গোনাহ করলে তওবা না করে মারা যাই আল্লাহ পাক কি শাস্তি দিবেন
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ﴾ [النساء: 48]
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না; এর নিচের যেকোনো গুনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।”
এবং আর一处 বলেন,
﴿وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ﴾ [يوسف: 87]
“তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কেবল কাফিররাই নিরাশ হয়।”
তবে ইচ্ছাকৃত গুনাহ করা এবং ‘আল্লাহ ক্ষমা করবেন, রহমতের সম্ভাবনা বেশি’—এই ধারণা পোষণ করে তওবা না করার মনোভাব রাখা অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি আল্লাহর রহমতকে অজুহাত বানিয়ে গুনাহ চালিয়ে যাওয়ার শামিল, যা ঈমানের দুর্বলতা ও আল্লাহর ভয় থেকে বঞ্চিত হওয়ার লক্ষণ। নিম্নে হানাফি ফিকহ ও কিতাবের আলোকে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো—
১. কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে সতর্কতা
-
আল্লাহ তাআলা বলেন,
﴿أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ ۚ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ﴾ [الأعراف: 99]
“তারা কি আল্লাহর কৌশল থেকে নির্ভয় হয়ে গেছে? বস্তুতঃ ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ থাকে না।”
(অর্থাৎ, তার রহমতের উপর ভরসা করে গুনাহ চালিয়ে যাওয়াও ‘আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ থাকা’র অন্তর্ভুক্ত।) -
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“আল্লাহ তাআলার নিকট সেই ব্যক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত যে তার রহমত থেকে নিরাশ হয়।” (আবু দাউদ, হাদিস: ৫০৫৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৮৮২)
আরেক হাদিসে এসেছে,
“জ্ঞানী ব্যক্তি সে, যে নিজের প্রবৃত্তিকে বশ করে রাখে এবং মৃত্যুর পরে যা আছে তার জন্য আমল করে। আর মূর্খ সে, যে নিজের কামনার অনুসরণ করে এবং আল্লাহর কাছে (ক্ষমা) আশা করে বসে থাকে।” (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
২. হানাফি ফিকহের মূলনীতি
-
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, গুনাহ করার পর তওবা করা ফরজ। তওবা না করে অথবা তওবা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে গুনাহ করা জায়েয নয়।
(আল-ফিকহুল আকবর, ইমাম আবু হানিফা) -
ইবনে আবেদিন (রহ.) ‘রদ্দুল মুহতার’ এ লিখেছেন,
“যে ব্যক্তি এ ধারণা পোষণ করে যে ‘আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন’ কিংবা ‘ক্ষমার সম্ভাবনা বেশি’ বলে সন্তুষ্ট থেকে গুনাহ করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রহমতকে নিজের গুনাহের অনুমতি বানিয়ে নেয়। এ ধরনের চিন্তা শারঈ দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয়।”
(রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯০, কিতাবুল ইশারাহ) -
ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি মুহাম্মদ তাকী উসমানি) তে বলা হয়েছে,
“গুনাহ করার সময় যদি কেউ মনে করে ‘আমি তওবা করব না, কিন্তু আল্লাহ তো দয়ালু, তিনি ক্ষমা করে দেবেন’, তাহলে এটি কুফরি আকিদার পর্যায়ভুক্ত না হলেও, এটি একটি মারাত্মক গুনাহ এবং ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর বিধানকে হালকা করার শামিল।”
(ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৮৬)
৩. ‘ক্ষমা রহম করার সম্ভাবনা বেশি’—এই ধারণার ভুল
-
ইমাম তাহাবী (রহ.) ‘শারহু মাআনিল আসার’-এ বলেন,
“আল্লাহর রহমত অপরিসীম, কিন্তু তার শাস্তিও কঠোর। একান্তই তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে বান্দা নিজেকে সংশোধন না করলে শুধু ‘রহমতের সম্ভাবনা’-এর উপর ভরসা করা মূর্খতা।”
(শারহু মাআনিল আসার, ২/২২১) -
হাদিসে কুদসিতে এসেছে,
“যে ব্যক্তি আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দশ হাত অগ্রসর হই... কিন্তু যতক্ষণ না সে আমার সাথে অন্য কোনো কিছু শরীক করে।” (মুসলিম, হাদিস: ২৬৭৫)
কিন্তু এটি তওবা ও ইস্তিগফারের শর্তে, যেমন হাদিসে বলা হয়েছে— “যে ব্যক্তি তওবা করে না, সে জালিম।” (তিরমিজি)
৪. উপসংহার: এই ধরনের চিন্তা করে গুনাহ করা কী হবে?
-
গুনাহ নিজেই—কারণ ইচ্ছাকৃতভাবে তওবা না করার সংকল্প রেখে গুনাহ করা আল্লাহর আদেশের প্রতি অবজ্ঞা ও বিদ্রুপের নামান্তর। এটি তওবা ফরজকে অস্বীকার করার শামিলও হতে পারে, যদিও তা শিরক না হয়।
-
এটি গুনাহে মোতাল্লিকা একাগ্রতা—অর্থাৎ, ‘আমি তওবা করব না’ এই চিন্তা অন্তরে স্থান দেওয়া নিজেই একটি পাপ। তাই এই মানসিকতা পোষণ করে গুনাহ করলে তার জন্য দুটি গুনাহ হবে:
(১) গুনাহের কাজটি করা (যেনা, চুরি, মিথ্যা ইত্যাদি),
(২) তওবা না করার ইচ্ছা পোষণ করে গুনাহ করা (যা আল্লাহর রহমতকে হালকা করার শামিল)। -
আল্লাহর রহমতের আশা করা ভাল, কিন্তু তার সাথে ভয়ও রাখতে হবে।
ইমাম গাযযালী (রহ.) ‘ইহইয়া উলুমিদ্দীন’-এ বলেন,
“মুমিনের অবস্থা হলো— এমন ভয়-আশার মাঝখানে থাকে যে, সে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না, আবার কখনো তার শাস্তি থেকে নির্ভয়ও হয় না।”
সুতরাং, আপনার উল্লিখিত ধারণা— “আমি গুনাহ করলে তওবা না করে মারা যাই, আল্লাহ শাস্তি দেবেন বা ক্ষমা করবেন—ক্ষমা রহম করার সম্ভাবনা বেশি”— এটি শারঈ দৃষ্টিতে মারাত্মক ভুল। এ ধরনের চিন্তা পরিত্যাগ করে অবিলম্বে তওবা করুন এবং নিশ্চিত থাকুন যে, আল্লাহর রহমত তওবাকারীর জন্যই অধিকতর নিশ্চিত। তওবা না করে শুধু ‘ক্ষমার সম্ভাবনা’র আশায় গুনাহ চালিয়ে যাওয়া আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ থাকার শামিল, যা কুরআনে নিষিদ্ধ।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।