পরিবার ছেড়ে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া কি জায়েজ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7165
Questioner: Sazzad Al Haque
Question Asked: 20 Oct 2026, 08:09 PM
Reviewed & Published: 20 Oct 2026, 09:04 PM
Views: 14
Tokens: 6,602
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
একভাই তার পরিবার নিয়ে থাকে। তার পরিবারে তার বাবা মা ও একজন ছোট ভাই আছে।
ভাই দেশে যা রোজগার করে তা দিয়ে ইন শা আল্লাহ তার পরিবার স্বচ্ছল ভাবেই চলতে পারে। কিন্তু ভাইয়ের খুব আগ্রহ ছিল অনেক আগে থেকেই বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নিবে।
কিন্তু তার বাসার এমন অবস্থা যে, তার বাবা মা মাঝে মাঝে খুব অসুস্থ হয়ে যায়, যদিও তার তার বাবা চাকরি করেন এখনও। অসুস্থ হলে তাদের দেখাশোনার কাজ তাকেই করতে হয়। তার ছোট ভাইও অনেক ছোট। ছোট ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্বও এখন প্রায় তার উপরই পরে।
এ অবস্থায় তার কি বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া উচিৎ?
ভাই অমুসলিম প্রধান দেশে পড়ালেখা করতে যাতে চায়। তার কি এমন দেশে যাওয়া উচিৎ?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

** উত্তর:**
প্রশ্নে বর্ণিত অবস্থায় ভাইয়ের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়া শরীয়তের দৃষ্টিতে বাধ্যতামূলক নয়; বরং বাবা-মায়ের খেদমত ও ছোট ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব প্রবলভাবে জরুরি হলে দেশে থেকে তাদের খেদমত করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সওয়াবের কাজ।

তবে যদি এমন ব্যবস্থা করা যায় যে, তার অনুপস্থিতিতেও বাবা-মায়ের দেখাশোনা ও ছোট ভাইয়ের তত্ত্বাবধান নিশ্চিতভাবে হবে, এবং বিদেশে গিয়ে দ্বীন-ঈমান হেফাজতের পূর্ণ ব্যবস্থা থাকবে, তাহলে যাওয়ার অনুমতি আছে।

আর অমুসলিম প্রধান দেশে গিয়ে দ্বীন-ঈমান ও চরিত্র বিপন্ন হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকলে সেখানে যাওয়া উচিত নয়; বরং নিষিদ্ধের পর্যায়ে পড়বে।


বাবা-মায়ের খেদমত ও সন্তানের দায়িত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
“তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো। তাদের মধ্যে কেউ বা উভয়েই যদি তোমার কাছে বৃদ্ধ বয়সে পৌঁছে যায়, তবে তাদের ‘উফ’ও বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বলো।”
(সূরা বনী ইসরাইল: ২৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:

رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ
قِيلَ: مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَنْ أَدْرَكَ أَبَوَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ، أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا، فَلَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ
“তার নাক ধুলোয় মলিন হোক, তার নাক ধুলোয় মলিন হোক, তার নাক ধুলোয় মলিন হোক।” বলা হলো, “হে আল্লাহর রাসূল! সে কে?” তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার একজন বা উভয়কে বার্ধক্য অবস্থায় পেয়েছে, অতঃপর (তাদের খেদমত না করে) জান্নাতে প্রবেশ করেনি।”
(সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫১)

অন্য হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কি?” সে বলল, “হ্যাঁ।” তিনি বললেন:

فَفِيهِمَا فَجَاهِدْ
“তাহলে তাদের (খেদমতের) মধ্যেই জিহাদ করো।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৩০০৪; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৪৯)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, পিতা-মাতার খেদমত এমন গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত যে, নফল জিহাদ থেকেও পিছিয়ে রাখা যায়—যখন তারা সন্তানের প্রয়োজন হয়। সুতরাং বাবা-মা অসুস্থ হলে এবং তাদের দেখাশোনার জন্য সন্তানের উপস্থিতি জরুরি হলে, শুধু ব্যক্তিগত উচ্চশিক্ষার আকাঙ্ক্ষায় তাদের ছেড়ে যাওয়া শরীয়তসম্মত দৃষ্টিতে সমীচীন নয়।


ছোট ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব

ছোট ভাইয়ের তত্ত্বাবধান ও লালন-পালনের দায়িত্ব মূলত পিতা-মাতার। তবে পিতা-মাতা অসুস্থ বা অক্ষম হলে বড় ভাইয়ের উপর সহযোগিতা ও দেখাশোনার দায়িত্ব আসে। এটি ইসলামের পারিবারিক দায়িত্ববোধের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”
(সহীহ বুখারী, হাদিস: ৮৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯)

তাই ছোট ভাইয়ের দেখাশোনার দায়িত্ব যদি বাস্তবিকই তার উপর এসে পড়ে, তবে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আবশ্যক।


বিদেশে উচ্চশিক্ষা: মূলনীতি

শরীয়তে শিক্ষা অর্জন প্রশংসনীয়, বিশেষত দ্বীনি শিক্ষা। কিন্তু দুনিয়াবি উচ্চশিক্ষার জন্য দেশত্যাগ করা ফরজ বা ওয়াজিব নয়; এটি সাধারণত মুবাহ/অনুমোদিত। আর কোনো মুবাহ কাজ যদি ফরজ বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পরিত্যাগের কারণ হয়, তবে তা পরিত্যাজ্য। ইসলামি ফিকহের মূলনীতি হলো:

دَرْءُ الْمَفَاسِدِ مُقَدَّمٌ عَلَى جَلْبِ الْمَصَالِحِ
“ক্ষতি দূর করা উপকার অর্জনের চেয়ে অগ্রগণ্য।”
(الأشباه والنظائر للسيوطي، ص: ৮৭; شرح القواعد الفقهية للزرقا، ص: ২০৭)

আরেক মূলনীতি:

الْوَسَائِلُ لَهَا حُكْمُ الْمَقَاصِدِ
“উপায়গুলোর হুকুম উদ্দেশ্যের হুকুমের মতো।”
(الأشباه والنظائر لابن نجيم، ص: ৮৫)

অর্থাৎ বিদেশে যাওয়া যদি দ্বীন-ঈমান ও পারিবারিক দায়িত্বের ক্ষতির কারণ হয়, তবে তা নিষিদ্ধ বা মাকরূহ হবে।


অমুসলিম প্রধান দেশে যাওয়া

অমুসলিম প্রধান দেশে পড়াশোনার জন্য যাওয়া শর্তসাপেক্ষে জায়েজ। শর্ত হলো:

  1. দ্বীন-ঈমান ও আকিদা নিরাপদ থাকা—সেখানে গিয়ে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া, আকিদা নষ্ট হওয়া বা হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা না থাকা।
  2. ফরজ ইবাদত ও হালাল-হারামের বিধান পালনের সুযোগ থাকা—যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, রোজা, হালাল খাবার, পর্দা ইত্যাদি।
  3. চরিত্র ও নৈতিকতার হেফাজত—মিশ্র পরিবেশ, বেপর্দা, মাদক, অবৈধ সম্পর্ক ইত্যাদি থেকে বাঁচার ব্যবস্থা থাকা।
  4. পিতা-মাতার অনুমতি ও তাদের খেদমতের ব্যবস্থা—তারা অসুস্থ হলে বা প্রয়োজন হলে সন্তানের উপস্থিতি বা বিকল্প সেবার নিশ্চয়তা থাকা।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।”
(সূরা বাকারা: ১৯৫)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
(এবং অন্য বর্ণনায়)
لَا يَجْتَمِعُ الْإِيمَانُ وَالْكُفْرُ فِي قَلْبِ رَجُلٍ
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন নিজের জন্য জাহান্নামের স্থান না বানায়।”
(সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৬—অর্থানুযায়ী)

তবে এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন: অমুসলিম দেশে যাওয়া নিজেই হারাম নয়; বরং দ্বীন-ঈমান ও চরিত্রের ক্ষতির প্রবল আশঙ্কা থাকলে তা নিষিদ্ধ বা মাকরূহ হবে। আর যদি দ্বীনি পরিবেশ রক্ষা করে, মসজিদ-ইসলামিক সেন্টারের সাথে সম্পর্ক রেখে, হালাল-হারাম মেনে পড়াশোনা করা যায়, তবে জায়েজ আছে। অনেক আলিম এ বিষয়ে শর্তসাপেক্ষ অনুমতি দিয়েছেন। দেখুন: ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড: ৩, পৃ: ৫৬৮-৫৭০ (বিদেশ যাত্রা ও দ্বীন হেফাজত প্রসঙ্গে); ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৪, পৃ: ৩৪৭ (বিদেশে যাওয়ার শর্তাবলি); রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃ: ৩৯০ (সফরের হুকুম ও নিরাপত্তা প্রসঙ্গে)।


##প্রশ্নের নির্দিষ্ট অবস্থায় সিদ্ধান্ত

প্রশ্নে বলা হয়েছে:

  • বাবা-মা মাঝে মাঝে খুব অসুস্থ হয়ে যান;
  • অসুস্থ হলে তাদের দেখাশোনার কাজ তাকেই করতে হয়;
  • ছোট ভাইও অনেক ছোট, তার দেখাশোনার দায়িত্বও প্রায় তার উপরই;
  • দেশে তার রোজগার দিয়ে পরিবার স্বচ্ছলভাবে চলতে পারে;
  • বাবা এখনও চাকরি করেন।

এ অবস্থায় শরীয়তের দৃষ্টিতে সরাসরি সিদ্ধান্ত হলো:

  1. যদি বাবা-মায়ের অসুস্থতার সময় তাদের সেবা-শুশ্রূষার জন্য তার উপস্থিতি অপরিহার্য হয় এবং বিকল্প কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে তার জন্য এখন বিদেশে না যাওয়াই উত্তম; বরং দেশে থেকে তাদের খেদমত করা এবং ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পিতা-মাতার খেদমত ফরজ পর্যায়ের দায়িত্ব, আর উচ্চশিক্ষা সাধারণত মুবাহ/অনুমোদিত।

  2. যদি সে বিদেশ যাওয়ার আগে নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে পারে—যেমন বাবা-মায়ের চিকিৎসা ও দেখাশোনার জন্য নির্ভরযোগ্য আত্মীয় বা সেবাকর্মীর ব্যবস্থা, ছোট ভাইয়ের তত্ত্বাবধানের ব্যবস্থা, এবং নিজের অনুপস্থিতিতে তাদের কোনো কষ্ট না হওয়ার নিশ্চয়তা—তাহলে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার অনুমতি আছে, তবে পিতা-মাতার সম্মতি ও সন্তুষ্টি নিয়ে যাওয়া আবশ্যক।

  3. অমুসলিম প্রধান দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে: যদি সেখানে গিয়ে দ্বীন-ঈমান, নামাজ-রোজা, পর্দা, হালাল-হারাম ও চরিত্র রক্ষার নিশ্চিত ব্যবস্থা থাকে এবং ফিতনার প্রবল আশঙ্কা না থাকে, তবে শর্তসাপেক্ষে যাওয়া জায়েজ। আর যদি দ্বীন-ঈমান ও চরিত্র বিপন্ন হওয়ার প্রবল আশঙ্কা থাকে, তবে সেখানে না যাওয়াই কর্তব্য; বরং কোনো মুসলিমপ্রধান দেশ বা দ্বীনি পরিবেশসম্পন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ খোঁজা উচিত।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.