নাবালক অবস্থায় চুরি করা টাকা ও মাল ফেরত না দিলে তওবা কবুল হবে কি?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
وَعَلَيْكُمُ السَّلَامُ وَرَحْمَةُ اللهِ وَبَرَكَاتُهُ
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
উত্তর:
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল। প্রথমে একটি সুসংবাদ হলো—আপনি বালেক হওয়ার পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে তওবা করেছেন; এটি আল্লাহর বিশেষ রহমত। তবে জেনে রাখুন, হক (অন্যের সম্পদ) সংক্রান্ত তওবা তখনই পূর্ণ হয় যখন হক আদায় করা হয় বা হকদারকে মাফ করানো হয়। শুধু তওবা করলে গুনাহ মাফ হয় না, যতক্ষণ না হকদারের পাওনা ফেরত দেওয়া হয় বা তাকে মাফ করানো হয়।
আপনার প্রশ্নের কয়েকটি দিক আছে। নিচে ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি।
১. নাবালক অবস্থায় চুরি করার বিধান
ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, নাবালক (অপ্রাপ্তবয়স্ক) ব্যক্তির উপর শরীয়তের হুকুম আরোপিত হয় না (رفع القلم عن الصبي حتى يبلغ)। তবে নাবালকের চুরি করা সম্পদও আমানত হিসেবে তার যিম্মায় থাকে; বালেক হওয়ার পর তা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «رد المحتار»-এ উল্লেখ করেন:
«وَلَا يَسْقُطُ الضَّمَانُ بِالصِّغَرِ، بَلْ يَبْقَى فِي ذِمَّتِهِ حَتَّى يُؤَدِّيَ»
অর্থ: নাবালক হওয়ার কারণে ক্ষতিপূরণ (যিম্মার দায়) রহিত হয় না; বরং তা তার যিম্মায় থাকে যতক্ষণ না আদায় করে। (রদ্দুল মুহতার, কিতাবুল গাসব)
তাই আপনার উপর ঋণ হিসেবে ওই টাকা ও মালের মূল্য ফেরত দেওয়া ওয়াজিব।
২. এখন আপনি কী করবেন?
আপনার সামর্থ্য নেই এবং মাফ চাওয়ার সাহসও নেই—এ অবস্থায় করণীয়:
(ক) প্রথমত, আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবা ও ইস্তিগফার চালিয়ে যান। তওবার শর্ত তিনটি: (১) গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, (২) গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, (৩) ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প। চুরির ক্ষেত্রে চতুর্থ শর্ত হলো হকদারের হক ফেরত দেওয়া বা মাফ চাওয়া।
(খ) হকদারকে মাফ চাওয়ার বিকল্প পন্থা অবলম্বন করুন। সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার সাহস না থাকলে—
- কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তি (যেমন বাবা, ভাই, বা কোনো নির্ভরযোগ্য আত্মীয়) মারফত টাকা পৌঁছে দেওয়া বা মাফ চাওয়া;
- চিঠি/বার্তা/মাধ্যমে ক্ষমা চাওয়া;
- হকদারকে না জানিয়ে হলেও তার নামে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া (যদি সম্ভব হয়)।
(গ) সামর্থ্য না থাকলে নিয়ত ও চেষ্টা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
«فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ» (التغابن: ১৬)
অর্থ: "তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।"
আপনি সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প অল্প করে হলেও টাকা জমিয়ে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করুন। যদি এখনই সামর্থ্য না থাকে, তবে দৃঢ় নিয়ত করুন যে সামর্থ্য হলে ফেরত দেবেন। হাদিসে এসেছে, নিয়ত অনুযায়ী আমল গণ্য হয়।
৩. যতদিন টাকা ফেরত দিতে পারবেন না ততদিন কী করবেন?
- প্রতিদিন দুআ ও ইস্তিগফার করুন, বিশেষ করে হকদারের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- সামর্থ্য অর্জনের চেষ্টা করুন—হালাল উপায়ে আয় করে ঋণ পরিশোধের নিয়ত রাখুন।
- হকদারকে মাফ চাওয়ার চেষ্টা করুন—যদি সরাসরি না পারেন, পরোক্ষভাবে চেষ্টা করুন।
- সদকা করুন (নফল) — যদিও সদকা হক আদায়ের বিকল্প নয়, তবে এটি গুনাহ মোচনার একটি মাধ্যম হতে পারে। তবে মনে রাখবেন, হকদারের পাওনা অবশ্যই ফেরত দিতে হবে; সদকা দিয়ে হক আদায় হবে না।
৪. টাকা ফেরত না দিয়ে মারা গেলে কী হবে?
এক্ষেত্রে আপনি ওয়ারিশদের ওসিয়ত করে যাবেন।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
«مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لِأَخِيهِ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَيْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ قَبْلَ أَنْ لَا يَكُونَ دِينَارٌ وَلَا دِرْهَمٌ» (صحيح البخاري: ২৪৪৯)
অর্থ: "যার কাছে তার ভাইয়ের কোনো হক (সম্মান বা সম্পদ) বাকি আছে, সে আজই তাকে মাফ করিয়ে নিক, এমন দিন আসার আগে যেদিন কোনো দিনার-দিরহাম থাকবে না (অর্থাৎ কিয়ামতের দিন)।"
অর্থাৎ, হকদারের হক ফেরত না দিয়ে মারা গেলে কিয়ামতের দিন তা দাবি করা হবে এবং তখন আমল দিয়ে বা জাহান্নামের শাস্তি দিয়ে তা পরিশোধ করতে হবে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «رد المحتار»-এ বলেন:
«الْمَظْلَمَةُ لَا تَسْقُطُ بِالْمَوْتِ، بَلْ تَتَعَلَّقُ بِذِمَّةِ الْمَيِّتِ، وَيُطَالَبُ بِهَا فِي الْآخِرَةِ»
অর্থ: জুলুম/হক মৃত্যুতে রহিত হয় না; বরং মৃতের যিম্মায় লেগে থাকে এবং আখিরাতে তার কাছে দাবি করা হবে। (রদ্দুল মুহতার)
৫. বিশেষ পরামর্শ
- আপনার আত্মীয়ের টাকা: যদি সম্ভব হয়, কোনো বিশ্বস্ত ব্যক্তির মাধ্যমে (যেমন বাবা বা ভাই) টাকা পৌঁছে দিন বা তার ব্যাংক একাউন্টে /বিকাশ নগদে পাঠান , অথবা চিঠিতে ক্ষমা চেয়ে পাঠান। সরাসরি সাহস না থাকলে এটাই উত্তম পন্থা।
- দোকানের মাল/টাকা: দোকানদারকে ক্ষমা চাওয়া বা টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব না হলে, অন্তত তার জন্য দুআ করুন এবং সামর্থ্য হলে ফেরত দেওয়ার নিয়ত রাখুন। যদি দোকানদারকে খুঁজে পাওয়া না যায়, তবে তার নামে সদকা করা যেতে পারে (তবে এটি হক আদায়ের বিকল্প নয়, বরং একটি চেষ্টা)।
- আল্লাহর কাছে দুআ করুন যেন তিনি আপনার জন্য হক আদায়ের পথ সহজ করে দেন এবং হকদারদের হৃদয় নরম করে দেন।
সারসংক্ষেপ: আপনার তওবা আল্লাহর কাছে কবুল হোক। তবে হক ফেরত দেওয়া বা মাফ চাওয়া আপনার দায়িত্ব। সামর্থ্য না থাকলেও নিয়ত ও চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য সহজ করুন। আমিন।
والله أعلم بالصواب