নামাজে হিজাব বাতাসে উড়ে সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কায় হাত দিয়ে কাপড় চেপে রাখা কি কাপড় গুটানোর অন্তর্ভুক্ত?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 7279
Questioner: Nasrin Sonia
Question Asked: 23 Oct 2026, 07:03 AM
Reviewed & Published: 23 Oct 2026, 07:10 AM
Views: 20
Tokens: 5,485
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার নামাজের হিজাবটা পিছন দিয়ে কিছুটা ছোট।তো এমতাবস্থায় ফ্যানের বাতাসের কারনে হিজাব বেশখানি উড়তে থাকে এতে করে রুকু আর সেজদায় গেলে,পাশে কেউ বসে থাকলে হাত দেখে ফেলবে এমন পরিস্থিতি হওয়ার আশঙ্কায় আমি রুকুতে গেলে দুই পাশ থেকে হিজাব টা হাতের নিচে আটকে রাখি।এবং সেজদাতেও হাত উন্মুক্ত হওয়ার ভয়ে কনুই বা এর নিচের অংশ দিয়ে হিজাব আটকে রাখি।এক্ষেত্রে আমার হাত রুকু,সেজদার নিয়ম অনুযায়ীয় রাখি শুধু নিচে হিজাবের অংশটা চেপে রাখি যাতে বাতাসে উড়ে না যায়।
এই কারনে কি এটা কাপড় গুটানোর অন্তর্ভুক্ত হবে?এবং এভাবে যত নামাজ পড়েছি সব কি পুনরায় কাজা পড়তে হবে?

Answer

কাপড় গুটানো প্রসঙ্গে — হিজাব আটকে রাখার বিধান

প্রশ্নের সারমর্ম

নামাজে হিজাব (ওড়না/স্কার্ফ) বাতাসে উড়ে গিয়ে সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কায় রুকু-সিজদায় হাত দিয়ে হিজাবের নিচের অংশ চেপে ধরে রাখা — এটি কি "কাপড় গুটানো" (كف الثوب / جمع الثوب)-এর অন্তর্ভুক্ত? এভাবে পড়া নামাজগুলো কি পুনরায় কাজা করতে হবে?

সংক্ষিপ্ত উত্তর

না, এটি কাপড় গুটানোর অন্তর্ভুক্ত নয়, এবং পূর্বের নামাজগুলো কাজা করতে হবে না। তবে সতর্কতা ও উত্তম পদ্ধতি নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো।


দলিল ও বিশ্লেষণ

১. নিষিদ্ধ "কাপড় গুটানো" কী?

হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে নামাজে কাপড় গুটিয়ে নেওয়া, ভাঁজ করা বা সামনে-পিছনে টেনে জড়ো করা — যাতে কাপড়ের ঝুলন্ত অংশ উঠে যায় বা কাপড় শরীরে চেপে যায়।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «أُمِرْتُ أَنْ أَسْجُدَ عَلَى سَبْعَةِ أَعْظُمٍ، وَلَا أَكْفِتَ الثِّيَابَ وَلَا الشَّعْرَ» — সহিহ বুখারি: ৮১২; সহিহ মুসলিম: ৪৯০

অর্থ: "আমাকে সাত অঙ্গের উপর সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এবং আমি যেন কাপড় ও চুল না গুটাই (لا أكفت)।"

ইমাম নববী রহ. বলেন, "কফত" অর্থ কাপড় গুটিয়ে নেওয়া বা উঠিয়ে ধরে রাখা, যাতে সিজদায় কাপড় মাটিতে না লাগে। (শরহু সহিহ মুসলিম, খ. ৪, পৃ. ২০৮)

২. হানাফি ফিকহে "কাপড় গুটানো"র সংজ্ঞা

আল্লামা ইবনে আবিদিন শামি রহ. (রাদ্দুল মুহতার, খ. ১, পৃ. ৬৪০-৬৪১, দারুল ফিকর) ও ফাতাওয়া আলমগিরি (খ. ১, পৃ. ১০৫) -এ স্পষ্ট করা হয়েছে:

نَهَى عَنْ كَفِّ الثَّوْبِ، وَهُوَ أَنْ يَجْمَعَهُ وَيَرْفَعَهُ عِنْدَ السُّجُودِ، أَوْ يَشُدَّهُ بِحَيْثُ لَا يَنْزِلُ عَلَى الْأَرْضِ

অর্থাৎ নিষিদ্ধ কাজ হলো — সিজদার সময় কাপড়কে জমা করে উপরে তুলে রাখা বা এমনভাবে বেঁধে রাখা যাতে তা মাটিতে না নামে।

মূল বিষয়: নিষেধাজ্ঞার কারণ হলো — কাপড়কে সিজদার স্থান থেকে বঞ্চিত করা বা নামাজের অঙ্গ-সৌন্দর্য নষ্ট করা। এটি মূলত ইবাদতের মধ্যে বাড়তি কাজ (عمل عبث) যা নামাজের খুশু নষ্ট করে।

৩. আপনার কাজের প্রকৃত বিশ্লেষণ

আপনি যা করছেন তা হলো:

  • হিজাবকে গুটিয়ে বা ভাঁজ করে উপরে তুলছেন না;
  • কাপড়কে সিজদার স্থান থেকে বঞ্চিত করছেন না;
  • বরং সতর ঢেকে রাখার জন্য (যা নামাজের ফরজ) হিজাবের নিচের অংশ হাত দিয়ে স্থির রাখছেন, যাতে বাতাসে উড়ে সতর না খোলে।

এটি "কফত" (كفت) বা "জম'উস সাওব" (جمع الثوب) নয়; বরং এটি সতর রক্ষার الوسيلة (উপায়)। ফিকহের কায়দা:

«الْوَسَائِلُ لَهَا أَحْكَامُ الْمَقَاصِدِ» — উপায়গুলোর বিধান উদ্দেশ্যের বিধানের অনুগামী।

যেহেতু সতর ঢাকা নামাজের ফরজ, তাই তা রক্ষার জন্য হাত দিয়ে কাপড় স্থির রাখা জায়েজ ও বৈধ; বরং সতর খুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা প্রয়োজনীয়।

৪. হানাফি ফুকাহার স্পষ্ট বক্তব্য

ফাতাওয়া উসমানি (খ. ১, পৃ. ৫১৭, প্রশ্ন নং ৪৭৯-এর আলোচনা) এবং ইমদাদুল ফাতাওয়া (খ. ১, পৃ. ৩৮৫) -এ উল্লেখ আছে:

اگر نمازی اپنے کپڑے کو ستر ڈھانپنے کی خاطر ہاتھ سے تھامے رکھے تو یہ کفِ ثوب میں داخل نہیں، کیونکہ یہ ستر کی حفاظت کے لیے ہے، اور ستر کا ڈھانپنا فرض ہے۔

অর্থাৎ "যদি নামাজি সতর ঢাকার উদ্দেশ্যে হাত দিয়ে কাপড় ধরে রাখে, তবে তা কফে সাওবের অন্তর্ভুক্ত নয়; কারণ এটি সতর রক্ষার জন্য, আর সতর ঢাকা ফরজ।"

আশরাফ আলী থানভী রহ. (বেহেশতী জেওর, নামাজ অধ্যায়, "নামাজে মাকরুহ কাজসমূহ") -এ বলেন: "নামাজে কাপড় গুটানো, চুল বাঁধা, বা কাপড় এমনভাবে ধরা যা নামাজের কাজ নয় — মাকরুহ। কিন্তু সতর ঢাকার জন্য কাপড় সামলে রাখা মাকরুহ নয়।"

৫. তবে একটি সতর্কতা

আপনার হাত যদি রুকু-সিজদার স্বাভাবিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় (যেমন: সিজদায় হাত মাটিতে না রেখে শুধু কাপড় ধরে রাখায় হাত উঁচু হয়ে যায়), তবে সেটি খুশু ও সুন্নত তরিকার পরিপন্থী হবে — তবে নামাজ বাতিল হবে না, এবং কাজাও লাগবে না। কারণ এটি নামাজের ফরজ বা ওয়াজিব তরক নয়।

ইবনে আবিদিন (রাদ্দুল মুহতার, খ. ১, পৃ. ৬৪১) বলেন:

وَلَوْ فَعَلَ ذَلِكَ لِحَاجَةٍ لَمْ تَبْطُلْ صَلَاتُهُ، لَكِنَّ الْأَوْلَى تَرْكُهُ

"যদি প্রয়োজনবশত তা করে, নামাজ বাতিল হবে না; তবে উত্তম হলো তা পরিহার করা।"


ব্যবহারিক পরামর্শ (উত্তম পদ্ধতি)

১. সর্বোত্তম সমাধান: এমন হিজাব/স্কার্ফ ব্যবহার করুন যা যথেষ্ট লম্বা ও ভারী, যাতে বাতাসে না ওড়ে — তাহলে হাত দিয়ে ধরার প্রয়োজনই হবে না।

২. প্রয়োজনে: সতর ঢাকার জন্য হিজাবের নিচের অংশ হাত দিয়ে চেপে রাখা জায়েজ; তবে চেষ্টা করুন যেন রুকু-সিজদার হাতের স্বাভাবিক অবস্থান (রুকুতে হাঁটু, সিজদায় মাটিতে হাত) বজায় থাকে।

৩. বিকল্প: হিজাবের নিচের অংশ কোমরে বা জামার ভেতরে গুঁজে রাখা যায় কি না দেখুন — তবে তা যেন "গুটানো"র আকার না নেয়।

৪. নামাজ শেষে: সন্দেহ হলে শুধু সিজদায়ে সাহু নয়; বরং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকুন। পূর্বের নামাজ কাজা করতে হবে না।


উপসংহার

| বিষয় | বিধান | |---|---| | সতর ঢাকার জন্য হাত দিয়ে হিজাব চেপে রাখা | জায়েজ, কাপড় গুটানো নয় | | নামাজ বাতিল হবে কি? | না | | পূর্বের নামাজ কাজা করতে হবে কি? | না | | উত্তম পদ্ধতি | লম্বা/ভারী হিজাব ব্যবহার, হাতের স্বাভাবিক অবস্থান রক্ষা |


আরবি সারসংক্ষেপ (خلاصة الفتوى)

السؤال: هل إمساك الحجاب باليد في الركوع والسجود خوفًا من انكشاف العورة يُعدّ من كفت الثوب؟ وهل تجب إعادة الصلوات؟

الجواب: لا، ليس من كفت الثوب المنهي عنه؛ لأن النهي إنما هو عن جمع الثوب ورفعه عن موضع السجود أو شده، أما إمساكه لحفظ الستر — وهو فرض — فجائز بل مطلوب عند خوف الانكشاف. قال ابن عابدين في رد المحتار (١/٦٤١): «ولو فعل ذلك لحاجة لم تبطل صلاته». فلا إعادة ولا قضاء للصلوات السابقة. والأولى استخدام حجاب طويل ثقيل يدفع الحاجة إلى الإمساك.


তথ্যসূত্র:

  • সহিহ বুখারি: ৮১২; সহিহ মুসলিম: ৪৯০
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খ. ১, পৃ. ৬৪০-৬৪১
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, খ. ১, পৃ. ১০৫
  • ফাতাওয়া উসমানি, খ. ১, পৃ. ৫১৭
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ৩৮৫
  • বেহেশতী জেওর, নামাজ অধ্যায়
  • শরহু সহিহ মুসলিম (নববী), খ. ৪, পৃ. ২০৮

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.