গোনাহ করে তওবা না করে যদি কেউ মারা যায়, তাহলে এর বিধান কি।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।গোনাহ থেকে বেচে থাকাই জরুরি আমরা মানুষ আমাদের গোনাহ হয়ে যাবে আল্লাহ পাক কে ভয় করে আজাব কে ভয় করে তারপরও নফসের তাড়নায় গোনাহ করে। আল্লাহ পাক আজাব দিবেন এজন্য গোনাহ করা যাবেনা।যেহেতু রহম করার সম্ভাবনা আছে বেশি আবার ভয় ও হয় যদি কঠিন আজাব হয় এরকম মনে করে গোনাহ করলে ইমানে সমস্যা হবে কি
Answer
উত্তর:
প্রশ্ন ১:
“আমি যদি গুনাহ করার সময় এই মনে করি যে, গুনাহ করলে তওবা না করেই মারা যেতে পারি, অথবা পরে তওবা করব; আল্লাহ শাস্তি দেবেন বা ক্ষমা করবেন—এটা তাঁর ইচ্ছা। তবে তাঁর রহমতের সম্ভাবনা বেশি, শাস্তির ভয়ও আছে”—এমন চিন্তা করে গুনাহ করলে আমলি মুনাফেকির আশঙ্কা আছে, ইমানি মুনাফেকির নয়।
কারণ:
- ইমানি মুনাফেকি হলো অন্তরে কুফর লুকিয়ে রাখা, যা ঈমানকে ধ্বংস করে।
- আমলি মুনাফেকি হলো এমন খারাপ কাজ করা যা মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য, যেমন মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, ওয়াদা ভঙ্গ করা ইত্যাদি। গুনাহ করার সময় আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভর করে গুনাহ করা মুনাফিকদের একটি নিকৃষ্ট বৈশিষ্ট্য। যেমন হাদিসে এসেছে: “মুনাফিকের লক্ষণ তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে, আর আমানত রাখলে খেয়ানত করে।” (বুখারি, মুসলিম) তবে যদি কেউ গুনাহ করে তওবা না করার ইচ্ছা রাখে, তবে এটি মুস্তাহক্কারে আজাব (শাস্তির উপযুক্ত) হলেও ঈমান নষ্ট করে না যতক্ষণ না সে গুনাহকে হালাল মনে করে বা আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ বোধ না করে।
কোরআন ও হাদিসের দলিল:
- আল্লাহ বলেন: “যারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না এবং তাঁর শাস্তি থেকে নিরাপদ বোধ করে না, তারা সফলকাম।” (সূরা আ'রাফ: ৯৯)
- হাদিসে কুদসিতে এসেছে: “আমার বান্দা যতক্ষণ আমার কাছে ক্ষমা চায়, আমি তাকে ক্ষমা করতে প্রস্তুত। কিন্তু সে যদি গুনাহ করতে থাকে আর বলে, ‘আল্লাহ ক্ষমা করবেন’, তবে সে আমার সাথে ঠাট্টা করছে।” (বায়হাকি)
সারকথা:
গুনাহ করার সময় আল্লাহর রহমতের আশা রাখা ভালো, কিন্তু সেটাকে গুনাহ করার অজুহাত বানানো মুনাফিকি চিন্তা। তাই এই ধরনের মানসিকতা থেকে তওবা করা ফরজ।
প্রশ্ন ২:
“আমি যদি গুনাহ করার সময় এই মনে করি যে, আল্লাহর আজাবের ভয় আছে, কিন্তু তাঁর রহমতের সম্ভাবনা বেশি—তবুও নফসের তাড়নায় গুনাহ করে ফেলি”—এমন অবস্থায় ঈমান নষ্ট হয় না, তবে এটি ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ।
কারণ:
- ঈমান নষ্ট হওয়ার জন্য শর্ত হলো গুনাহকে হালাল মনে করা বা আল্লাহর শাস্তিকে অস্বীকার করা।
- কিন্তু কেউ যদি গুনাহ করেও তার পাপ বুঝতে পারে, আল্লাহর ভয় রাখে, এবং পরে তওবা করে, তবে তার ঈমান বজায় থাকে। যেমন হাদিসে এসেছে: “প্রত্যেক আদম সন্তান গুনাহগার, আর উত্তম গুনাহগার হলো যে তওবা করে।” (তিরমিজি)
সতর্কতা:
কিন্তু যদি কেউ মনে করে, “আল্লাহ তো রহীম, তাই গুনাহ করলেও তিনি ক্ষমা করবেন”—এবং এই চিন্তায় গুনাহ করে, তাহলে এটি আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ বোধ করার শামিল (مكر الله)। কোরআনে এসেছে: “তারা কি আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ বোধ করে? অথচ ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায় ছাড়া কেউই আল্লাহর কৌশল থেকে নিরাপদ বোধ করে না।” (সূরা আ'রাফ: ৯৯)
ফতোয়া:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন: “কেউ যদি গুনাহ করে কিন্তু তাকে হালাল না বলে, তবে সে কাফির হবে না।” (ফিকহে আকবর)
তবে ইবনে আবেদিন শামী (রহ.) সতর্ক করে বলেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমতের আশায় গুনাহ করে এবং তওবা না করে মরে, সে কঠিন আজাবের যোগ্য।” (রদ্দুল মুহতার)
সারকথা:
গুনাহ করার পর আল্লাহর রহমতের আশা রাখা এবং শাস্তির ভয় রাখা—উভয়টিই মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু গুনাহ করার সময় যদি কেউ “আল্লাহ তো ক্ষমা করবেন”—এই ধারণায় গুনাহ করে, তাহলে সেটি ইমানি দুর্বলতা এবং তওবা করা ওয়াজিব।
সুপারিশ:
১. সবসময় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন।
২. গুনাহ হয়ে গেলে সাথে সাথে তওবা করুন এবং আল্লাহর ভয় ও আশা উভয়টিকে সমান রাখুন।
৩. “আল্লাহ ক্ষমা করবেন”—এই চিন্তায় গুনাহ করা থেকে বিরত থাকুন।