ইস্তিখারা করার পরও দুই দিক সমান মনে হলে কী করবো?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী — দুই দিকই হালাল, উভয়ের পক্ষে যুক্তি আছে, ইস্তিখারা ও ইস্তিগফারও করেছেন, কিন্তু কোনো দিকে ঝোঁক তৈরি হচ্ছে না — এমতাবস্থায় আপনি দোষী হবেন না। ইসলামে এমন অবস্থার জন্য সুস্পষ্ট নীতি রয়েছে: (১) ইস্তিখারার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর উপর ভরসা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, স্বপ্ন বা বিশেষ ইশারা পাওয়া নয়; (২) দুই দিক সমান হলে বিশ্বস্ত ও দ্বীনদার পরামর্শদাতার (মুশাওয়ারা) মত নেওয়া; (৩) তাতেও সমান থাকলে কুরআন-সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও অধিক কল্যাণকর (আরওফ/আসলাহ) দিকটি বেছে নেওয়া; (৪) এরপর যে দিকই নিন — তাওাক্কুলের সাথে নিন, আর "ভুল হয়ে গেল কি না" এই الوسواسে পড়বেন না। হাদিসে এসেছে, ইস্তিখারার পর যে দিকই হয়, আল্লাহ তাতে কল্যাণ রেখে দেন — এটাই ইস্তিখারার মূল প্রতিশ্রুতি।
বিস্তারিত আলোচনা
১. ইস্তিখারার আসল মর্ম — ইশারা নয়, তাওাক্কুল ও দুআ
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের সব কাজে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেমন সূরা শেখাতেন। দুআটি হলো:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي — أَوْ قَالَ: عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ — فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّهُ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي — أَوْ قَالَ: فِي عَاجِلِ أَمْرِي وَآجِلِهِ — فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ
(সহিহ বুখারি: ১১৬৬, ৬৩৮২; সহিহ মুসলিম: ১৭৬৩; সুনানে আবু দাউদ: ১৫৩৮; সুনানে তিরমিজি: ৪৮০)
লক্ষণীয়: হাদিসে স্বপ্ন, খোলা-বন্ধ, ইশারা বা বিশেষ আলামতের কোনো উল্লেখ নেই। বরং আছে — আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা, তারপর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকা। ইমাম নববী (রহ.) শরহু সহিহ মুসলিম-এ বলেন, ইস্তিখারার পর যা সহজ হয় বা অন্তর যেদিকে ঝোঁকে সেদিকেই অগ্রসর হওয়া উচিত; আর ইস্তিখারাকারীর উচিত নিজের প্রবণতা ও পক্ষপাতমুক্ত হয়ে দুআ করা। (আল-মিনহাজ, অধ্যায়: ইস্তিখারা)
ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (২/২৬ প্রসঙ্গ, ইস্তিখারা-অধ্যায়) ও মোল্লা আলী কারী (রহ.) মিরকাতুল মাফাতিহ-এ (ইস্তিখারার হাদিসের ব্যাখ্যা) স্পষ্ট করেছেন — ইস্তিখারায় শর্ত হলো অন্তরের পক্ষপাত পরিহার করে সম্পূর্ণ আল্লাহমুখী হওয়া; নইলে দুআর প্রভাব অন্তরে প্রতিফলিত হয় না। আপনার ক্ষেত্রে সমস্যাটি এখানেই — আপনি দুই দিককেই সমান যুক্তিসঙ্গত দেখছেন, তাই অন্তরে ঝোঁক তৈরি হচ্ছে না। এটি আপনার দোষ নয়।
২. দুই দিক সমান হলে — মুশাওয়ারা (পরামর্শ)
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا خَابَ مَنِ اسْتَخَارَ، وَلَا نَدِمَ مَنِ اسْتَشَارَ
"যে ইস্তিখারা করল সে ব্যর্থ হয় না, আর যে পরামর্শ (ইস্তিশারা) করল সে অনুতপ্ত হয় না।" (তিরমিজি: ২৮২২-এর সমর্থনে বর্ণিত; আলবানি সহিহ বলেছেন; দেখুন: সিলসিলা সহিহা: ১৩২৬; তিরমিজি, কিতাবুল জিহাদ)
ইমাম তহতাবি ও মোল্লা আলী কারী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন — ইস্তিখারা আল্লাহর সাথে পরামর্শ, আর ইস্তিশারা মানুষের সাথে পরামর্শ; দুটো একসাথে করলে সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। (মিরকাতুল মাফাতিহ, হাদিস নং ২৮২২-এর ব্যাখ্যা)
আপনার করণীয়: আজ বিকেলের আগে অন্তত একজন বিশ্বস্ত, দ্বীনদার ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে (যিনি বিষয়টি বোঝেন) দুই দিকের যুক্তিসহ জানিয়ে পরামর্শ নিন। তিনি যেদিক বলবেন, সেদিকেই অগ্রসর হোন — এতে আপনি দায়মুক্ত থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।
৩. তাতেও সমান থাকলে — "আরওফ" (অধিক কল্যাণকর) দিক বেছে নিন
ফকিহদের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি:
عِنْدَ تَعَارُضِ الْمَصْلَحَتَيْنِ يُرَاعَى أَرْجَحُهُمَا، وَعِنْدَ تَعَارُضِ الْمَفْسَدَتَيْنِ يُرَاعَى أَخَفُّهُمَا
"দুইটি কল্যাণ পরস্পর বিরোধী হলে অধিক প্রবলটি অগ্রাধিকার পায়; আর দুইটি ক্ষতি বিরোধী হলে হালকাটি বেছে নেওয়া হয়।" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর, ইবনে নুজাইম; আল-মুগনি, ইবনে কুদামা; মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যা, মাদ্দা ২৮-৩০)
আপনার দুই অপশনই হালাল, তাই দ্বীন, দুনিয়া ও পরিণামের দিক থেকে কোনটিতে বেশি কল্যাণ (আরওফ) ও কম ঝুঁকি — সেটাই বেছে নিন। যেমন: কোনটিতে দ্বীন রক্ষা সহজ, পরিবার/দায়িত্ব পালন সহজ, ভবিষ্যতে অনুতাপের আশঙ্কা কম, অধিক সংখ্যক নির্ভরযোগ্য মানুষের পরামর্শ সেদিকেই — সেটাই নিন।
৪. "ভুল হলে দোষী হব" — এই ভয়ের সমাধান
- হালাল দুই কাজের মধ্যে যেটাই বেছে নিন, গুনাহ হবে না। শরিয়ত কেবল হারাম-হালালের সীমারেখা নির্ধারণ করে; দুই হালালের মধ্যে পছন্দের স্বাধীনতা আল্লাহ আপনাকে দিয়েছেন। ইমাম শাতিবি (রহ.) আল-মুওয়াফাকাত-এ বলেন — শরিয়তের উদ্দেশ্য মানুষের উপর এমন বোঝা চাপানো নয় যা তার সামর্থ্যের বাইরে; বরং হালালের ক্ষেত্রে বিস্তৃত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।
- ইস্তিখারার পর আল্লাহ তাআলা বলেননি যে আপনি "সঠিক" দিকটি ধরতে পারলেই কল্যাণ পাবেন; বরং দুআয় আছে — "فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ" — অর্থাৎ আল্লাহ নিজেই সেটিকে আপনার জন্য নির্ধারিত, সহজ ও বরকতময় করে দেন। সুতরাং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আল্লাহর উপর ভরসা করুন; তিনি আপনার নিয়ত ও চেষ্টা অনুযায়ী তাতে বরকত দেবেন।
- ওয়াসওয়াসা (অতিরিক্ত সন্দেহ) থেকে সাবধান। শয়তান মানুষের অন্তরে সিদ্ধান্তের পরেও সন্দেহ ঢুকিয়ে দেয় — "যদি অন্যটা নিতাম!" হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যদি তোমার কিছু হওয়ার পর তুমি বলো — যদি আমি এটা করতাম তাহলে এটা হতো — তবে 'যদি' বলো না; বরং বলো: قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ (আল্লাহই নির্ধারণ করেছেন, তিনি যা চেয়েছেন করেছেন); কারণ 'যদি' শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।" (সহিহ মুসলিম: ২৬৬৪)
৫. ইস্তিগফার ও দুআর বিষয়ে
২৭ হাজার ইস্তিগফার মাশাআল্লাহ, চমৎকার আমল। তবে মনে রাখবেন — ইস্তিগফার ও ইস্তিখারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প নয়, সহায়ক। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) ও ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেন — দুআ ও ইস্তিখারার সাথে সাথে আল্লাহর দেওয়া বুদ্ধি, পরামর্শ ও উপায় (আসবাব) অবলম্বন করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত; শুধু অপেক্ষা করা নয়। (আল-কালিমুত তায়্যিব, ইবনুল কাইয়িম; মাজমুউল ফাতাওয়া)
ব্যবহারিক সিদ্ধান্তের ধাপ (আজকের জন্য)
- এখনই দুই দিকের যুক্তি সংক্ষেপে লিখুন — দ্বীন, দুনিয়া, পরিবার, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি — কোনটিতে বেশি কল্যাণ, সেটি চিহ্নিত করুন।
- একজন বিশ্বস্ত দ্বীনদার পরামর্শদাতাকে ফোন করুন; তার মত নিন।
- দুই দিক সমান থাকলে "আরওফ" (অধিক কল্যাণকর ও কম ঝুঁকিপূর্ণ) দিকটি বেছে নিন।
- সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পড়ুন: "اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ..." — তারপর بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ বলে সিদ্ধান্তে অটল থাকুন।
- সিদ্ধান্তের পর আর পেছনে ফিরে তাকাবেন না; "যদি অন্যটা নিতাম" — এ ধরনের চিন্তা শয়তানি ওয়াসওয়াসা হিসেবে প্রতিহত করুন।
- নিয়মিত ইস্তিগফার চালিয়ে যান — এটি বরকত ও সিদ্ধান্তে সহায়তার মাধ্যম।
সারকথা: আপনি ইস্তিখারা, ইস্তিগফার ও চিন্তা — সবই করেছেন; এখন বাকি শুধু পরামর্শ + অধিক কল্যাণকর দিক বেছে নিয়ে আল্লাহর উপর ভরসা করা। এতে আপনি দোষী হবেন না, ইনশাআল্লাহ; বরং আল্লাহ তাতে বরকত দেবেন। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণকর দিকটি সহজ করে দিন এবং অন্তরকে সন্তুষ্ট রাখুন। আমিন।
তথ্যসূত্র (হানাফি কিতাব):
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ইস্তিখারা ও দুআ-অধ্যায়
- ফাতাওয়া আলমগিরি (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া), কিতাবুল কারাহিয়াত
- মিরকাতুল মাফাতিহ (মোল্লা আলী কারী), ইস্তিখারা-হাদিসের ব্যাখ্যা
- শরহু মাআনিল আসার (ইমাম তাহাবি), দুআ ও তাওয়াক্কুল-অধ্যায়
- আল-আশবাহ ওয়ান-নাযাইর (ইবনে নুজাইম), মাসলাহা-নীতি
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (আশরাফ আলী থানভী), ইস্তিখারা-প্রসঙ্গ
- ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), ইস্তিখারা ও মুশাওয়ারা-প্রসঙ্গ
- সহিহ বুখারি: ১১৬৬, ৬৩৮২; সহিহ মুসলিম: ১৭৬৩, ২৬৬৪; তিরমিজি: ২৮২২