মদীনায় সেটেল হওয়ার দুআ, নিয়ত ও প্রস্তুতি নিয়ে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি আল্লাহর এক বান্দী, বছরখানেক আগে থেকে আল্লাহর কাছে চাচ্ছি আমি যেন মদীনায় সেটেল হতে পারি। একেবারে সিটিজেনশিপ নিয়েই থাকবো ইনশাআল্লহ।
আমার নিজের না আছে টাকাপয়সা, না আছে মাহরাম। তিনি কোথায় আল্লাহ ভালো জানেন। আমি বিগত কয় মাস ধরে আমার আল্লাহওয়ালা দুই বান্ধবীকে কথায় কথায় বলে থাকি, আরে আমি তো একেবারে মদীনায় চলে যাচ্ছি। আমি আল্লাহর কাছে তো চাই-ই। পাশাপাশি কেন জানি না আমার মনে তীব্র আশা আছে আল্লাহ এই দুআ কবুল করবেন-ই। আল্লাহর অসাধ্য তো কিছুই নেই। মানে এখন এমন অবস্থা যে আমি ধরেই নিয়েছি এই দুআ কবুল হয়ে গেছে, আর আমি খুব শীঘ্রই চলে যাচ্ছি ইনশাআল্লহ। কিন্তু আমার বিন্দুমাত্র কোনো সাধ্য, সামর্থ্য নেই। আমার জন্য যখনই কোনো প্রপোজাল আসে, সেটা ক্যান্সেল হলে আমি দুঃখ পাওয়ার বদলে খুশি হয়ে যাই। মনে মনে ভাবি, আল্লাহ যেহেতু আমাকে মদীনাওয়ালা মাহরাম দিবেন, তাই মনে হয় এই জায়গা থেকে সরিয়ে এনেছেন।
এখন প্রশ্ন হলো,
০১.দুআর ক্ষেত্রে কনফিডেন্স থাকা ভালো। কিন্তু এই যে আমার ওভার কনফিডেন্স, মাঝে মাঝে ভেবেই বসি যে, আমি তো চলেই যাচ্ছি, এটা কি ভালো? এতে ই আল্লাহ নারাজ হবেন? আজকে সকালেও আমি বান্ধবীদের বলছিলাম, আমি মদীনা চলে যাচ্ছি।
০২.আমি এই স্বপ্ন পূরণ এর জন্য কি কি দুআ করতে পারি যা দ্রুত কবুল হবে? দুআর জন্য তো নিয়ত অনেক বড় বিষয়। মদীনায় যাওয়ার জন্য কি কি নিয়ত করা উচিত?
০৩.মদীনায় যাওয়ার জন্য ইবাদত বা সামর্থ্যের ক্ষেত্রে কি কি প্রিপারেশন নেয়া উচিত? আমার তো কোনো টাকা পয়সা নাই। কিভাবে কি করবো?
আমার মনে হচ্ছে বাংলাদেশের উপর থেকে পুরাই মন উঠে গেছে। এখানে আর থাকতেই মন চাচ্ছে না। মদীনার জন্য মন ছুটে গেছে। আমি জানি না কেন, কীসের টানে আমার মন ব্যাকুল হয়ে পড়েছে! আমার মন পুরাই অস্থির হয়ে আছে। উঠতে বসতে শুধু মাথায় ঘুরে, আমি কিভাবে মদীনায় যাবো? শাইখ, আমাকে যথাযথ পরামর্শ দিন মিন ফাদ্বলিক।
جزاك الله خيرا في الدنيا والاخره
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم، الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:
প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার অনুভূতিগুলোও স্বাভাবিক। মদীনা মুনাওয়ারার প্রতি ভালোবাসা ঈমানের নিদর্শন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «اللَّهُمَّ حَبِّبْ إِلَيْنَا الْمَدِينَةَ كَحُبِّنَا مَكَّةَ أَوْ أَشَدَّ» (বুখারী, হাদীস ১৮৮৯; মুসলিম, হাদীস ১৩৭২)। তবে এই ভালোবাসার সাথে সাথে আমাদেরকে শরীয়তের সীমা, তাওয়াক্কুল ও বাস্তবতার ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর ধারাবাহিক উত্তর দিচ্ছি।
০১. দুআর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কনফিডেন্স (ওভার কনফিডেন্স) রাখা কি ঠিক?
দুআর ক্ষেত্রে দৃঢ় বিশ্বাস ও আশা রাখা সুন্নত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «ادْعُوا اللَّهَ وَأَنْتُمْ مُوقِنُونَ بِالْإِجَابَةِ» (তিরমিযী, হাদীস ২৯৪৬)। কিন্তু "আমি ধরেই নিয়েছি দুআ কবুল হয়ে গেছে, আমি চলেই যাচ্ছি" — এ ধরনের দৃঢ় দাবি করা এবং মানুষের সামনে বারবার বলা ইসলামী আদবের পরিপন্থী। কারণ:
১. আল্লাহর ইচ্ছা ও হিকমত: কোনো বিষয় চূড়ান্তভাবে ঘটে যাওয়া বা না হওয়ার নিশ্চয়তা একমাত্র আল্লাহর কাছে। কুরআনে আছে: «وَلَا تَقُولَنَّ لِشَيْءٍ إِنِّي فَاعِلٌ ذَٰلِكَ غَدًا إِلَّا أَن يَشَاءَ اللَّهُ» (সূরা কাহফ: ২৩-২৪) — "আগামীকাল আমি এ কাজ করবো" — এমন কথা বলো না, إلا أن يشاء الله (যদি আল্লাহ চান) বলা ছাড়া। সুতরাং "আমি মদীনায় চলে যাচ্ছি ইনশাআল্লাহ" বলা ঠিক আছে, কিন্তু "আমি ধরেই নিয়েছি দুআ কবুল হয়ে গেছে" — এভাবে নিশ্চিত দাবি করা উচিত নয়।
২. ইস্তিদরাজ ও ফিতনার আশঙ্কা: ইবন আবিদীন রহ. «رد المحتار»-এ উল্লেখ করেছেন, বান্দার উচিত নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অহংকারপূর্ণ নিশ্চয়তা না করা; বরং خوف ও رجاء (ভয় ও আশা) এর মাঝামাঝি থাকা। (রাদ্দুল মুহতার, ১/৪৫ প্রসঙ্গ)
৩. বিয়ের প্রস্তাব ক্যান্সেল হওয়ায় খুশি হওয়া: এটি একটি সূক্ষ্ম বিষয়। যদি আপনি মনে করেন আল্লাহ আপনাকে মদীনার জন্য সরিয়ে রাখছেন — এই সুধারণা (حسن الظن بالله) ঠিক আছে। কিন্তু এটা যেন এমন না হয় যে আপনি নিজের পছন্দের বিষয়গুলোকে তুচ্ছ করছেন বা মানুষের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করছেন। বরং প্রতিটি প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ইস্তিখারা ও পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিন।
পরামর্শ: "ইনশাআল্লাহ" বলা, "আল্লাহ চাইলে" বলা — এগুলো অভ্যাস করুন। আর বেশি বেশি বলবেন না যে "আমি চলেই যাচ্ছি" — কারণ এতে মানুষের মনে হয় আপনি অহংকার করছেন বা বাস্তবতা উপলব্ধি করছেন না। বরং বলুন: "আমি আল্লাহর কাছে দুআ করছি, তিনি চাইলে ব্যবস্থা করবেন।"
০২. স্বপ্ন পূরণের জন্য কী কী দুআ করবেন এবং মদীনায় যাওয়ার নিয়ত কী হবে?
দুআ:
১. সর্বোত্তম দুআ: «رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ» (সূরা বাকারা: ২০১)। ইবন আবিদীন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন, এই দুআ দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণকে শামিল করে। (রাদ্দুল মুহতার, ২/২৬০ প্রসঙ্গ)
২. হিজরত ও মদীনার জন্য দুআ: রাসূলুল্লাহ ﷺ মদীনার জন্য দুআ করতেন: «اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي مَدِينَتِنَا» (বুখারী, হাদীস ১৮৮৯)। আপনি বলতে পারেন: «اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي هِجْرَةً إِلَى الْمَدِينَةِ الْمُنَوَّرَةِ وَسَكَنًا فِيهَا بِرَحْمَتِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِينَ»।
৩. ইস্তিখারা: বিয়ে বা হিজরতের সিদ্ধান্তের জন্য সালাতুল ইস্তিখারা করুন। (বুখারী, হাদীস ১১৬৬)
৪. হাজতের দুআ: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ أَنْ تَقْضِيَ حَاجَتِي» (তিরমিযী, হাদীস ৩৪৭৫)।
নিয়ত:
মদীনায় যাওয়ার নিয়ত হবে:
- রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শহরে বসবাস করে তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনযাপন করা।
- মসজিদে নববীতে বেশি বেশি নামায পড়া।
- ইলমে দ্বীন শেখা ও শেখানো।
- হিজরতের সওয়াব অর্জন করা (যেখানে হিজরতের ফযীলত রয়েছে)।
- পরিবার-পরিজনকে দ্বীনের পরিবেশে গড়ে তোলা।
- মদীনার বরকত ও রাসূল ﷺ-এর প্রতিবেশী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন।
নিয়তের ক্ষেত্রে ইমাম নববী রহ. «رياض الصالحين»-এ বলেন: «إنما الأعمال بالنيات» — প্রতিটি কাজ নিয়তের উপর নির্ভরশীল। (বুখারী, হাদীস ১)
০৩. মদীনায় যাওয়ার জন্য ইবাদত ও সামর্থ্যের প্রস্তুতি কী হবে? টাকা-পয়সা না থাকলে কী করবেন?
ইবাদতের প্রস্তুতি:
১. দ্বীনি ইলম অর্জন: মদীনায় যাওয়ার আগে কুরআন, হাদীস, ফিকহ (বিশেষত হানাফী ফিকহ) শিখুন। মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বা মসজিদে নববীর দরসে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা তৈরি করুন।
২. আরবি ভাষা শেখা: মদীনায় বসবাসের জন্য আরবি ভাষা অপরিহার্য। এখন থেকেই আরবি শেখা শুরু করুন।
৩. সালাত ও কুরআন তিলাওয়াতের অভ্যাস: মসজিদে নববীতে নামায পড়ার জন্য শারীরিক ও রুহানী প্রস্তুতি নিন।
৪. সবর ও তাওয়াক্কুল: আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন, কিন্তু বাস্তব ব্যবস্থা নিন।
সামর্থ্যের প্রস্তুতি (টাকা-পয়সা না থাকলে):
১. হিজরতের বৈধ পথ খোঁজা: মদীনায় সেটেল হওয়ার জন্য বৈধ উপায় হলো — ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া (যেমন মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়), দ্বীনি শিক্ষার জন্য স্কলারশিপ পাওয়া, বা মাহরামের সাথে হজ/উমরাহ করে সেখানে অবস্থান করা (যতদিন বৈধভাবে সম্ভব)। অবৈধ পথে (ভিসা ছাড়া, চুরি করে, প্রতারণা করে) যাওয়া কখনোই জায়েয নয়। আল্লাহর নারাজি হবে।
২. দুআ ও তাওয়াক্কুল: আল্লাহর কাছে চাইতে থাকুন। «وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ» (সূরা তালাক: ২-৩)।
৩. মাহরামের বিষয়: আপনার মাহরাম নেই — এটি একটি বাস্তব সমস্যা। ইসলামী শরীয়তে নারীদের মাহরাম ছাড়া সফর করা নিষিদ্ধ। ইবন আবিদীন রহ. «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন: «لا تسافر المرأة بغير محرم» (রাদ্দুল মুহতার, ২/৪৬৫)। সুতরাং মাহরাম ছাড়া মদীনায় হিজরত করা আপনার জন্য এখন সম্ভব নয়। আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি মাহরাম দেন (বিয়ে বা পরিবারের কোনো সদস্যের মাধ্যমে)। বিয়ের প্রস্তাব আসলে ইস্তিখারা করে দেখুন — হতে পারে আল্লাহ সেই প্রস্তাবের মাধ্যমে মদীনার পথ খুলে দিচ্ছেন।
৪. ধৈর্য ও শুকর: আপনার মন অস্থির — এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে। «أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ» (সূরা রা'দ: ২৮)। বেশি বেশি যিকর করুন, বিশেষত «لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ» এবং «حَسْبِيَ اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ»।
বিশেষ পরামর্শ (মিন ফাদ্বলিক):
১. বাংলাদেশে থাকাকালীন দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করুন: মদীনার পরিবেশের মতো নিজের ঘরে, পরিবারে, মসজিদে দ্বীনি পরিবেশ গড়ুন। এটাই মদীনার প্রস্তুতি।
২. বিয়ে নিয়ে চিন্তা করুন: মাহরাম ছাড়া মদীনায় যাওয়া সম্ভব নয়। তাই বিয়ের প্রস্তাবগুলোকে তুচ্ছ করবেন না। ইস্তিখারা করে, পরিবারের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিন। আল্লাহ হয়তো বিয়ের মাধ্যমেই মদীনার পথ খুলে দিচ্ছেন।
৩. অতিরিক্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকুন: "আমি চলেই যাচ্ছি" — এভাবে বারবার বলা থেকে বিরত থাকুন। বরং বলুন: "আল্লাহ চাইলে।" এতে আপনি আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাবেন এবং মানুষের সামনে বিনয়ী থাকবেন।
৪. মানসিক শান্তির জন্য: আপনার অস্থিরতা কাটাতে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, সালাত, যিকর করুন। প্রয়োজনে একজন দ্বীনদার আলিমা/শায়খার পরামর্শ নিন।
৫. সবর করুন: «إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ» (সূরা বাকারা: ১৫৩)। আল্লাহর কাছে দুআ করুন, কিন্তু তাড়াহুড়া করবেন না। «يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ» (বুখারী, হাদীস ৬৩৪০) — যতক্ষণ তাড়াহুড়া না করে, দুআ কবুল হয়।
সারসংক্ষেপ: মদীনার প্রতি ভালোবাসা রাখুন, দুআ করুন, কিন্তু নিশ্চিত দাবি করবেন না। মাহরাম ও বৈধ পথ ছাড়া হিজরতের চেষ্টা করবেন না। বিয়ের প্রস্তাবগুলো ইস্তিখারা করে দেখুন। দ্বীনি ইলম ও আরবি শিখুন। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল রাখুন এবং ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ আপনার দুআ কবুল করুন এবং কল্যাণের পথ দেখান। আমীন।
والله أعلم بالصواب