নখে অ্যাক্রিলিক/জেল নেইল এক্সটেনশন থাকলে অজু হবে কি?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 7274
Questioner: Farhana Oishy
Question Asked: 23 Oct 2026, 02:55 AM
Reviewed & Published: 23 Oct 2026, 07:00 AM
Views: 10
Tokens: 5,186
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমি বাংলাদেশে বসবাস করি এবং হানাফি মাজহাব অনুসরণ করি। আমি আজ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শুরু করতে চাই। কিন্তু আমার নখে পার্লার থেকে অ্যাক্রিলিক/জেল নেইল এক্সটেনশন লাগানো আছে। এটি এখন খুলতে গেলে আমার আসল নখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে এবং এই মুহূর্তে পার্লারে গিয়ে খোলানো সম্ভব নয়। আমি আগে অজু করে এক্সটেনশন লাগাইনি। এই অবস্থায় আমি কীভাবে অজু বা তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজ আদায় করব? ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে কি কোনো বিশেষ বিধান প্রযোজ্য হবে? অনুগ্রহ করে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী করণীয় জানাবেন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার নখে লাগানো অ্যাক্রিলিক/জেল নেইল এক্সটেনশন যেহেতু নখের উপর এমনভাবে আটকে আছে যে, তা সরানো ছাড়া নখে পানি পৌঁছায় না—সেহেতু তা অপসারণযোগ্য বাধা (مانع) হিসেবে গণ্য হবে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, অজু-গোসলের সময় নখ, চুল, ত্বকসহ সমস্ত অঙ্গে পানি পৌঁছানো ফরজ; কোনো বাধা থাকলে তার নিচে পানি না পৌঁছালে অজু-গোসল সহিহ হয় না। তবে আপনার ক্ষেত্রে যেহেতু এখনই তা খুললে আসল নখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা আছে এবং পার্লারে যাওয়া সম্ভব নয়—এমতাবস্থায় আপনি তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করবেন। আর যতদিন এই অপসারণযোগ্য বাধা থাকবে, ততদিন অজু-গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম করেই নামাজ আদায় করবেন; ইনশাআল্লাহ আপনার নামাজ আদায় হবে। পরে যখন নিরাপদে খুলতে পারবেন, তখন খুলে ফেলবেন এবং স্বাভাবিকভাবে অজু-গোসল করবেন।


বিস্তারিত ফিকহি আলোচনা

১. মূল নীতি: অজু-গোসলের অঙ্গে পানি পৌঁছানো ফরজ

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلَاةِ فَاغْسِلُوا وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ...» (সূরা মায়িদা: ৬)

অর্থ: “হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য দাঁড়াও, তখন তোমাদের মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো...”

হাদিসে নবী ﷺ বলেছেন:

«وَيْلٌ لِلْأَعْقَابِ مِنَ النَّارِ» (সহিহ বুখারি: ৬০, সহিহ মুসলিম: ২৪০)

অর্থ: “শুকনো গোড়ালির জন্য জাহান্নামের দুঃসংবাদ।”
অর্থাৎ যেখানে পানি পৌঁছায়নি, সেখানে শাস্তির সতর্কতা এসেছে। এ থেকেই ফকিহগণ বলেন, অজুর অঙ্গে এমন কোনো বস্তু থাকা চলবে না যা পানির পৌঁছানো প্রতিরোধ করে।

২. নখে নেইল পলিশ/এক্সটেনশন থাকলে অজু হয় কি?

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ নীতি হলো:

كل ما منع وصول الماء إلى البشرة يجب إزالته، وإلا لم يصح الوضوء والغسل.

অর্থ: “যে বস্তু ত্বকে পানির পৌঁছানো প্রতিরোধ করে, তা অপসারণ করা আবশ্যক; অন্যথায় অজু-গোসল সহিহ হবে না।”

আল্লামা ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেন, যদি নখের উপর এমন কিছু থাকে যা পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তবে তা সরানো ছাড়া অজু পূর্ণ হবে না। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুত তাহারাত, অজুর ফরজসমূহের আলোচনা)

আধুনিক ফকিহদের মধ্যে মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) ও মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.)-এর বক্তব্য হলো, নেইল পলিশ বা এমন প্রলেপ যা পানির পৌঁছানো রোধ করে, তা অজু-গোসলের সময় অপসারণ করতে হবে; অন্যথায় অজু-গোসল সহিহ হবে না। (দেখুন: ইমদাদুল ফাতাওয়া; ফাতাওয়া উসমানি, কিতাবুত তাহারাত)

তাই আপনার ক্ষেত্রে: অ্যাক্রিলিক/জেল নেইল এক্সটেনশন যেহেতু নখের উপর আটকে থাকে এবং নখে পানি পৌঁছাতে বাধা দেয়, তাই তা থাকা অবস্থায় সাধারণ অজু-গোসল সহিহ হবে না।

৩. কিন্তু এখন খুললে নখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা—তাহলে কী করবেন?

হানাফি ফিকহে তায়াম্মুমের বৈধতার একটি কারণ হলো:

المرض أو خوف الضرر باستعمال الماء

অর্থাৎ পানি ব্যবহারে রোগ হওয়া বা ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকলে তায়াম্মুম করা জায়েজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

«وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ... فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا...» (সূরা মায়িদা: ৬)

আর হাদিসে এসেছে:

«جُعِلَتْ لِيَ الْأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا» (সহিহ বুখারি: ৩৩৫, সহিহ মুসলিম: ৫২১)

অর্থ: “আমার জন্য পৃথিবীকে মসজিদ ও পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ বানানো হয়েছে।”

আল-হিদায়া ও ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে, যদি পানির ব্যবহারে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা এমন বাধা থাকে যা এখনই দূর করা সম্ভব নয় এবং ক্ষতির ভয় থাকে, তবে তায়াম্মুম করা বৈধ। (দেখুন: আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত, তায়াম্মুম অধ্যায়; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তাহারাত)

আপনার করণীয়:

  1. যেহেতু এখনই নেইল এক্সটেনশন খুললে আসল নখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা আছে এবং পার্লারে যাওয়া সম্ভব নয়—আপনি তায়াম্মুম করবেন।
  2. তায়াম্মুমের নিয়ম: পবিত্র মাটি/ধুলাযুক্ত কোনো বস্তু (যেমন: পবিত্র দেয়াল, মাটি, পাথর, কাঠ ইত্যাদি) হাতে মেরে মুখমণ্ডল ও কনুই পর্যন্ত দুই হাত মাসেহ করবেন।
  3. তায়াম্মুম করে ফজরের নামাজ আদায় করবেন। ইনশাআল্লাহ নামাজ সহিহ হবে।
  4. যতদিন এই অপসারণযোগ্য বাধা থাকবে এবং তা খুললে ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে, ততদিন তায়াম্মুম করেই নামাজ আদায় করবেন।
  5. পরে যখন নিরাপদে খুলতে পারবেন, তখন খুলে ফেলবেন এবং স্বাভাবিকভাবে অজু-গোসল করবেন।

৪. বিশেষ সতর্কতা

  • যদি কোনো কারণে নেইল এক্সটেনশন এমন হয় যে, তা সহজে খুলে ফেলা সম্ভব এবং ক্ষতির আশঙ্কা নেই—তাহলে তায়াম্মুম জায়েজ হবে না; বরং তা খুলে অজু-গোসল করাই আবশ্যক হবে।
  • তায়াম্মুম কেবল তখনই বৈধ যখন পানি ব্যবহারে প্রকৃত ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকে অথবা পানি ব্যবহার করা সম্ভব না হয়। শুধু “কষ্ট হবে” বা “সময় লাগবে” এ কারণে তায়াম্মুম জায়েজ নয়।
  • নামাজ ছেড়ে দেওয়া যাবে না—যে অবস্থায় আছেন, সে অবস্থায় তায়াম্মুম করে নামাজ আদায় করবেন। পরে সুযোগ হলে নেইল খুলে ফেলবেন এবং স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পবিত্রতা অর্জন করবেন।

৫. উপসংহার

আপনার বর্তমান অবস্থায়:

  • নেইল এক্সটেনশন থাকা অবস্থায় সাধারণ অজু-গোসল সহিহ হবে না।
  • এখনই তা খুললে নখ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকায় তায়াম্মুম করা জায়েজ।
  • তায়াম্মুম করে ফজরসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবেন।
  • পরে নিরাপদে খুলতে পারলে খুলে ফেলবেন এবং স্বাভাবিক অজু-গোসল করবেন।

আল্লাহ তা‘আলা আপনার ইবাদত কবুল করুন এবং সহজ করুন। আমিন।


তথ্যসূত্র:

  • আল-কুরআন: সূরা মায়িদা, আয়াত ৬
  • সহিহ বুখারি: হাদিস ৬০, ৩৩৫
  • সহিহ মুসলিম: হাদিস ২৪০, ৫২১
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুত তাহারাত
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুত তাহারাত
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুত তাহারাত
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভি)
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), কিতাবুত তাহারাত

আল্লাহ সর্বজ্ঞ।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.