"ঈমান নিয়ে মরলে যতই গুনাহ থাকুক, আল্লাহর রহমতের সম্ভাবনা বেশি, এমন আকিদা বিশ্বাস কি সঠিক?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উত্তর:
আল্লাহর রহমতের উপর ভরসা রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করা এবং মনে করা যে "যতই গুনাহ করি না কেন, ঈমান থাকলে শেষ পর্যন্ত রহমত পাবোই" – এই ধরনের চিন্তা বা বিশ্বাস ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি এবং এটি মুনাফিকি বা গুনাহের প্রতি উদাসীনতার পরিচায়ক। ইসলামে গুনাহ করার পর তওবা করা বাধ্যতামূলক। আল্লাহর রহমতের আশা করা ভালো, কিন্তু তা গুনাহকে হালকা করার অজুহাত হতে পারে না।
কুরআন ও হাদীসের দলিল:
-
সূরা আরাফ (৭:৩৩):
"বলো, আমার রব কেবল অশ্লীল কাজ, প্রকাশ্য ও গোপন পাপ, অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং আল্লাহর সাথে এমন কিছু শরীক করা যার কোনো সনদ তিনি নামাননি, আর আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা তোমরা জানো না, তা-ই হারাম করেছেন।"
(এখানে স্পষ্ট যে, আল্লাহর রহমতের মিথ্যা আশা করে পাপ করা নিষিদ্ধ।) -
সূরা নিসা (৪:৪৮):
"নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। আর এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।"
(তবে গুনাহকে হালকা মনে করে বা রহমতের অজুহাতে ইচ্ছাকৃত পাপ করা ক্ষমার যোগ্য নয়, যদি না তওবা করা হয়।) -
হাদীস (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৭১৭):
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয় না রেখে (শুধু রহমতের ভরসায়) গুনাহ করে, সে ধোঁকায় থাকে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর শাস্তিকে রহমতের চেয়ে বেশি ভয় করে, সে নিরাপদ নয়। বরং মুমিনের অবস্থা হলো, রহমতের আশা ও শাস্তির ভয় উভয়ই সমান রাখা।"
হানাফী কিতাবের উক্তি:
-
ফাতাওয়া আলমগীরী (১/১৮২):
"যে ব্যক্তি গুনাহকে হালকা জ্ঞান করে বা মনে করে যে, 'আল্লাহ রহম করবেনই', এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করতে থাকে, তার ঈমান বিপদগ্রস্ত। কারণ এটি গুনাহের প্রতি উদাসীনতা এবং আল্লাহর হুকুমকে তুচ্ছ করার শামিল।" -
রদ্দুল মুহতার (৪/২৬২):
"ঈমান নষ্ট হয় না শুধু গুনাহ করলে, কিন্তু গুনাহকে হালাল মনে করে বা গুনাহের উপর অটল থেকে আল্লাহর রহমতের ভরসায় পাপ করলে তা কুফরী পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।" -
ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/২৩১):
"আল্লাহর রহমতের আশা করা ভালো, তবে গুনাহকে অব্যাহত রাখার জন্য তা অজুহাত বানানো জায়েয নয়। কারণ এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ধোঁকা ও শয়তানের প্ররোচনা।"
মূল উত্তর:
-
ঈমানের সমস্যা হবে কি?
- যদি কেউ মনে করে, "গুনাহ করলেও আল্লাহ মাফ করবেন, আমি ঈমান নিয়ে মরবো, তাই যাই হোক গুনাহ করি" – তাহলে এটি গুনাহকে হালকা করার মনোভাব। এটি ঈমানের দুর্বলতা। তবে এটি সরাসরি কুফরী নয়, কিন্তু গুনাহের উপর অটল থাকার এবং তওবা না করার কারণে ঈমান বিপদগ্রস্ত হয়।
- হানাফী ফিকাহ: এই ধরনের চিন্তা ঈমান নষ্ট করে না, কিন্তু গুনাহকে হালাল মনে করা (যেমন, "এটা পাপ নয়") বা আল্লাহর রহমতকে অজুহাত বানানো কুফরী হতে পারে।
-
শরীয়তের নির্দেশ:
- গুনাহ করার পর তওবা করা ফরজ।
- "ঈমান নিয়ে মরলেই হবে" – এই চিন্তা ভুল। কেননা ঈমান সহীহ হলে তওবা ও ইস্তেগফার বাধ্যতামূলক।
- সূরা জুমার (৩৯:৫৩): "বলো, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইও না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।"
(এই আয়াত তওবা-ইস্তেগফারের শর্তে, গুনাহ অব্যাহত রাখার জন্য নয়।)
সতর্কতা:
- শয়তানের প্ররোচনা: শয়তান মানুষকে ধোঁকা দেয় যে, "গুনাহ করেও যদি ঈমান থাকে, তাহলে জান্নাত পাওয়া যাবে।" এটি ধোঁকা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৫২):
"মুমিনের অবস্থা হলো, গুনাহ দেখলে তা থেকে বেঁচে থাকে, আর মুনাফিকের অবস্থা হলো, গুনাহ করেও নিশ্চিন্ত থাকে।"
উপসংহার:
ঈমান নিয়ে গুনাহ করলে তওবা আবশ্যক। আল্লাহর রহমত নিশ্চিত নয় যদি ইচ্ছাকৃতভাবে গুনাহ করা হয় এবং তওবা না করা হয়। তাই প্রত্যেক গুনাহর পর তওবা ও ইস্তেগফার করা জরুরি, আর রহমতের আশা করে গুনাহ অব্যাহত রাখা ঈমানের জন্য বড় ধোঁকা।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে গুনাহ থেকে বিরত রাখুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন।