ফজর ও আসরের সময় তাহিয়্যাতুল অজু নামাজের হুকুম, ফজরের সুন্নতের সাথে নিয়ত, আসরের আগে নফল নামাজ, এবং আসরের এক রাকাআত পাওয়া না পেলে কাজা আদায়ের বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
১। আমাদের ক্লাসে পড়ানো হয়েছে, ফজরের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তাহিয়্যাতুল অজুর স্বলাত পড়া অনুচিত। তবে ফজরের সুন্নতের সঙ্গে তাহিয়্যাতুল অজুর নিয়ত করলে সওয়াব পাওয়া যাবে।
আবার দেরিতে ঘুম থেকে উঠলে সময়ের অভাবে শুধু ২ রাকাআত ফজরের ফরজ পড়ে নিষিদ্ধ সময় শেষ হলে তখন সুন্নত আদায় করা যাবে। আমি জানতে চাচ্ছি নিষিদ্ধ সময় অতিক্রম হওয়ার পর
তখন তাহিয়্যাতুল অজুর স্বলাত আদায়ের নিয়ম কী হবে?
২। আসরের ফরজ স্বলাতের আগে ২ রাকাআত তাহিয়্যাতুল অজুর নফল স্বলাত আদায়ের হুকুম কী?
৩। হাদিসে এসেছে, সূর্যাস্তের আগে আসরের এক রাকাআত পেলে আসর পাওয়া হয়েছে। (সুনানে নাসায়ি: ৫১৮)
কিন্তু সূর্যাস্তের নিষিদ্ধ সময় শুরু হওয়ার আগে এক রাকাআতও আদায় করা সম্ভব না হলে করণীয় কী? সূর্যাস্তের পর কি আসরের কাজা আদায় করতে হবে?
জাযাকুমুল্লাহু খ্বইরন
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
আপনার জিজ্ঞাসিত তিনটি প্রশ্নের ফাতাওয়া ও ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের সিদ্ধান্তের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ সুনির্দিষ্ট শরয়ী উত্তর নিচে ক্রমানুসারে পেশ করা হলো:
১. ফজরের ওয়াক্তে নিষিদ্ধ সময় অতিক্রম হওয়ার পর তাহিয়্যাতুল অযুর নামায আদায়ের নিয়ম:
-
মূল শরয়ী বিধান:
ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর (সুবহে সাদিকের পর) ফজরের ২ রাকাআত সুন্নাত ছাড়া অন্য যেকোনো নফল নামায পড়া ফিকহে হানাফীতে মাকরূহ । তবে ফজরের সুন্নাতের সাথে তাহিয়্যাতুল অযুর নিয়ত করলে সুন্নাত ও তাহিয়্যাতুল অযু উভয়ের সওয়াব পাওয়া যায় । -
নিষিদ্ধ সময় অতিক্রমের পর আদায়ের নিয়ম:
১. সূর্যোদয়ের সময় (সূর্য ওঠার পর থেকে প্রায় ১৫-২০ মিনিট পর্যন্ত, যখন সূর্যের তেজ প্রখর হয় না) নামায পড়া মাকরূহে তাহরীমী/নিষিদ্ধ ।
২. সূর্য ওঠার পর এই নিষিদ্ধ সময় অতিক্রান্ত হলে (অর্থাৎ ইশরাকের ওয়াক্ত শুরু হলে):- যদি নতুন করে অয়ূ করা হয়: তবে ২ রাকাআত তাহিয়্যাতুল অয়ূর নামায আলাদাভাবে আদায় করা মুস্তাহাব।
- যদি আগের অয়ূই বহাল থাকে: অয়ূ করার পরপরই (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ শুকানোর আগে বা অন্য কাজে ব্যস্ত হওয়ার পূর্বে) তাহিয়্যাতুল অয়ূ না পড়ায় উক্ত অয়ূর বিশেষ তাহিয়্যাতুল অয়ূর সুন্নাত সময়টি অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তাই এক্ষেত্রে আর আলাদা 'তাহিয়্যাতুল অয়ূ' নামে নামায পড়ার প্রয়োজন নেই; বরং ঐ সময়ে ২ বা ৪ রাকাআত ইশরাকের নফল নামায পড়ে নিলে সাধারণ নফলের সওয়াব অর্জিত হবে।
- ফজরের সুন্নাতের কাজা আদায়ের ক্ষেত্রে: যদি ফজরের ফরযের সাথে সুন্নাতও কাজা হয়ে থাকে এবং সূর্যোদয়ের পর তা কাজা হিসেবে পড়া হয়, তবে সেই সুন্নাতের সাথেও তাহিয়্যাতুল অযুর নিয়ত যুক্ত করে সওয়াব লাভ করা যায় ।
-
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা: ৫৫–৫৬ (অনুচ্ছেদ: নামাযের মাকরূহ ওয়াক্তসমূহ — সুবহে সাদিকের পর ফজরের সুন্নাত ব্যতীত অন্য নফল মাকরূহ হওয়া); পৃষ্ঠা: ১১৮ (অনুচ্ছেদ: তাহিয়্যাতুল মসজিদ ও তাহিয়্যাতুল অয়ূ)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৭ (৩য় অনুচ্ছেদ: নিষিদ্ধ ও মাকরূহ ওয়াক্তের বিবরণ)।
- ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৭ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৯২ (অধ্যায়: তাহিয়্যাতুল অয়ূর সাথে বিভিন্ন নফল নামাযের নিয়ত)।
২. আসরের ফরয নামাযের পূর্বে ২ রাকাআত তাহিয়্যাতুল অযুর হুকুম:
-
শরয়ী সিদ্ধান্ত: আসরের ফরয নামায পড়ার পূর্বে ২ রাকাআত তাহিয়্যাতুল অযুর নফল নামায পড়া সম্পূর্ণ জায়েয এবং মুস্তাহাব।
-
ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা:
ইসলামি ফিকহে নফল নামায পড়া নিষিদ্ধ বা মাকরূহ হয় আসরের ফরয নামায আদায় করার পর থেকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। আসরের ফরয নামায পড়ার পূর্বে নফল পড়া মোটেই মাকরূহ নয়; বরং আসরের ফরযের আগে ৪ রাকাআত সুন্নাতে গায়রে মুয়াক্কাদাহ বা ২ রাকাআত তাহিয়্যাতুল অয়ূ পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ । আপনি চাইলে আসরের আগের ৪ রাকাআত সুন্নাতের সাথেও তাহিয়্যাতুল অযুর নিয়ত মিলিয়ে নিতে পারেন। -
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা: ৫৫–৫৬ (অনুচ্ছেদ: নামাযের মাকরূহ ওয়াক্তসমূহ — আসরের ফরযের পর নফল মাকরূহ হওয়ার বিবরণ); পৃষ্ঠা: ১১২ (অনুচ্ছেদ: নফল নামাযের বর্ণনা)।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৭ (৩য় অনুচ্ছেদ: নিষিদ্ধ ও মাকরূহ ওয়াক্তের বিবরণ); পৃষ্ঠা: ২৯৪ (নবম পরিচ্ছেদ: নফল সালাতের বিবরণ)।
৩. সূর্যাস্তের পূর্বে এক রাকাআতও পাওয়া না গেলে করণীয় ও আসরের কাজা:
-
শরয়ী সিদ্ধান্ত:
১. সূর্যাস্তের মুহূর্তে পড়ার নিয়ম: যদি কোনো ব্যক্তি কোনো কারণে আসরের নামায বিলম্ব করে ফেলে এবং সূর্যাস্তের সময় সমাগত হয় (সূর্য হলুদ হয়ে যায়), তবুও সূর্য পুরোপুরি ডোবার আগে ঐ দিনের আসরের নামায পড়ে নেওয়া বাধ্যতামূলক ।
২. এক রাকাআতও না পেলে বা সূর্যাস্ত হয়ে গেলে: যদি কেউ সূর্যাস্তের পূর্বে নামাযে দাঁড়াতে না পারে বা ১ রাকাআতও আদায় করার আগেই সূর্য সম্পূর্ণ ডুবে যায়, তবে শরীআতের বিচারে ঐ দিনের আসরের নামাযের ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেছে এবং তা কাজা হয়ে গেছে ।
৩. সূর্যাস্তের পর করণীয়: সূর্য যখন ডুবতে থাকে (অস্তগমনকালে), তখন নামায শুরু করা মাকরূহে তাহরীমী। সূর্য পুরোপুরি ডুবে গেলে মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যায়। সূর্যাস্তের পর মাগরিবের ওয়াক্তে ঐ আসরের নামায কাজা (Qada) হিসেবে আদায় করতে হবে।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: যার জীবনে ৫ ওয়াক্তের বেশি নামায কাজা হয়নি (সাহেবে তারতীব), সে মাগরিবের নামাযের আগে আসরের কাজা পড়বে, যদি মাগরিবের ওয়াক্তে পর্যাপ্ত সময় থাকে। আর সময় কম থাকলে আগে মাগরিবের ফরয পড়ে নিয়ে তারপর আসরের কাজা আদায় করবে)। -
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৭ (৩য় অনুচ্ছেদ: নিষিদ্ধ ওয়াক্তের মধ্যে ওই দিনের আসরের নামাযের ব্যতিক্রমী বিধান); পৃষ্ঠা: ৩০২–৩০৩ (একাদশ পরিচ্ছেদ: কাযা সালাতের বিবরণ — কাজা নামায আদায়ের সুনির্দিষ্ট নিয়ম)।
- নূরুল ঈযাহ: পৃষ্ঠা: ৫৫ *(অনুচ্ছেদ: নামাযের মাকরূহ ওয়াক্তসমূহ); পৃষ্ঠা: ১২৯ (পরিচ্ছেদ: কাযা নামায আদায় করা)।
والله أعلم بالصواب