সুরা বাকারা ও সুরা ইমরান হাশরের ময়দানে ছায়া হবে হাদিস
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
১) হাদিস টির উপর বিশাস রেখে আমল করা যাবে?
২) প্রিতিদিন পড়তে হবে এমন? আর কতটুকু পড়তে হবে
Answer
সুরা বাকারা ও সুরা আলে ইমরান হাশরের ময়দানে ছায়া হবে — হাদিসটির বিশ্লেষণ ও আমল
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
মুসলিম শরিফের ৮০৪ নং হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে সুরা বাকারা ও সুরা আলে ইমরান কিয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে ছায়া হয়ে দাঁড়াবে। প্রশ্নকারী জানতে চান—(১) হাদিসটির উপর বিশ্বাস রেখে আমল করা যাবে কি? (২) প্রতিদিন পড়তে হবে কি? আর কতটুকু পড়তে হবে?
হাদিসটির বর্ণনা ও সনদ
হাদিস নং ৮০৪ (সহিহ মুসলিম):
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا عَبْدُ الْأَعْلَى بْنُ عَبْدِ الْأَعْلَى، عَنْ مَعْمَرٍ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ قَالَ: «اقْرَءُوا الْقُرْآنَ فَإِنَّهُ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ شَفِيعًا لِأَصْحَابِهِ، اقْرَءُوا الزَّهْرَاوَيْنِ: الْبَقَرَةَ وَسُورَةَ آلِ عِمْرَانَ، فَإِنَّهُمَا تَأْتِيَانِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كَأَنَّهُمَا غَمَامَتَانِ، أَوْ كَأَنَّهُمَا غَيَايَتَانِ، أَوْ كَأَنَّهُمَا فِرْقَانِ مِنْ طَيْرٍ صَوَافَّ، تُحَاجَّانِ عَنْ أَصْحَابِهِمَا»
অনুবাদ: আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "তোমরা কুরআন পড়ো, কারণ কিয়ামতের দিন তা তার পাঠকদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সুরা—সুরা বাকারা ও সুরা আলে ইমরান—পড়ো। কারণ এ দুটি কিয়ামতের দিন এমনভাবে আসবে যেন দুটি মেঘ, অথবা দুটি ছায়া, অথবা দুটি পাখির ঝাঁক যা ডানা বিছিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং নিজেদের পাঠকদের পক্ষ থেকে আল্লাহর কাছে ঝগড়া (সুপারিশ) করবে।"
সনদ: সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাতিল মুসাফিরীন, হাদিস নং ৮০৪ (কিছু সংস্করণে ৮০৫)। সনদ সহিহ—আবু বকর ইবন আবি শাইবা → আবদুল আ'লা → মা'মার → যুহরি → সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব → আবু হুরায়রা (রা.)।
১) হাদিসটির উপর বিশ্বাস রেখে আমল করা যাবে?
হ্যাঁ, অবশ্যই যাবে। এটি সহিহ মুসলিমের সহিহ হাদিস, যা ইমাম মুসলিম (রহ.) স্বয়ং বর্ণনা করেছেন এবং উম্মতের সমস্ত মুহাদ্দিসিন এটি গ্রহণ করেছেন। হাদিসটি মুত্তাফাকুন আলাইহি নয়, তবে সহিহ মুসলিমের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এর সনদ সহিহ ও প্রামাণ্য।
আকিদাগত দিক: হাদিসে বর্ণিত "মেঘ/ছায়া/পাখির ঝাঁক" — এগুলোকে আমরা হুবহু বিশ্বাস করব, কিন্তু এর প্রকৃত রূপ আল্লাহই ভালো জানেন (بلا كيف ولا تشبيه)। এটি কিয়ামতের দিনের গায়েবি বিষয়, যা নবী ﷺ-এর সংবাদ অনুযায়ী সত্য। ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ উল্লেখ করেছেন যে, কুরআনের ফজিলত সম্পর্কিত সহিহ হাদিসের উপর আমল করা ও বিশ্বাস করা ওয়াজিব।
ইমাম নববী (রহ.) সহিহ মুসলিমের শরহে (আল-মিনহাজ) বলেন:
"এ হাদিসে সুরা বাকারা ও আলে ইমরানের মহান ফজিলত প্রমাণিত। এ দুটিকে 'যাহরাওয়াইন' (দুটি উজ্জ্বল) বলা হয়, কারণ এরা নূর ও হেদায়েতের দিক থেকে উজ্জ্বল। কিয়ামতের দিন এরা পাঠকের পক্ষে সুপারিশ করবে।"
ইমাম বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) উমদাতুল কারি-তে বলেন: "এ হাদিস কুরআনের শাফাআতের প্রমাণ এবং সুরা বাকারা ও আলে ইমরানের বিশেষ মর্যাদার প্রমাণ।"
২) প্রতিদিন পড়তে হবে কি? আর কতটুকু পড়তে হবে?
(ক) প্রতিদিন পড়া কি বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব)?
না, প্রতিদিন পড়া ওয়াজিব বা ফরজ নয়। হাদিসে "اقْرَءُوا" (পড়ো) শব্দটি নদব/ইস্তিহাব (উৎসাহ) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, ওয়াজিব অর্থে নয়। ইমাম ইবন হাজার আসকালানি (রহ.) ফাতহুল বারি-তে এবং ইমাম নববী (রহ.) আল-মিনহাজ-এ স্পষ্ট করেছেন যে, কুরআনের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসের নির্দেশ সাধারণত মুস্তাহাব (উত্তম) অর্থে।
তবে প্রতিদিন কিছুটা হলেও কুরআন তিলাওয়াত করা সুন্নত ও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا» (তিরমিজি: ২৯১০)
"যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পড়বে, তার জন্য একটি নেকি; আর একটি নেকি দশটি নেকির সমান।"
(খ) কতটুকু পড়তে হবে?
কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ বাধ্যতামূলক নয়। তবে ফজিলত লাভের জন্য নিম্নোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করা উত্তম:
| পদ্ধতি | বিবরণ | ফজিলত | |--------|--------|--------| | সর্বোত্তম | সুরা বাকারা ও আলে ইমরান সম্পূর্ণ একবার খতম করা (যেমন: সপ্তাহে বা মাসে একবার) | হাদিসের পূর্ণ ফজিলত | | মধ্যম | প্রতিদিন কিছু আয়াত—যেমন সুরা বাকারার প্রথম ৫ আয়াত, আয়াতুল কুরসি, শেষ ২ আয়াত এবং সুরা আলে ইমরানের কিছু অংশ | ফজিলত লাভ | | সর্বনিম্ন | প্রতিদিন অন্তত আয়াতুল কুরসি ও সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত | হাদিসে বিশেষ ফজিলত বর্ণিত |
বিশেষ ফজিলতের হাদিস:
«مَنْ قَرَأَ آيَةَ الْكُرْسِيِّ فِي دُبُرِ كُلِّ صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ لَمْ يَمْنَعْهُ مِنْ دُخُولِ الْجَنَّةِ إِلَّا الْمَوْتُ» (নাসাঈ, আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ: ১০০)
"যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর আয়াতুল কুরসি পড়বে, তাকে জান্নাতে প্রবেশ থেকে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই বাধা দেবে না।"
«مَنْ قَرَأَ بِالْآيَتَيْنِ مِنْ آخِرِ سُورَةِ الْبَقَرَةِ فِي لَيْلَةٍ كَفَتَاهُ» (বুখারি: ৫০০৯, মুসলিম: ৮০৭)
"যে ব্যক্তি রাতে সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।"
(গ) হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ (১/৫৪৭) উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন তিলাওয়াত সর্বোত্তম ইবাদত, এবং প্রতিদিন কিছু তিলাওয়াত করা মুস্তাহাব। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মা'আরিফুল কুরআনে সুরা বাকারার ভূমিকায় বলেন: "সুরা বাকারা ও আলে ইমরানকে 'যাহরাওয়াইন' বলা হয়; এদের নিয়মিত তিলাওয়াত করা অত্যন্ত বরকতময়।"
মুফতি তাকি উসমানি (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন খতমের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা শরিয়তে নির্ধারিত নেই; তবে এক মাসের কমে খতম করা উত্তম নয় (যদি তাড়াহুড়ো হয়), আর ৪০ দিনের বেশি বিলম্ব করাও অনুচিত।
ব্যবহারিক পরামর্শ
- বিশ্বাস: হাদিসটি সহিহ; এর উপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখুন। ছায়া/মেঘের প্রকৃত রূপ আল্লাহই জানেন।
- আমল: প্রতিদিন অন্তত কিছু আয়াত পড়ুন—কমপক্ষে আয়াতুল কুরসি ও সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত।
- সপ্তাহে/মাসে: সুরা বাকারা ও আলে ইমরান সম্পূর্ণ একবার খতম করার চেষ্টা করুন।
- নিয়ম: তিলাওয়াতের সময় তাজবীদের প্রতি লক্ষ্য রাখুন; অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন।
- ধৈর্য: প্রথমে অল্প দিয়ে শুরু করুন, ধীরে ধীরে বাড়ান—যাতে কষ্ট না হয়।
উপসংহার
সহিহ মুসলিমের ৮০৪ নং হাদিসটি সহিহ ও প্রামাণ্য। এর উপর বিশ্বাস রাখা ওয়াজিব, এবং এর নির্দেশনা অনুযায়ী সুরা বাকারা ও আলে ইমরান তিলাওয়াত করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। তবে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পড়া ওয়াজিব নয়, বরং মুস্তাহাব। যতটুকু সম্ভব নিয়মিত পড়ুন—অন্তত আয়াতুল কুরসি ও সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত প্রতিদিন, এবং সম্ভব হলে সপ্তাহে বা মাসে একবার সম্পূর্ণ সুরা দুটি খতম করুন।
আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স
- সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮০৪
- সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫০০৯
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ২৯১০
- সুনানে নাসাঈ, আমালুল ইয়াওম ওয়াল লাইলাহ, হাদিস নং ১০০
- ইমাম নববী, আল-মিনহাজ শরহে সহিহ মুসলিম
- ইমাম ইবন হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি
- ইমাম বদরুদ্দিন আইনি, উমদাতুল কারি
- ইমাম ইবন আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, ১/৫৪৭
- মুফতি মুহাম্মদ শফি, মা'আরিফুল কুরআন
- মুফতি তাকি উসমানি, ইনামুল বারি (সহিহ বুখারির উর্দু শরহ)