ইসলামে মেয়েদের ঘরে অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়া সম্পর্কে।

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7346
Questioner: Fahmida Islam
Question Asked: 24 Oct 2026, 03:47 PM
Reviewed & Published: 24 Oct 2026, 04:56 PM
Views: 16
Tokens: 3,502
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

Assalamualaikum wa rahmatullahi wa barakatuh...Meyeder ghore obosthan korte bola ache .... meyeder versity giye graduate howa ar career gora ki islam bole?

Answer

ফতোয়া: মেয়েদের ঘরে অবস্থান, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়া সম্পর্কে

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

প্রশ্নের সারমর্ম

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—(১) মেয়েদের ঘরে অবস্থান করার নির্দেশ ইসলামে আছে কি? (২) মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে গ্র্যাজুয়েট হওয়া এবং ক্যারিয়ার গড়া ইসলামসম্মত কি?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

ইসলাম নারীকে ঘরে অবস্থানের মাধ্যমে সম্মান, সুরক্ষা ও পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে; তবে প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা-নীতির মধ্যে থেকে শিক্ষা অর্জন ও বৈধ পেশায় নিয়োজিত হওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে "ক্যারিয়ারই জীবনের লক্ষ্য" —এমন মনোভাব ইসলামসম্মত নয়; বরং শিক্ষা ও পেশা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীন-দুনিয়ার কল্যাণের الوسيلة (মাধ্যম)।


১. মেয়েদের ঘরে অবস্থান: কুরআন ও হাদীসের দলিল

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ "তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং পূর্বকালীন জাহেলিয়াতের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না।" — (সূরা আহযাব: ৩৩)

তাফসীর: ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, এ আয়াতে নারীদের ঘরে অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; এটি তাদের সম্মান ও পবিত্রতার সুরক্ষা। (তাফসীর ইবনে কাসীর, সূরা আহযাব: ৩৩)

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে লেখেন—এ আয়াত নারীদের জন্য ঘরকে সম্মান ও নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসেবে নির্ধারণ করেছে; তবে প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা রক্ষা করে বাইরে যাওয়ার অনুমতি অন্যান্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। (মা'আরিফুল কুরআন, ৭ম খণ্ড, সূরা আহযাব: ৩৩-এর তাফসীর)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

وَالْمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ عَلَى بَيْتِ زَوْجِهَا وَوَلَدِهِ "নারী তার স্বামীর ঘর ও সন্তান-সন্ততির দায়িত্বশীল।" — (সহীহ বুখারী: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম: ১৮২৯)

আরও ইরশাদ হয়েছে:

الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ "নারী (পর্দার) আড়ালে থাকার বিষয়; যখন সে বের হয়, শয়তান তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।" — (সুনানে তিরমিযী: ১১৭৩; মুসনাদে আহমাদ)

হানাফী ফিকহের ব্যাখ্যা: ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন—নারীর জন্য ঘরে অবস্থানই মূলনীতি (আসল); তবে প্রয়োজন (হাজত) ও নিরাপত্তার শর্তে শরীয়তের পর্দা-নীতিসহ বাইরে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। (রাদ্দুল মুহতার, ৯ম খণ্ড, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)


২. মেয়েদের শিক্ষা অর্জন: ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য শিক্ষা অর্জনকে গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ "জ্ঞান অর্জন প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ।" — (সুনানে ইবনে মাজাহ: ২২৪)

হানাফী উসূল: ইমাম আল-শাশী (রহ.) উসূলুশ শাশী-তে উল্লেখ করেন—যে ইলম ফরজে আইন (যেমন ঈমান, নামাজ, রোজা ইত্যাদির জ্ঞান), তা নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য আবশ্যক; আর ফরজে কিফায়া ও মুস্তাহাব ইলমও নারীদের জন্য প্রযোজ্য, শর্ত হলো পর্দা ও নিরাপত্তা রক্ষা। (উসূলুশ শাশী, পৃ. ২৭-২৮)

ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর যুগে নারী শিক্ষা: ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর কন্যা ও অন্যান্য নারী ফকীহ ছিলেন; ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর শিষ্য ইমাম যুফার (রহ.)-এর কন্যা ফিকহ শিখতেন—এটি প্রমাণ করে হানাফী মাযহাবে নারী শিক্ষার অনুমতি ছিল, তবে পর্দা-নীতির মধ্যে।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী যেওর-এ লেখেন—মেয়েদের জন্য দ্বীনী শিক্ষা ফরজ; আর দুনিয়াবী শিক্ষা প্রয়োজনের ভিত্তিতে অনুমোদিত, তবে পর্দা, নিরাপত্তা ও ফিতনা থেকে বেঁচে থাকার শর্তে। (বেহেশতী যেওর, ১ম খণ্ড, শিক্ষা অধ্যায়)


৩. বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও ক্যারিয়ার: শর্তসাপেক্ষ অনুমতি

মুফতি তাকী উসমানী (দা.বা.) ফতোয়া উসমানী-তে উল্লেখ করেন—মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও পেশা শরীয়তের সীমা রক্ষা সাপেক্ষে অনুমোদিত; শর্তগুলো হলো:

  1. পর্দা ও হিজাব: পুরুষ-নারী اختلاط (মিশ্রণ) থেকে বিরত থাকা, শরীয়তসম্মত পর্দা রক্ষা।
  2. মহরমের সাথে যাতায়াত: নিরাপদ ও শরীয়তসম্মত ব্যবস্থা।
  3. ফিতনার আশঙ্কা না থাকা: পরিবেশ ও পরিবেশগত নিরাপত্তা।
  4. শরীয়তের অগ্রাধিকার: দ্বীনী ফরজ ইলম আগে অর্জন করা।
  5. ক্যারিয়ারই লক্ষ্য নয়: শিক্ষা ও পেশা হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও উম্মাহর খেদমতের الوسيلة।

(ফতোয়া উসমানী, ৩য় খণ্ড, নারী শিক্ষা ও পেশা অধ্যায়; ইমদাদুল ফতোয়া, ৪র্থ খণ্ড)

ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) আরও উল্লেখ করেন—নারীর বাইরে যাওয়া মূলত নিষিদ্ধ নয়; বরং ফিতনার আশঙ্কা থাকলে নিষিদ্ধ। যদি নিরাপদ পরিবেশ ও শরীয়তের সীমা রক্ষা হয়, তবে শিক্ষা ও বৈধ প্রয়োজনে বের হওয়া জায়েয। (রাদ্দুল মুহতার, ৯ম খণ্ড)


৪. গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

  • দ্বীনী শিক্ষা অগ্রাধিকার: প্রথমে ফরজ ইলম (ঈমান, নামাজ, পবিত্রতা, পর্দা ইত্যাদি) শিখুন।
  • পর্দা-নীতি কঠোরভাবে রক্ষা: মিশ্র পরিবেশ, বেপর্দা যাতায়াত ও ফিতনাময় পরিবেশ থেকে বিরত থাকুন।
  • পরিবারের সম্মতি ও তত্ত্বাবধান: মা-বাবা বা মহরমের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে সিদ্ধান্ত নিন।
  • ক্যারিয়ারের লক্ষ্য সংশোধন: "ক্যারিয়ারই জীবনের উদ্দেশ্য" নয়; বরং শিক্ষা ও পেশা হবে ইবাদত ও খেদমতের الوسيلة।
  • নিরাপত্তা ও ফিতনার মূল্যায়ন: স্থানীয় পরিবেশ, যাতায়াত ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিন; প্রয়োজনে স্থানীয় মুফতি সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করুন।

উপসংহার

ইসলাম মেয়েদের ঘরে অবস্থানের মাধ্যমে সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে; তবে প্রয়োজনে শরীয়তের সীমা-নীতির মধ্যে থেকে শিক্ষা অর্জন ও বৈধ পেশায় নিয়োজিত হওয়ার অনুমতি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও ক্যারিয়ার গড়া নিজে থেকে নিষিদ্ধ নয়; বরং শর্ত হলো—পর্দা, নিরাপত্তা, ফিতনা থেকে বিরত থাকা এবং ক্যারিয়ারকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য না বানিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির الوسيلة বানানো। যদি এই শর্তগুলো রক্ষা করা সম্ভব না হয়, তবে ঘরে থেকে দ্বীনী শিক্ষা ও অনলাইন/নিরাপদ মাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষা অর্জনই উত্তম।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.