিক?
হ্যাঁ, সঠিক—যদি এটি আল্লাহর রহমতের প্রতি আশা ও নির্ভরতার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়। তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, এটি গুনাহ করার উৎসাহ না দেয়। মুমিনের উচিত আল্লাহর রহমতের আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয় উভয়ই রাখা। ইমাম আবু হানীফা (রহ.) বলেন:
"الخوف والرجاء بمنزلة جناحي الطائر، إذا استويا استوى الطيران، وإذا نقص أحدهما وقع النقص"
"ভয় ও আশা পাখির দু’পাখির মতো—যখন উভয় সমান হয়, পাখি সুষ্ঠুভাবে উড়ে; আর একটির ঘাটতি হলে উড়ানে ব্যাঘাত ঘটে।" (শরহুল ফিকহিল আকবার)
অতএব, "রহমতের সম্ভাবনা বেশি" বলতে বোঝানো হয় যে, আল্লাহর রহমত তাঁর গজবের তুলনায় বিস্তৃত ও প্রাধান্যশীল, কিন্তু তা যেন গুনাহ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত না হয়।
৬. হানাফী কিতাবের কিছু উল্লেখ
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী): ঈমানদারদের জন্য রহমতের আশা ও শাফাআতের গুরুত্ব বর্ণিত।
- রদ্দুল মুহতারের (ইবনে আবেদীন): কিতাবুল ঈমানের আলোচনায় শাফাআত ও ক্ষমার বিষয়ে বিশদ বক্তব্য রয়েছে।
- ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী): "আল্লাহর রহমত সর্বব্যাপী এবং ঈমানদারের শেষ পরিণতি জান্নাত" — এমন বক্তব্য পাওয়া যায়।
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি শফী): সূরা নিসা ৪:৪৮-এর তাফসীরে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, শিরক ছাড়া অন্যান্য পাপ আল্লাহ চাইলে ক্ষমা করেন, চাইলে শাস্তি দেন।
উপসংহার
প্রশ্নোক্ত ধারণা—"ঈমান নিয়ে মরলে যতই গুনাহ থাকুক, আল্লাহর রহমতের সম্ভাবনা বেশি"—এটি সঠিক। তবে সাথে সাথে এও বুঝতে হবে যে, রহমতের আশা করতে গিয়ে গুনাহ করা উচিত নয়; বরং আল্লাহর ভয় ও আশা উভয়ই বজায় রাখা জরুরি। গুনাহ থেকে তওবা করা এবং নেক আমল করা রহমত লাভের সবচেয়ে নিশ্চিত পথ। আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তাঁর রহমত ও মাগফিরাত দান করুন। আমীন।