গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিকে বাসায় রাখা নাকি ICU তে রাখা উচিত? ইসলামের দৃষ্টিতে করণীয় কি?

Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi

Question No: 7239
Questioner: oneway paradise
Question Asked: 22 Oct 2026, 09:43 AM
Reviewed & Published: 22 Oct 2026, 10:23 AM
Views: 24
Tokens: 5,254
This answer is according to the 'Ahle Hadith / Salafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামুআলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ, গুরুত্বর অসুস্থ ব্যক্তিদের কি ICU ভর্তি করানো উচিত? ICU রোগীদের অনেক কষ্ট হয়। তাঁরা তো ঠিক মতো খেতে ও পারে না।তাঁদেরকে নাকের মধ্যে নল প্রবেশ করিয়ে ওষুধ + তরল খাবার খাওয়ানো।আবার,রোগীরা থাকতেও চায় না।ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্হায় তো বাসায় এনে রাখা ও যায় না।মেশিনের সাপোর্ট দিয়ে লাইফ সার্পোট দিয়ে রাখা হয়।এ অবস্থায় রোগীর আত্নীয় স্বজনের করনীয় কি হবে?রোগীকে বাসায় রেখে দিবে?
ইসলামের দৃষ্টিতে করনীয় কি?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর

ইসলামের দৃষ্টিতে চিকিৎসা করানো বৈধ ও অনেক সময় কর্তব্য; তবে জীবনরক্ষাকারী কৃত্রিম ব্যবস্থা (life support) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হবে রোগীর প্রকৃত উপকার, ব্যথা-কষ্টের মাত্রা এবং চিকিৎসকের বিশ্বস্ত পরামর্শের ভিত্তিতে। "ICU-তে রাখা নাকি বাসায় রাখা" — এটি মূলত একটি চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত, ধর্মীয় বিধান নয়। ইসলাম যা বলে তা হলো:

১. জীবন রক্ষা করা শরীয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরীয়াহ)। ২. কষ্ট দেওয়া বা কষ্ট বাড়ানো নিষিদ্ধ; রোগীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। ৩. অপ্রয়োজনীয়/নিষ্ফল চিকিৎসা (futile treatment) চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বন্ধ করাও যাবে না। ৪. সিদ্ধান্ত নেবে যোগ্য ও বিশ্বস্ত মুসলিম চিকিৎসকদের পরামর্শে, পরিবারের সম্মতিতে — আবেগ বা অর্থনৈতিক চাপে নয়।


বিস্তারিত আলোচনা

১. চিকিৎসা করানো শরীয়তসম্মত — বরং নির্দেশিত

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً» — "চিকিৎসা করো; কারণ আল্লাহ তা'আলা এমন কোনো রোগ দেননি যার ঔষধও দেননি।" (আবু দাউদ ৩৮৫৫; তিরমিযী ২০৩৮ — শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)

অন্য হাদীসে:

«مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً» — (বুখারী ৫৬৭৮)

তবে চিকিৎসা করানো ওয়াজিব নয় (বেশিরভাগ ফকীহর মতে মুস্তাহাব/মুবাহ), কারণ আরোগ্য দানকারী আল্লাহ। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন — দেখুন যাদুল মা'আদ (৪/১৫ প্রসঙ্গ) ও মাজমূ' আল-ফাতাওয়া।

২. কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ — রোগীর মর্যাদা

রাসূল ﷺ বলেছেন:

«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» — "ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।" (ইবনু মাজাহ ২৩৪১; মালিকের মুওয়াত্তা — শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)

তাই এমন চিকিৎসা যা কেবল কষ্ট বাড়ায় কিন্তু আরোগ্যের সম্ভাবনা নেই — তা চাপিয়ে দেওয়া ইসলামসম্মত নয়। শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.) ও শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুমাল্লাহ) একাধিক ফাতাওয়ায় বলেছেন: যখন চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে আরোগ্যের আশা নেই এবং চিকিৎসা কেবল কষ্টই বাড়াচ্ছে, তখন জীবনরক্ষাকারী কৃত্রিম যন্ত্র বন্ধ করার অনুমতি আছে — তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে এবং রোগীর (বা তার ওয়ারিসের) সম্মতিতে হবে; কেউ নিজে হাতে বন্ধ করবে না।

৩. নাকের নল, ভেন্টিলেশন, লাইফ সাপোর্ট — এগুলো "চিকিৎসা", "হত্যা" নয়

  • নাকের নল (NG tube) দিয়ে খাবার/ঔষধ দেওয়া — এটি চিকিৎসার অংশ; রোগী নিজে খেতে অক্ষম হলে এটাই বৈধ পন্থা। এতে রোগীর ওপর জুলুম হয় না, বরং এটাই তার প্রয়োজনের খাদ্য পৌঁছানোর উপায়।
  • ভেন্টিলেশন/লাইফ সাপোর্ট — এটি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন সহায়তা। ইসলামি ফিকহ একাডেমি (মাজমা' আল-ফিকহ আল-ইসলামী, ওআইসি) ও শায়খ ইবনু উসাইমীনের ফাতাওয়া অনুযায়ী: যদি চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা স্থায়ীভাবে নষ্ট (brain death) বা আরোগ্যের কোনো আশা নেই, তাহলে যন্ত্র বন্ধ করার অনুমতি আছে — এটি হত্যা নয়, কারণ মৃত্যু আল্লাহরই নির্ধারিত, যন্ত্র কেবল উপকরণ।
  • কিন্তু জীবিত ও সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে যন্ত্র বন্ধ করা বা চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করা জায়েয নয়।

৪. রোগী "থাকতে চায় না" — এ কথা কীভাবে বুঝবেন?

  • রোগীর কথা যদি সচেতন অবস্থায় হয় এবং সে চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করে — ইসলামে নিজের জীবন ধ্বংস করা নিষিদ্ধ (সূরা আন-নিসা ৪:২৯)। তবে কষ্টের কারণে সে এমন বলছে — এটা তার অসহায়ত্বের প্রকাশ, শরীয়তের বিধান নয়।
  • অচেতন/ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্থায় রোগীর "না চাওয়া" বিবেচনায় আসে না; তখন ওয়ারিস ও চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তই প্রযোজ্য।
  • পরিবারের কর্তব্য: রোগীর পাশে থাকা, দু'আ করা, সদকা করা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা — এগুলোই সর্বোত্তম ইবাদত। রাসূল ﷺ রোগী দেখতে যাওয়া ও দু'আ করার নির্দেশ দিয়েছেন (মুসলিম ২২০২)।

৫. বাসায় রাখা নাকি ICU-তে রাখা — ইসলামি মানদণ্ড

| বিষয় | ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি | |---|---| | চিকিৎসকের পরামর্শ | মানতে হবে, কারণ তারা বিশেষজ্ঞ — «فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ» (আন-নাহল ১৬:৪৩) | | আরোগ্যের আশা | থাকলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া; না থাকলে কষ্ট কমানোর ব্যবস্থা (palliative care) | | রোগীর কষ্ট | অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়ানো ওয়াজিব পর্যায়ের | | পরিবারের সামর্থ্য | অর্থনৈতিক চাপে চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়, তবে অপচয়ও নিষিদ্ধ | | রোগীর ইচ্ছা (সচেতন থাকলে) | সম্মান করতে হবে, তবে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায় এমন কিছু নয় |

সিদ্ধান্ত: যদি চিকিৎসকরা বলেন ICU-তে রাখলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে — রাখুন, এটাই ইসলামের নির্দেশ। আর যদি বলেন আরোগ্যের আশা নেই, কেবল যন্ত্রে জীবন টিকে আছে — তাহলে চিকিৎসকদের সাথে পরামর্শ করে কষ্ট কমানোর (palliative) ব্যবস্থা নিন এবং প্রয়োজনে যন্ত্র প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিন; এটি ইসলামে অনুমোদিত (শায়খ ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব; শায়খ আল-ফাওযান, আল-মুনতাক্বা)।

৬. ওয়ারিসদের জন্য বিশেষ কর্তব্য

১. দু'আ ও সদকা — রোগীর জন্য বেশি বেশি দু'আ করুন; রাসূল ﷺ বলেছেন রোগীর দু'আ কবুল হয় (তিরমিযী ৯৬৯)। ২. চিকিৎসকের সাথে সৎ পরামর্শ — লুকিয়ে চিকিৎসা বন্ধ করবেন না, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ৩. রোগীর সাথে সদ্ব্যবহার — কষ্টের সময় ধৈর্য ধরুন; রাসূল ﷺ বলেছেন: «عُودُوا الْمَرِيضَ» (বুখারী ১২৪০)। ৪. অতিরিক্ত কষ্ট না দেওয়া — অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা নিষ্ফল চিকিৎসা চাপিয়ে দেবেন না। ৫. মৃত্যুর প্রস্তুতি — রোগীকে কালিমা পড়তে উৎসাহ দিন; রাসূল ﷺ বলেছেন: «لَقِّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ» (মুসলিম ৯১৬)। ৬. ওয়াসিয়্যাত ও ঋণ — রোগীর ঋণ, ওয়াসিয়্যাত ইত্যাদি সময়মতো সম্পন্ন করুন।


সারসংক্ষেপ

  • চিকিৎসা করানো বৈধ ও কর্তব্য — তবে আরোগ্য আল্লাহর হাতে।
  • ICU-তে রাখা বা না রাখা — এটি চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত; ইসলাম বলে: প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাও, অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়াও, নিষ্ফল চিকিৎসা চাপিয়ে দিও না।
  • নাকের নল, ভেন্টিলেশন — এগুলো চিকিৎসার অংশ, নিষিদ্ধ নয়; তবে আরোগ্যের আশা না থাকলে চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রত্যাহার করা জায়েয।
  • রোগীকে বাসায় রাখা — যদি চিকিৎসকরা বলেন বাসায় রাখলে ক্ষতি হবে, তাহলে রাখা যাবে না; আর যদি বলেন আরোগ্যের আশা নেই, তাহলে বাসায় এনে কষ্ট কমানোর ব্যবস্থা করা যায়।
  • সর্বোপরি: আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, দু'আ, সদকা ও ধৈর্য — এগুলোই মুমিনের আসল অবলম্বন।

«وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ» — "আর আমি অসুস্থ হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।" (সূরা আশ-শু'আরা ২৬:৮০)

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.