গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিকে বাসায় রাখা নাকি ICU তে রাখা উচিত? ইসলামের দৃষ্টিতে করণীয় কি?
Miscellaneous Fiqh · Ahle Hadith / Salafi
Question
ইসলামের দৃষ্টিতে করনীয় কি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
ইসলামের দৃষ্টিতে চিকিৎসা করানো বৈধ ও অনেক সময় কর্তব্য; তবে জীবনরক্ষাকারী কৃত্রিম ব্যবস্থা (life support) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হবে রোগীর প্রকৃত উপকার, ব্যথা-কষ্টের মাত্রা এবং চিকিৎসকের বিশ্বস্ত পরামর্শের ভিত্তিতে। "ICU-তে রাখা নাকি বাসায় রাখা" — এটি মূলত একটি চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত, ধর্মীয় বিধান নয়। ইসলাম যা বলে তা হলো:
১. জীবন রক্ষা করা শরীয়তের অন্যতম মৌলিক উদ্দেশ্য (মাকাসিদুশ শরীয়াহ)। ২. কষ্ট দেওয়া বা কষ্ট বাড়ানো নিষিদ্ধ; রোগীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। ৩. অপ্রয়োজনীয়/নিষ্ফল চিকিৎসা (futile treatment) চাপিয়ে দেওয়া যাবে না, আর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বন্ধ করাও যাবে না। ৪. সিদ্ধান্ত নেবে যোগ্য ও বিশ্বস্ত মুসলিম চিকিৎসকদের পরামর্শে, পরিবারের সম্মতিতে — আবেগ বা অর্থনৈতিক চাপে নয়।
বিস্তারিত আলোচনা
১. চিকিৎসা করানো শরীয়তসম্মত — বরং নির্দেশিত
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً» — "চিকিৎসা করো; কারণ আল্লাহ তা'আলা এমন কোনো রোগ দেননি যার ঔষধও দেননি।" (আবু দাউদ ৩৮৫৫; তিরমিযী ২০৩৮ — শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)
অন্য হাদীসে:
«مَا أَنْزَلَ اللَّهُ دَاءً إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ شِفَاءً» — (বুখারী ৫৬৭৮)
তবে চিকিৎসা করানো ওয়াজিব নয় (বেশিরভাগ ফকীহর মতে মুস্তাহাব/মুবাহ), কারণ আরোগ্য দানকারী আল্লাহ। ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ ও ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন — দেখুন যাদুল মা'আদ (৪/১৫ প্রসঙ্গ) ও মাজমূ' আল-ফাতাওয়া।
২. কষ্ট দেওয়া নিষিদ্ধ — রোগীর মর্যাদা
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» — "ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতিগ্রস্তও করা যাবে না।" (ইবনু মাজাহ ২৩৪১; মালিকের মুওয়াত্তা — শায়খ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন)
তাই এমন চিকিৎসা যা কেবল কষ্ট বাড়ায় কিন্তু আরোগ্যের সম্ভাবনা নেই — তা চাপিয়ে দেওয়া ইসলামসম্মত নয়। শায়খ ইবনু উসাইমীন (রহ.) ও শায়খ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুমাল্লাহ) একাধিক ফাতাওয়ায় বলেছেন: যখন চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে আরোগ্যের আশা নেই এবং চিকিৎসা কেবল কষ্টই বাড়াচ্ছে, তখন জীবনরক্ষাকারী কৃত্রিম যন্ত্র বন্ধ করার অনুমতি আছে — তবে এটি অবশ্যই চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তে এবং রোগীর (বা তার ওয়ারিসের) সম্মতিতে হবে; কেউ নিজে হাতে বন্ধ করবে না।
৩. নাকের নল, ভেন্টিলেশন, লাইফ সাপোর্ট — এগুলো "চিকিৎসা", "হত্যা" নয়
- নাকের নল (NG tube) দিয়ে খাবার/ঔষধ দেওয়া — এটি চিকিৎসার অংশ; রোগী নিজে খেতে অক্ষম হলে এটাই বৈধ পন্থা। এতে রোগীর ওপর জুলুম হয় না, বরং এটাই তার প্রয়োজনের খাদ্য পৌঁছানোর উপায়।
- ভেন্টিলেশন/লাইফ সাপোর্ট — এটি কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালন সহায়তা। ইসলামি ফিকহ একাডেমি (মাজমা' আল-ফিকহ আল-ইসলামী, ওআইসি) ও শায়খ ইবনু উসাইমীনের ফাতাওয়া অনুযায়ী: যদি চিকিৎসকরা নিশ্চিত হন যে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা স্থায়ীভাবে নষ্ট (brain death) বা আরোগ্যের কোনো আশা নেই, তাহলে যন্ত্র বন্ধ করার অনুমতি আছে — এটি হত্যা নয়, কারণ মৃত্যু আল্লাহরই নির্ধারিত, যন্ত্র কেবল উপকরণ।
- কিন্তু জীবিত ও সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে যন্ত্র বন্ধ করা বা চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করা জায়েয নয়।
৪. রোগী "থাকতে চায় না" — এ কথা কীভাবে বুঝবেন?
- রোগীর কথা যদি সচেতন অবস্থায় হয় এবং সে চিকিৎসা প্রত্যাখ্যান করে — ইসলামে নিজের জীবন ধ্বংস করা নিষিদ্ধ (সূরা আন-নিসা ৪:২৯)। তবে কষ্টের কারণে সে এমন বলছে — এটা তার অসহায়ত্বের প্রকাশ, শরীয়তের বিধান নয়।
- অচেতন/ভেন্টিলেশনে থাকা অবস্থায় রোগীর "না চাওয়া" বিবেচনায় আসে না; তখন ওয়ারিস ও চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তই প্রযোজ্য।
- পরিবারের কর্তব্য: রোগীর পাশে থাকা, দু'আ করা, সদকা করা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা — এগুলোই সর্বোত্তম ইবাদত। রাসূল ﷺ রোগী দেখতে যাওয়া ও দু'আ করার নির্দেশ দিয়েছেন (মুসলিম ২২০২)।
৫. বাসায় রাখা নাকি ICU-তে রাখা — ইসলামি মানদণ্ড
| বিষয় | ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি | |---|---| | চিকিৎসকের পরামর্শ | মানতে হবে, কারণ তারা বিশেষজ্ঞ — «فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ» (আন-নাহল ১৬:৪৩) | | আরোগ্যের আশা | থাকলে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া; না থাকলে কষ্ট কমানোর ব্যবস্থা (palliative care) | | রোগীর কষ্ট | অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়ানো ওয়াজিব পর্যায়ের | | পরিবারের সামর্থ্য | অর্থনৈতিক চাপে চিকিৎসা বন্ধ করা উচিত নয়, তবে অপচয়ও নিষিদ্ধ | | রোগীর ইচ্ছা (সচেতন থাকলে) | সম্মান করতে হবে, তবে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায় এমন কিছু নয় |
সিদ্ধান্ত: যদি চিকিৎসকরা বলেন ICU-তে রাখলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে — রাখুন, এটাই ইসলামের নির্দেশ। আর যদি বলেন আরোগ্যের আশা নেই, কেবল যন্ত্রে জীবন টিকে আছে — তাহলে চিকিৎসকদের সাথে পরামর্শ করে কষ্ট কমানোর (palliative) ব্যবস্থা নিন এবং প্রয়োজনে যন্ত্র প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিন; এটি ইসলামে অনুমোদিত (শায়খ ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব; শায়খ আল-ফাওযান, আল-মুনতাক্বা)।
৬. ওয়ারিসদের জন্য বিশেষ কর্তব্য
১. দু'আ ও সদকা — রোগীর জন্য বেশি বেশি দু'আ করুন; রাসূল ﷺ বলেছেন রোগীর দু'আ কবুল হয় (তিরমিযী ৯৬৯)। ২. চিকিৎসকের সাথে সৎ পরামর্শ — লুকিয়ে চিকিৎসা বন্ধ করবেন না, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ৩. রোগীর সাথে সদ্ব্যবহার — কষ্টের সময় ধৈর্য ধরুন; রাসূল ﷺ বলেছেন: «عُودُوا الْمَرِيضَ» (বুখারী ১২৪০)। ৪. অতিরিক্ত কষ্ট না দেওয়া — অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা নিষ্ফল চিকিৎসা চাপিয়ে দেবেন না। ৫. মৃত্যুর প্রস্তুতি — রোগীকে কালিমা পড়তে উৎসাহ দিন; রাসূল ﷺ বলেছেন: «لَقِّنُوا مَوْتَاكُمْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ» (মুসলিম ৯১৬)। ৬. ওয়াসিয়্যাত ও ঋণ — রোগীর ঋণ, ওয়াসিয়্যাত ইত্যাদি সময়মতো সম্পন্ন করুন।
সারসংক্ষেপ
- চিকিৎসা করানো বৈধ ও কর্তব্য — তবে আরোগ্য আল্লাহর হাতে।
- ICU-তে রাখা বা না রাখা — এটি চিকিৎসা-সিদ্ধান্ত; ইসলাম বলে: প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে যাও, অপ্রয়োজনীয় কষ্ট এড়াও, নিষ্ফল চিকিৎসা চাপিয়ে দিও না।
- নাকের নল, ভেন্টিলেশন — এগুলো চিকিৎসার অংশ, নিষিদ্ধ নয়; তবে আরোগ্যের আশা না থাকলে চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রত্যাহার করা জায়েয।
- রোগীকে বাসায় রাখা — যদি চিকিৎসকরা বলেন বাসায় রাখলে ক্ষতি হবে, তাহলে রাখা যাবে না; আর যদি বলেন আরোগ্যের আশা নেই, তাহলে বাসায় এনে কষ্ট কমানোর ব্যবস্থা করা যায়।
- সর্বোপরি: আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, দু'আ, সদকা ও ধৈর্য — এগুলোই মুমিনের আসল অবলম্বন।
«وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ» — "আর আমি অসুস্থ হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।" (সূরা আশ-শু'আরা ২৬:৮০)
والله أعلم بالصواب