হায়েজ ৭ দিনের অভ্যাস থাকলেও ৮-৯ দিন রক্ত এলে নামাজ পড়া যাবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আচ্ছা আমার পিরিয়ড ১০ দিন এর ভিতরে যেদিন সাদা আরব দেখব সে দিন এ সালাত পড়বো?
২।সাদা স্রাব দেখার আগে গোসল করলে পরে আবার ব্লিডিং হলে এর বিধান কি?
Answer
হায়েজ (মাসিক) নিয়ে প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর
ওয়া আলাইকুম আসসালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
জবাব
সন্তান হওয়ার পর হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণে মহিলাদের হায়েজের (পিরিয়ড) দিনসংখ্যা বা অভ্যাসে পরিবর্তন আসা একটি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আপনার মনের সংশয় ও বিভ্রান্তি দূর করার জন্য ফাতাওয়া ও ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের সুস্পষ্ট মূলনীতি ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:
১. আপনার শোনা ধারণাটি ভুল হওয়ার কারণ ও সঠিক ফিকহী বিধান:
-
শোনা নিয়মটি আপনার ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার কারণ:
আপনি যে শুনেছেন—"পূর্বের অভ্যাস (আদাত) ৭ দিন হলে ৮ বা ৯ দিনের দিন রক্ত থাকলেও সালাত শুরু করতে হবে"— এই তথ্যটি আপনার পরিস্থিতির জন্য সম্পূর্ণ ভুল এবং মাসআলার ভুল প্রয়োগমাত্র। -
হানাফী ফিকহের অকাট্য মূলনীতি:
১. ইসলামি শরীআতে হায়েজের সর্বোচ্চ সময়সীমা হলো ১০ দিন ১০ রাত (২৪০ ঘণ্টা)।
২. অভ্যাস পরিবর্তন (انتقال العادة): কোনো নারীর পূর্বের পিরিয়ডের অভ্যাস যদি ৭ দিন থাকে, কিন্তু কোনো মাসে তা ৭ দিন অতিক্রম করে ৮ বা ৯ দিন পর্যন্ত গড়ায় এবং ১০ দিনের ভেতরেই রক্ত বন্ধ হয়ে সাদা স্রাব এসে যায়, তবে শরীআতের বিচারে পুরো ৮ বা ৯ দিনই হায়েজ (মাসিক) হিসেবে গণ্য হবে। এতে বোঝা যাবে যে সন্তান হওয়ার পর আপনার পূর্বের ৭ দিনের অভ্যাসটি পরিবর্তিত হয়ে এখন নতুন ৮ বা ৯ দিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ।
৩. রক্ত থাকা অবস্থায় সালাত না পড়ার কারণ: যেহেতু রক্ত বা স্রাব ১০ দিনের সীমার ভেতরে রয়েছে, তাই সাদা স্রাব প্রকাশ পাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই রক্তকে হায়েজের রক্ত বলেই গণ্য করতে হবে। আর হায়েজ অবস্থায় সালাত আদায় করা শরীআতে সম্পূর্ণ হারাম ও নিষিদ্ধ । তাই ১০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে রক্ত থাকা অবস্থায় সালাত পড়া যাবে না। -
তাহলে ঐ শোনা মাসআলাটি কখন প্রযোজ্য?
ঐ নিয়মটি কেবল তখনই প্রযোজ্য হয়, যখন কারো রক্ত ১০ দিন ১০ রাত অতিক্রম করে ১১ বা ১২ দিন পর্যন্ত অনবরত আসতেই থাকে (যা ইস্তিহাযা বা ব্যধিজনিত রক্ত)। কেবল রক্ত ১০ দিন পার হয়ে গেলে প্রমাণিত হয় যে রক্তটি ব্যাধিজনিত; তখন হিসাব গণনা পেছনে গিয়ে ৭ দিনের অভ্যাসে ফিরে যায় এবং ৮ থেকে পরবর্তী দিনগুলোর সালাত কাযা করতে হয় । কিন্তু আপনার রক্ত যেহেতু ৮ বা ৯ দিনের দিন সাদা স্রাব এসে ১০ দিনের ভেতরেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাই আপনার ক্ষেত্রে ৮ বা ৯ দিন পুরোটাই হায়েজ; এতে কোনো সালাত কাযাও করতে হবে না ।
২. ১০ দিনের ভেতরে যেদিন সাদা স্রাব দেখবেন সে দিনই কি সালাত পড়বেন?
- উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই!
১০ দিনের ভেতরে (যেমন ৮ম বা ৯ম দিনে) আপনি যখনই নিশ্চিতভাবে সাদা স্রাব দেখবেন বা রক্ত পড়া পুরোপুরি বন্ধ হতে দেখবেন, ঠিক তখনই আপনার হায়েজ শেষ হয়েছে বলে গণ্য হবে। আপনি ওই সময়েই ফরয গোসল সম্পন্ন করে সালাত পড়া শুরু করবেন।
৩. সাদা স্রাব দেখার আগেই গোসল করে ফেললে এবং পরে আবার ব্লিডিং হলে এর বিধান:
- শরয়ী সিদ্ধান্ত:
যদি আপনি সাদা স্রাব দেখার আগেই (অর্থাৎ রক্ত বা বাদামী/ঘোলা স্রাব পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আগেই) তাড়াহুড়ো করে গোসল করে ফেলেন এবং পরবর্তীতে ১০ দিনের মেয়াদের ভেতরেই আবার ব্লিডিং বা লাল/বাদামী রক্ত দেখা যায়, তবে:
১. আপনার পূর্বে করা গোসলটি হায়েজ থেকে চূড়ান্ত পবিত্রতার জন্য সহীহ বা কার্যকর হয়নি।
২. রক্ত বন্ধ থাকা ও পুনরায় ব্লিডিং হওয়ার মধ্যবর্তী সময় এবং পরবর্তী ব্লিডিংয়ের দিনগুলো—সবই ১০ দিনের ভেতরে থাকার কারণে পুরোটাই হায়েজের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।
৩. ঐ সময়ে ভুলবশত পড়া সালাতগুলো হায়েজ অবস্থাতেই পড়া হয়েছিল বলে গণ্য হবে (ভুলের কারণে গুনাহ হবে না)।
৪. বর্তমান করণীয়: এখন আপনাকে পুনরায় রক্ত পুরোপুরি বন্ধ হওয়া বা সাদা স্রাব স্পষ্ট হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সাদা স্রাব দেখা দেওয়ার পর নতুন করে ফরয গোসল আদায় করে সালাত শুরু করতে হবে।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১১৫ (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ৩য় পরিচ্ছেদ: হায়েয ও ইস্তিহাযার আহকাম): (রক্ত ১০ দিন অতিক্রম না করলে অভ্যাসের অতিরিক্ত দিনগুলোও হায়েজ হিসেবে গণ্য হওয়া, অভ্যাস পরিবর্তন হওয়া এবং ১০ দিন অতিক্রম করলে অভ্যাসে ফিরে যাওয়া সংক্রান্ত অকাট্য প্রামাণ্য মাসআলা) **।
- পৃষ্ঠা: ১১২ (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত, ১ম পরিচ্ছেদ: হায়েযের বিবরণ): (সাদা স্রাব প্রকাশের মাধ্যমে হায়েজ শেষ হওয়ার ফিকহী আলামত) **।
২. নূরুল ঈযাহ:
- পৃষ্ঠা: ৪৬–৪৭ (পরিচ্ছেদ: হায়েজ, নেফাস ও ইস্তিহাযার বিবরণ): (হায়েজের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১০ দিন হওয়া, সাদা স্রাব দেখা দিলে গোসল ও সালাত ফরয হওয়া এবং হায়েজ অবস্থায় সালাত পড়া নিষিদ্ধ হওয়া) **।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (৫ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৯৭–১৯৯ (অধ্যায়: বাবুল হায়েয ওয়াল ইস্তিহাযাহ): (১০ দিনের ভেতরে দুই রক্তের মধ্যবর্তী বিরতি ও পুনরায় দেখা দেওয়া রক্ত হায়েজ হওয়া এবং অসম্পূর্ণ গোসলের পর পুনরায় গোসল করার ফিকহী বিধান) **।
আল্লাহ ভালো জানেন।