সূরা মুলক পড়লে কবরের আযাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায় কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১) এই বিষয় এ হাদিস কি সহিহ? বিশাস রাখা যাবে?
২) কখন সুরা মুলক পড়তে হবে, মাগ্রিবের নামাজের পর যে কোন সময়?
৩) আর কি নিয়ত এ এই সুরা regular পড়া উচিত?
Answer
সূরা মুলক তিলাওয়াতের ফযীলত ও আমল — বিস্তারিত ফিকহি বিশ্লেষণ
ভূমিকা
সূরা মুলক (সূরা ৬৭, ৩০ আয়াত, মাক্কী) নিয়ে বর্ণিত ফযীলতের হাদীসগুলো মূলত সহীহ ও গ্রহণযোগ্য। নিম্নে তিনটি প্রশ্নের ধারাবাহিক উত্তর দেওয়া হলো।
১) হাদীসের সহীহতা ও বিশ্বাস রাখা যাবে কি?
হ্যাঁ, বিশ্বাস রাখা যাবে। এ বিষয়ে একাধিক সহীহ ও হাসান হাদীস বর্ণিত হয়েছে:
ক) সহীহ হাদীস — কবরের আযাব থেকে রক্ষা
হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ سُورَةً مِنَ الْقُرْآنِ ثَلَاثُونَ آيَةً شَفَعَتْ لِرَجُلٍ حَتَّى غُفِرَ لَهُ، وَهِيَ سُورَةُ تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ»
"নিশ্চয়ই কুরআনের একটি সূরা আছে যার ত্রিশটি আয়াত; তা এক ব্যক্তির জন্য শাফাআত করবে, এমনকি তাকে ক্ষমা করা হবে। আর তা হলো 'তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক' (সূরা মুলক)।"
— সুনানে তিরমিযী: ২৮৯১; সুনানে আবু দাউদ: ১৪০০; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৭৮৬। ইমাম তিরমিযী রহ. বলেছেন: «هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ» (হাসান)। শায়খ আলবানী রহ. সহীহ বলেছেন।
খ) কবরের আযাব থেকে রক্ষার হাদীস
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত:
«يُؤْتَى الرَّجُلُ فِي قَبْرِهِ فَتُؤْتَى رِجْلَاهُ فَتَقُولُ: مَا لَكُمْ عَلَيَّ مَجَالٌ، فَإِنَّهُ كَانَ يَقْرَأُ بِي سُورَةَ الْمُلْكِ...»
"কবরে মানুষকে আনা হবে, তার পা এসে বলবে: তোমাদের আমার উপর কোনো অধিকার নেই; কারণ সে (জীবদ্দশায়) আমাকে দিয়ে সূরা মুলক পড়ত... (এভাবে প্রতিটি অঙ্গ সাক্ষ্য দেবে যে সে সূরা মুলক পড়ত)।"
— সুনানে তিরমিযী: ২৮৯০; সুনানে নাসাঈ (কুবরা); মুসতাদরাক হাকিম। ইমাম তিরমিযী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। ইমাম হাকিম রহ. সহীহ বলেছেন।
গ) রাতে তিলাওয়াতের ফযীলত
হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ সূরা সাজদা ও সূরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না। — সুনানে তিরমিযী: ২৮৯২ (হাসান)।
ফিকহি সিদ্ধান্ত
- হাদীসগুলো হাসান-সহীহ পর্যায়ের; আকীদা-বিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণযোগ্য।
- তবে এগুলো ফযীলতের হাদীস (فضائل الأعمال) — এতে বিশ্বাস রাখা যাবে এবং আমল করা মুস্তাহাব।
- সতর্কতা: কবরের আযাব থেকে রক্ষা আল্লাহরই ইচ্ছায়; সূরা মুলক নিজে স্বাধীনভাবে রক্ষা করে না — বরং আল্লাহ তাআলা এ সূরার বরকতে রক্ষা করেন। এ বিশ্বাস রাখা জরুরি।
রেফারেন্স: মিরকাতুল মাফাতীহ (শরহে মিশকাত) — কিতাবুল ফাযাইল; তুহফাতুল আহওয়াযী; মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.)।
২) কখন পড়তে হবে?
সুন্নাহসম্মত সময়সমূহ:
ক) রাতে ঘুমানোর আগে (সর্বোত্তম): জাবির রা.-এর হাদীস অনুযায়ী নবী ﷺ ঘুমানোর আগে সূরা সাজদা ও সূরা মুলক পড়তেন। — তিরমিযী: ২৮৯২।
খ) মাগরিবের পর থেকে ফজরের আগে — যেকোনো সময়: নির্দিষ্ট কোনো সময় বাধ্যতামূলক নয়। তবে মাগরিবের পর পড়া উত্তম, কারণ:
- এটি রাতের শুরু; ঘুমের আগে পড়ার সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- ইমাম নববী রহ. ও ইবনে আবিদীন রহ. (রাদ্দুল মুহতার) ফযীলতের আমলে সময়ের ব্যাপকতা (سعة الوقت) উল্লেখ করেছেন।
গ) ইশার পর বা ঘুমের আগে: সর্বোত্তম ও সহজ পদ্ধতি — ইশার নামাজের পর বা ঘুমানোর আগে পড়া।
ফিকহি নোট:
- মাগরিবের পর নির্দিষ্ট সময় বাধ্যতামূলক নয় — বরং রাতের যেকোনো সময়, বিশেষত ঘুমের আগে পড়া সুন্নাহ।
- তবে সালাতের পর পড়া (যেমন মাগরিব/ইশার ফরজের পর) সম্পূর্ণ জায়েয ও উত্তম।
৩) নিয়ত ও নিয়মিত পড়ার বিধান
নিয়ত (নিয়্যাহ):
সূরা মুলক নিয়মিত পড়ার নিয়ত হবে:
- আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর হুকুম পালন।
- কবরের আযাব থেকে মুক্তি ও শাফাআত লাভের আশা।
- কুরআনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।
- ঈমান ও আখিরাতের স্মরণ জাগ্রত রাখা।
সতর্কতা: নিয়ত হবে একমাত্র আল্লাহর জন্য; লোক দেখানো বা "বিশেষ ফল পাব" — এ ধরনের ব্যবসায়িক মনোভাব নয়। ফযীলত আল্লাহর পক্ষ থেকে; আমরা শুধু আমল করি।
নিয়মিত পড়ার বিধান:
- মুস্তাহাব ও অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ — প্রতিদিন রাতে (বিশেষত ঘুমের আগে) পড়া।
- কমপক্ষে: প্রতিদিন একবার (রাতে)।
- উত্তম: প্রতিদিন ফজর/মাগরিবের পর অথবা ঘুমের আগে।
- বেশি উত্তম: সপ্তাহে একাধিকবার, বিশেষত জুমার রাতে।
ফিকহি রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন): কিতাবুস সালাত — ফযীলতের আমলে নিয়মিততা (المداومة) উত্তম।
- বাহিশতী যেওর (আশরাফ আলী থানভী রহ.): নামাজের পর তাসবীহ-তিলাওয়াতের অধ্যায়।
- ফাযায়েলে আমল (থানভী রহ.): কুরআন তিলাওয়াতের ফযীলত অধ্যায়।
- মা'আরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ.): সূরা মুলকের তাফসীর-ভূমিকা।
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | হাদীস সহীহ? | হ্যাঁ, হাসান-সহীহ; বিশ্বাস ও আমল করা যাবে | | কখন পড়বে? | রাতে, বিশেষত ঘুমের আগে বা মাগরিব/ইশার পর; নির্দিষ্ট সময় বাধ্যতামূলক নয় | | নিয়মিত পড়া? | মুস্তাহাব ও ফযীলতপূর্ণ; নিয়ত হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের মুক্তি |
দোয়া: আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সূরা মুলক নিয়মিত তিলাওয়াতের তাওফিক দান করুন এবং কবরের আযাব থেকে হেফাজত করুন। আমীন।